Ajker Patrika

এআইয়ের সহায়তায় বিশ্বের প্রথম মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচার, সফলভাবে টিউমার অপসারণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৩৫
এআইয়ের সহায়তায় বিশ্বের প্রথম মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচার, সফলভাবে টিউমার অপসারণ
ব্রেন টিউমারের কারণে দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছিলেন ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা রিস হিবার্ট। ছবি: বিবিসি

ইংল্যান্ডের বেডফোর্ডশায়ারের বাসিন্দা রিস হিবার্ট দুই সন্তানের বাবা। ৪৮ বছর বয়সী পেশায় গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপক। দেড় বছর আগেও সুস্থ ও সবল ছিলেন তিনি। প্রতিদিন দুপুরের খাবারের বিরতিতে তিনি দুই মাইল হাঁটতেন। এমনই একদিন হাঁটার সময় তিনি রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়েন এবং খিঁচুনি শুরু হয়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে, তাঁর মস্তিষ্কে রয়েছে একটি টিউমার যা ক্যানসারহীন হলেও বেশ বড় আকারই ধারণ করেছে। আর এই টিউমার অপসারণ না করলে চিরকালের জন্য দৃষ্টিহীন হয়ে পড়বেন রিস হিবার্ট।

এরপর এক অসাধ্য সাধন করলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের শল্যচিকিৎসকেরা। তাঁর এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠাঁই নিলেন ইতিহাসের পাতায়ও। বিশ্বে প্রথমবারের মতো মস্তিষ্ক অস্ত্রোপচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সহায়তা নিলেন তাঁরা এবং সফলও হলেন।

হিবার্টের মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা যায়, মাথার খুলির নিচের দিকে থাকা মার্বেলের আকারের পিটুইটারি গ্রন্থিতে ছিল ১১ মিলিমিটার বা শূন্য দশমিক ৪৩৩ ইঞ্চি আকারের ওই টিউমারটি।

গ্রন্থিটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসরণ করে, যা শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো নানা প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি ক্যারোটিড ধমনির খুব কাছাকাছি অবস্থিত। এই গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিগুলো মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে। পিটুইটারি গ্রন্থির কাছেই রয়েছে দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী অপটিক স্নায়ু।

হিবার্টের টিউমারটি অপটিক স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করলে তাঁর পার্শ্বদৃষ্টি সংকুচিত হয়ে আসে। শুরুতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন দেখা না গেলেও পরে তিনি বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে হোঁচট খেতে শুরু করেন। তীব্র ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার সমস্যাও শুরু হয় তাঁর।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অস্ত্রোপচারের সময় এআই টুলটি সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে শল্যচিকিৎসকদের মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আড়ালে থাকা রক্তনালি ও স্নায়ু এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। এর মাধ্যমে নিরাপদভাবে টিউমারের যতটা সম্ভব অংশ অপসারণ করা সম্ভব হয়।

হিবার্ট বলেন, ‘রোগীর দৃষ্টিকোণ থেকে এর সুফল আমি দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মাথার ভেতরে তো কোনো দিকনির্দেশনা নেই।’

তাঁর ভাষ্য, রোগটির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল তাঁর আবেগ ও মানসিক অবস্থার ওপর। তিনি বলেন, ‘অনেকে আন্তরিকভাবে সাহায্যের প্রস্তাব দিলেও আপনি অন্যের জন্য বোঝা হতে চান না।’

হিবার্ট বলেন, ‘আমাদের ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে আমি সব সময় ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি তৈরি করেছি। এই টিউমারকে সেই কাজ বন্ধ করতে দিতে চাইনি।’

শল্যচিকিৎসকেরা হিবার্টকে তাঁদের বিশেষভাবে তৈরি এআই টুল ব্যবহার করে বিশ্বের প্রথম এই অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেন, ‘ রোগীরা যদি গবেষণায় অংশ নিতে রাজি না হন, তবে চিকিৎসকেরা শিখবেন কীভাবে আর চিকিৎসারই বা অগ্রগতি হবে কীভাবে?’

অস্ত্রোপচারের সময় নাকের ভেতর দিয়ে এন্ডোস্কোপ বা দণ্ডের সঙ্গে যুক্ত পাতলা একটি ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে মাথার খুলির নিচের অংশে পৌঁছানো হয়। সেখানে টিউমারটি খুব কাছেই ছিল, তবে হাড়ের বিভিন্ন স্তর ও শক্ত ঝিল্লির আড়ালে থাকায় সেটি সরাসরি দেখা যাচ্ছিল না।

টিউমারটি অপসারণের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে মানুষের শারীরিক গঠন একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হওয়ায় কাজটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

জটিলতার হারও মানুষভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে পুরো টিউমার অপসারণ করা না যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ছিল শূন্য দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ।

এখানেই কাজে আসে এআই টুলটি। দ্বিতীয় একটি পর্দায় এআই টুলটি অস্ত্রোপচারের সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে। এটি শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতির গতিবিধি অনুসরণ করে এবং কোথায় রক্তনালি ও স্নায়ু থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তা চিহ্নিত করে দেখায়। একই সঙ্গে টিউমার অপসারণের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ জায়গাগুলোও নির্দেশ করে।

প্রযুক্তিটি অনেকটা মোবাইল ফোনের মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মতো। তবে এটি মানুষের মুখের পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক সময় আড়ালে থাকা শারীরিক কাঠামো শনাক্ত করে।

যুক্তরাজ্যে একজন শল্যচিকিৎসক বছরে গড়ে এ ধরনের ১০ থেকে ২০টি অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের আগে করা স্ক্যানের মাধ্যমে তাঁরা রোগীর শারীরিক গঠন সম্পর্কে ধারণা নেন।

গবেষকেরা পিটুইটারি টিউমার অপসারণের শত শত ভিডিও ব্যবহার করে তাঁদের এআই সিস্টেমকে প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন করেছেন। প্রতিটি ভিডিওতে রক্তনালি ও স্নায়ুর চারপাশ চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সিস্টেমটি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলো ‘চিনতে’ শেখে।

অস্ত্রোপচারটি পরিচালনায় সহায়তা করেছিলেন অধ্যাপক হানি মার্কাস। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ শল্যচিকিৎসক সারা জীবনে যতগুলো অস্ত্রোপচার দেখেন বা করেন, তার চেয়েও বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য দিয়ে এটি প্রশিক্ষিত। এটি একজন বিশেষজ্ঞের দ্বিতীয় জোড়া চোখের মতো কাজ করতে পারে।’

এটি অন্য অনেক পরীক্ষামূলক এআই টুলের বিপরীতে তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করে বলেও জানান মার্কাস। তবে গবেষক দলটি স্পষ্ট করে বলতে চায়, এআই টুলটি শুধু সহায়তা করছে এবং অস্ত্রোপচারের পুরো নিয়ন্ত্রণ শল্যচিকিৎসকদের হাতেই থাকছে।

গবেষকেরা বলছেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো শল্যচিকিৎসকদের জন্য চ্যাটজিপিটির মতো একটি ব্যবস্থা তৈরি করা। এর ফলে অস্ত্রোপচারকক্ষে শল্যচিকিৎসকদের জন্য আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতো একটি ব্যবস্থা থাকবে, যার কাছ থেকে তাঁরা চাইলে পরামর্শ নিতে পারবেন, আবার পরামর্শের সঙ্গে একমত না হলে তা উপেক্ষাও করতে পারবেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চ ও গুগলের অর্থায়নে গবেষক দলটি কয়েক বছর ধরে গবেষণাগারে এআই প্রযুক্তিটি পরীক্ষা ও উন্নয়ন করেছে। বাস্তব অস্ত্রোপচারে প্রথম ধাপের ফল নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট এবং এখন আরও বড় পরিসরে একটি পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অস্ত্রোপচারের পর জ্ঞান ফেরার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে হিবার্ট বলেন, ‘অপারেশনের পর চোখ খোলার সময় মনে হয়েছিল, আমি যেন ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছি। এক বছর ধরে আমি এত স্পষ্টভাবে দেখতে পাইনি।’

অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহে তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রতি কয়েক দিন পরপর আরও উন্নত হয়েছে বলে তিনি জানান।

হিবার্ট বলেন, ‘আমার দৃষ্টিশক্তিও ফিরে এসেছে এবং অস্ত্রোপচারের আগে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছিলাম, সবই চলে গেছে। এটি আমাকে আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।’

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য উদ্ভাবনবিষয়ক মন্ত্রী জেমস ফ্রিথ বলেন, সরকার–অর্থায়িত গবেষণার অংশ হিসেবে রিস হিবার্টের ‘জীবন বদলে দেওয়া অস্ত্রোপচার’ হওয়ায় তিনি আনন্দিত।

তিনি বলেন, ‘এআইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন এবং আমরা সব সময়ই নিশ্চিত করব, যাতে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।’

তবে একই সঙ্গে এআই যে সম্ভাবনা তৈরি করছে, তার সুফল নেওয়াও নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি যোগ করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত