Ajker Patrika

গণভোটের রায় উপেক্ষার অভিযোগ করে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা বর্জন কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২১: ৩৯
গণভোটের রায় উপেক্ষার অভিযোগ করে সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা বর্জন কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের
ফাইল ছবি

জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক বলে জানিয়ে এ বিষয়ে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এই আহ্বান জানায় কমিটি। তবে গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ করে সভা বর্জন করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়কদের অধিকাংশ এবং ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক; ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু ও জাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কসহ মোট ৬২ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বৈঠকে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জন উপস্থিত ছিলেন।

তবে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি; ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ; ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদাসসীর চৌধুরী; ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাছির আহমাদ, সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ প্রমুখকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন না।

আমন্ত্রিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির; ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বি; সদস্য হেমা চাকমা; ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি তামজিদ হায়দার; ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার; ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি সৈকত আরিফ, ফারহানা মানিক মুনা; জাকসুর ভিপি আবদুর রশিদ জিতু; ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ; ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ফরিদ; এনপিএর মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত; ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক বর্জনের বিষয়ে সাদিক কায়েম আজ নিজের ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আমি এবং ডাকসু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী এই প্রহসনের মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান করছি এবং বর্জন করছি।’ সাদিক আরও লেখেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সহস্রাধিক শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার, নামমাত্র কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। সংবিধান সংশোধন আর সংস্কার এক বিষয় নয়।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে গণভোটে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে যে প্রতারণা চলছে, তার অংশ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের রায় উপেক্ষা করে এ ধরনের উপহাসমূলক মতবিনিময় সভা দেশ ও জাতির কল্যাণ বয়ে আনবে না। তাই একটি সচেতন ছাত্রসংগঠন হিসেবে বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সভায় এক ছাত্রনেতা সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, ফ্যাসিবাদী সরকার জরুরি অবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মানুষের ওপর নিপীড়ন চালায়। হামলা বা মহামারির মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই এ জন্য সংবিধানে বিশেষ বিধান রাখার প্রয়োজন নেই।

আরও এক আমন্ত্রিত ছাত্রনেতা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা ও গণহত্যার বিচারের বিধান সংবিধানে স্থায়ীভাবে রাখার প্রস্তাব দেন। অন্য এক ছাত্রনেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জুলাই সনদে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা উল্লেখ না থাকলে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মতো বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। সূত্র জানায়, তিনি বলেছেন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও এভাবে আলোচনা করা সমীচীন নয়। নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, জনগণ বিএনপিকে নির্বাচিত করেছে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য দলটিকে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছে।

সভায় সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত আলোচনা জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার দাবি জানান এক ছাত্রনেতা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মতো বিশেষ কমিটির বৈঠকও সরাসরি সম্প্রচারের প্রস্তাব দেন তিনি। এতে কমিটির আলোচনার বিষয়গুলো জনগণ জানতে পারবেন বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র জানায়, সভায় কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের প্রশ্নে শুধু জুলাই সনদের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকেও এ ধরনের প্রশ্ন রাখার প্রস্তাব ছিল। তবে গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় সংবিধানে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের দাবি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের টেকসই বাস্তবায়ন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে যুগে যুগে তরুণেরাই জাতিকে পথ দেখিয়েছেন উল্লেখ করে তাঁদের কল্যাণে জনবান্ধব ও যুগোপযোগী সংবিধান প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশোধনের মাধ্যমে সময়োপযোগী সংবিধান প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে আরও বলা হয়, জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক। এ বিষয়ে বিরোধী পক্ষের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে তরুণদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও অংশ নেন কমিটির সদস্য চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত