যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে যুদ্ধের প্রভাব—জন-অসন্তোষ বাড়ছে ইরানেও

ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই ফলাফলকে যুদ্ধবিরোধী মার্কিন জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, মার্কিন ভোটাররা যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জনমত উপেক্ষা করলে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
এ ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত একটি পোস্টারে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে পরাজিত অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীকী চরিত্র ‘আঙ্কল স্যাম’-কে দেখানো হয়েছে।
তবে রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থানের বার্তা দিলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও বাণিজ্যপথে বিঘ্নের কারণে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কা। সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার সংকটে থাকা দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।
আজ বুধবার মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল জানায়, পাকিস্তানের বিভিন্ন বন্দরে আটকে পড়েছে ইরানের বিপুলসংখ্যক পণ্যবাহী কনটেইনার। দেশটির আন্তর্জাতিক পরিবহন কোম্পানি সমিতির বোর্ড সদস্য মোহাম্মদ আলী কারগাশচা বার্তা সংস্থা মেহরকে জানান, প্রথমে তিন হাজার, পরে আট হাজার ও সর্বশেষ হিসাবে ১৮ হাজার কনটেইনার আটকে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
কিছু চালানের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বন্দরে পণ্য সংরক্ষণ ও অন্যান্য খরচ ২৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ব্যয় পণ্যের মূল্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তুরস্কের মাধ্যমে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করলেও অতিরিক্ত খরচ ও বিলম্বে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।
শিল্প ও জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কা
ইরানের সরকারি পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ জুন শেষ হওয়া তিন মাসে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। তেল খাত বাদ দিলে সংকোচনের হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। শিল্প ও খনি খাতে উৎপাদন কমেছে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং তেল-গ্যাস উৎপাদন কমেছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
যুদ্ধের সময় মার্চে ইরানের চারটি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনায় হামলায় দৈনিক প্রায় ২৩ কোটি ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ঘনমিটার উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো দৈনিক ১৩ কোটি ঘনমিটার উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ রয়েছে।
তবে গ্যাস-সংকটের পেছনে শুধু যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিই দায়ী নয়। দেশটির সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য ও জ্বালানি কমিশনের সাবেক সদস্য হেদায়াতুল্লাহ খাদেমি বলেন, ইরানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস মজুতের অধিকারী হয়েও শীতকালে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয় দেশটিকে।
জাতীয় ইরানি গ্যাস কোম্পানি সতর্ক করেছে, শীতকালে দেশটির ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ১১টিতে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিল্পকারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিমেন্টশিল্পেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। অক্টোবরের শেষ দিক থেকে কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় উৎপাদকদের দূষণকারী ভারী জ্বালানি তেল মজুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিবহনসহ জ্বালানি ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। খনি খাতেও বিস্ফোরক, জ্বালানি ও আমদানি করা যন্ত্রাংশের সংকট দেখা দিয়েছে।
নতুন হামলার আশঙ্কা ও জন-অসন্তোষ
তুরস্কে ইরানের রপ্তানি ৫৯ শতাংশ ও ওমানে ২৩ শতাংশ বেড়েছে। ইরানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি ইরানি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। স্থলপথে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করায় বাণিজ্য সচল রাখার চেষ্টা করছে তেহরান। তবে এতে সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়েও সতর্ক ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আগের চুক্তি লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরান সর্বোচ্চ সতর্ক ও হতাশাবাদী অবস্থানে রয়েছে।
কাতার দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে হামলা ও নতুন মার্কিন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনার খবর পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
দি নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার জন্য কয়েকটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ও তীব্র সামরিক অভিযানও রয়েছে। তবে ট্রাম্প ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, তাৎক্ষণিক হামলার পরিকল্পনা নেই। যদিও প্রয়োজন হলে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে ইরানে বাড়ছে জন-অসন্তোষ। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে দেশটির ১৯টি স্থানে অন্তত ৩০টি বিক্ষোভের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বকেয়া বেতন, পেনশন, সুযোগ-সুবিধা ও জ্বালানিসংকট ছিল এসব বিক্ষোভের প্রধান কারণ। বিক্ষোভগুলো এখনো তুলনামূলক ছোট পরিসরে হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ছে।









