Ajker Patrika

ভূমিকম্প নয়, তবে নেপালে প্রাণঘাতী ভয়াবহ বন্যা কী কারণে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভূমিকম্প নয়, তবে নেপালে প্রাণঘাতী ভয়াবহ বন্যা কী কারণে
নেপালের নুয়াকোট জেলার দেবীঘাটে আকস্মিক বন্যা ও ধসের পর কাদায় ঢেকে যাওয়া একটি পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন এক বাসিন্দা। ছবি: এএফপি

নেপালে বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার কারণ কোনো ভূমিকম্প নয়, বরং হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের শক্তিশালী ধস। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করলেও পরে তথ্য সংশোধন করে জানায়, সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। ঘটনাটি ছিল হিমবাহ ধসের সঙ্গে সৃষ্ট ডেব্রিস ফ্লো বা ধসের কারণে সৃষ্ট সবকিছুর প্রবাহ, যা নিচের দিকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে—নেপাল-চীন রাসুয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লহেন্দে নদীতে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল ধস নেমে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে। লহেন্দে খোলা ভোতে কোশি নদীর একটি শাখা, যা চীন থেকে নেপালে প্রবেশ করেছে।

ধসটির শক্তি এত বেশি ছিল যে এর কম্পন পরে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড করা হয়। তবে ইউএসজিএস স্পষ্ট করেছে, এটি ভূমিকম্পের কম্পন ছিল না।

নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরাও ধারণা করছেন, হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধসই বন্যার সূত্রপাতের কারণ। সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানান, গত ১৪ মাসে লহেন্দে খোলা নদীতে এটি দ্বিতীয় বড় বন্যা। এবার বরফ-পাথরের ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়ার পর হঠাৎ সেই বাধা ভেঙে গিয়ে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসে।

জলবায়ু কর্মী অধিকারী বলেন, জলবায়ু বিপর্যয়ের ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা সম্ভব। তিনি বলেন, জলবায়ু বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে মানুষের জীবন ও জনপদ রক্ষা করা সম্ভব।

ভোতে কোশি নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। নদীটি নেপালে প্রবেশ করে ত্রিশূলী নদীতে মিশেছে। ত্রিশূলী নদী পরে ভারতের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গার অন্যতম উপনদী গণ্ডক নদীতে পরিণত হয়েছে। গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। সেই বন্যায় নয়জন নিহত এবং ২৪ জন নিখোঁজ হন। একই বন্যায় নেপাল ও চীনের মধ্যে সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যায়। ফলে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে পরিবহন ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়।

একটি আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, গত বছরের ওই বন্যার কারণ ছিল তিব্বতের একটি সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়া। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নিয়মিত ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর মাত্রা ও ঘনত্ব দুটোই বাড়ছে।

বন্যায় নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রাসুওয়া ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।

বিপর্যয়ের পর অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত