Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

রমজানে পণ্যমূল্য: কথায় স্বস্তি মনে ভয়

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:০৯

ফাইল ছবি রাজধানীর আজিমপুর কলোনির বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম রমজান এলেই শঙ্কায় থাকেন। এবার এই শঙ্কা আরও বেশি। তিনি বলেন, ‘এবার প্রায় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম আগের চেয়ে বেশি। অথচ আয় বাড়েনি। এর মধ্যে রমজান আসছে। ব্যবসায়ীরা এ সময় প্রতিটি পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়ায়। এবার যে কী হারে বাড়বে তা ভেবেই দুশ্চিন্তা হচ্ছে।’ এমন আশঙ্কা অনেক মানুষের।

রমজান সামনে রেখে চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, ছোলা, খেজুর ভয় ধরাচ্ছে সবাইকে। আগাম প্রস্তুতি নিয়ে আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকাররা সন্তোষ প্রকাশ করলেও নিজেরাই আশ্বস্ত হতে পারছেন না। আগের মতো অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভাতুর রূপ দেখতে হবে—

এই আশঙ্কা সাধারণ মানুষের। এদিকে, খেজুর, ছোলা, ভোজ্যতেল, চিনিসহ আটটি নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংক, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানিকারকেরা বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের আমদানি স্বাভাবিক থাকার কথা জানালেও ভরসা পাচ্ছে 
না মানুষ।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ড. গোলাম রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রমজানে সাধারণত নিত্যপণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেড়ে যায়। একটা অসাধু ব্যবসায়ী চক্র এর সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে পণ্যের দাম স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। এ জন্য বাজার ঠিকমতো মনিটরিং করা দরকার।’

রমজানকেন্দ্রিক ঋণপত্র খোলা শুরু 
আগামী মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রোজার মাসে ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর ও পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে যায়। এ জন্য গত ডিসেম্বর থেকেই রমজানকেন্দ্রিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলা শুরু হয়েছে। সারা বছরের নিত্যপণ্য আমদানি ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশই রমজানের পণ্য আমদানিতে খরচ হয়। তবে ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্য আমদানি বিল পরিশোধে দেরি হচ্ছে। এ জন্য পরিস্থিতি সামলাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রমজানের পণ্য আমদানির চাহিদা মেটাতে আলাদাভাবে ডলার সরবরাহ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করেছে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল করিম বলেন, ‘রমজানসহ নিত্যপণ্যের এলসি খোলায় কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না। যারা আসতেছে সবার এলসি খুলছি।’

আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি
দ্রব্যমূল্য-সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরিশোধিত চিনি ও পাম তেল ছাড়া সব পণ্যই বেশি আমদানি হয়েছে। রমজান ঘিরে দেশে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, পেঁয়াজ ও খেজুরের চাহিদা অন্যান্য মাসের চেয়ে দ্বিগুণ থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রমজান মাসে ভোজ্যতেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পণ্যটি আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৮২ হাজার টন। রমজানে চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টন। ছোলার চাহিদা ১ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫৩ হাজার ৪৭৬ টন। খেজুরের চাহিদা ৫০ হাজার টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১১ হাজার ৭৭৩ টন। রমজানে মসুর ডালের চাহিদা ১ লাখ টন। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার টন। রমজানে পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ৪ লাখ টন। আর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টন। অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডালের আমদানি সন্তোষজনক। তবে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে ছোলা, খেজুর আর পেঁয়াজ আমদানিতে।

ছয় মাস পর বিল পরিশোধের সুযোগ 
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল, মটর, পেঁয়াজ, মসলা, চিনি ও খেজুর ৯০ দিনের সাপ্লায়ার্স বা বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় আমদানির সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এ সুবিধা মিলবে। আর আবশ্যকীয় এসব খাদ্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে নগদ মার্জিনের হার ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে ডলারের সংকট চলছে প্রায় ১০ মাস ধরে। মে মাসের শুরুতে যে ডলার ৮৬ টাকা ছিল, সেটা এখন ১০৭ টাকা। ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে নিত্যপণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা স্বাভাবিক রাখতে দফায় দফায় নির্দেশনা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রমজানের আট পণ্যসহ খাদ্যপণ্যের আমদানি স্বাভাবিক রাখতে এলসি জিরো বা ন্যূনতম মার্জিন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী রমজানের পণ্য বাকিতে আনার ছয় মাস পর বিল পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমদানি একেবারে থেমে আছে, তা নয়। ঋণপত্র জটিলতার কারণে পণ্য খালাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংককে কেউ জানায়নি। নিত্যপণ্যের আমদানি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যাবতীয় সাপোর্ট অব্যাহত রেখেছে।’ 

ব্যবসায়ীদের তৎপরতা  
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রমজান ঘিরে আমদানির এলসি খুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে কিছু সুপারিশ করেছি। এ ছাড়া রমজানে শুধু আট পণ্যই নয়, এর বাইরেও পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা নির্বিঘ্ন করতে জরুরি ভিত্তিতে রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছি।’

ডিসিসিআইয়ের সভাপতি সামির সাত্তার বলেন, ‘রমজানে নিত্যপণ্যের আমদানিতে এলসি মার্জিন সর্বনিম্ন করার সুপারিশ করেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করে আমদানি স্বাভাবিক রাখতে পারে।’

এস আলম গ্রুপের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ জানান, বর্তমানে তাঁদের কাছে ২ লাখ ৫০ হাজার টন ভোজ্যতেল, সমপরিমাণ চিনি মজুত আছে। মার্চ পর্যন্ত আড়াই লাখ টন করে চিনি ও ভোজ্যতেল আসবে। ঋণপত্র না খোলায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এস আলম, মেঘনা গ্রুপের পণ্য খালাসে সমস্যা হলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ ফান্ড ছাড় করাতে পারলে রমজানে কোনো পণ্যের সংকট হবে না।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, রমজান পর্যন্ত দেশে ভোগ্যপণ্যের সংকট হবে না। তবে এ জন্য ভোগ্যপণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড় দিতে হবে।

টিসিবি আর টাস্কফোর্সে ভরসা কতটুকু 
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা রমজান উপলক্ষে স্বল্পমূল্যে তেল, চিনি, ডাল, ছোলা ও খেজুর বিক্রি করব। আমার আগের প্ল্যানে এসব পণ্যের চাহিদা বিবেচনায় নিয়েছি।’

৪ জানুয়ারি বাজারমূল্য ও পর্যালোচনা-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের সভায় বলা হয়েছে, রমজানের চিনির ঋণপত্র কম খোলা হয়েছে। চিনির দাম নির্ধারণ করার পরও সে দামে বিক্রি না হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থানীয় দরে যথাযথ সমন্বয় হচ্ছে না। রমজানে ঋণপত্র খুলতে অগ্রাধিকার দেওয়া, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত এসব বাস্তবায়ন করে বাজার কতটা স্থিতিশীল রাখা যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডলার সংকটে ভোগ্যপণ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন অনেক বিল বকেয়া। কিছু বিলম্ব হচ্ছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দাম আরও বাড়বে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মেয়াজ্জেম বলেন, ‘ডলারের সংকট যা দেখছি বাস্তবে তার চেয়ে গভীর মনে হচ্ছে। অর্থনীতিতে ভারসাম্য রেখে প্রয়োজনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলসি খুলতে হবে।’

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও

    ফারসি ভাষা শিখল কারা

    মাউশির প্রকল্প: কাজ শুরুর আগেই গচ্চা ১১৬ কোটি

    কান্না থামেনি সেই মায়ের

    বালু তোলায় তীরে ভাঙন নদীতে যাচ্ছে ফসলি জমি

    প্রচার ও দক্ষতার অভাবে বাড়ছে না প্রবাসী শ্রমিক

    ভূমিকম্পে তুরস্ক-সিরিয়ায় মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে

    নোয়াখালীতে ট্রলি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

    সিএনজি চালিয়ে হাতে ফোসকা পড়েছে শ্যামল মাওলার

    দেবাশীষের বিজলী হচ্ছেন বুবলী

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও