Ajker Patrika

নির্বাচনী প্রচারণা: প্রচারে আক্রমণ ছেড়ে প্রতিশ্রুতিতে জোর

  • এখন দুর্নীতি-চাঁদাবাজি দমনেই গুরুত্ব শীর্ষ নেতাদের
  • দলগুলোর মনোযোগ এবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মন জয়ে
  • বাক্যবাণ ছোড়ার ক্ষেত্রে শুরুর তুলনায় সংযত সবাই
  • কথা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক দেখা গেলে ভোটারের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে: বিশ্লেষক
রেজা করিম, ঢাকা 
নির্বাচনী প্রচারণা: প্রচারে আক্রমণ ছেড়ে
প্রতিশ্রুতিতে জোর
ফাইল ছবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি। সেদিন থেকেই প্রধান দলগুলোর প্রার্থী তথা নেতারা প্রতিপক্ষকে কথার যুদ্ধে ঘায়েল করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। তবে নির্বাচনী প্রচারণা একটি সপ্তাহ পেরোতেই মাঠের রাজনীতির কৌশলগত রূপান্তর চোখে পড়ছে। ভোটের যুদ্ধে সক্রিয় দুই শীর্ষ দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয়ের প্রচারণায় তা স্পষ্ট।

একে অন্যকে তিক্ত দোষারোপ করা ও খুঁত খোঁজার কৌশল থেকে সরে এসে দলগুলোর মনোযোগ দৃশ্যত এবার ভোটারদের মন জয়ে। দুই বড় দলই এখন ভোটারদের সামনে তুলে ধরছে নানা প্রতিশ্রুতি, যার কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ।

বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের গত কয়েক দিনের নির্বাচনী প্রচারণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের প্রচারণার ভাষা ও বার্তায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। নেতারা পরস্পরকে বাক্যবাণ ছোড়ার ক্ষেত্রে শুরুর তুলনায় অনেকটাই সংযত।

২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভা দিয়ে শুরু হয় বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণার কাজ। এর পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সিলেটের পর পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গ সফর করেছেন তিনি। অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও সমানতালে জনসভা করছেন দেশের নানা প্রান্তে। উত্তরবঙ্গ সফর দিয়ে প্রচারণা শুরু করেছেন তিনি। বর্তমানে রয়েছেন নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ফেনী সফরে।

এখনকার জনসভা ও পথসভায় জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন দুই পক্ষের দুই নেতা। কিন্তু শুরুতে পারস্পরিক দোষারোপের তীব্রতায় অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায় জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। একে অন্যের বিরুদ্ধে অতীতে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি জোরেশোরে টেনে আনেন ধর্ম বিষয়টিকেও। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সচেতন মহল সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেই জায়গা থেকে বের হয়েছেন নেতারা।

দুটি প্রধান জোটের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রধানের বক্তৃতায় এখন পারস্পরিক আক্রমণের বদলে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আগামী সরকার তথা রাষ্ট্র নিয়ে তাঁদের পরিকল্পনা। ক্ষমতায় গেলে তাঁরা কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন এবং দেশের মানুষের জন্য কী কী কল্যাণের ব্যবস্থা করবেন, সে বিষয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছেন তাঁরা। অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে বিশেষ করে স্থান পাচ্ছে দুর্নীতি দমন ও চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়গুলো।

বিএনপির সভাগুলোতে ‘জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ ও ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার কথা জোর দিয়ে বলছেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষায়, ‘দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরব।’ তারেক বলেছেন, দেশের মানুষ আর চাঁদাবাজি, লুটপাট ও দখলদারির রাজনীতি দেখতে চায় না। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করার সুযোগ পাবে না। অপরাধীকে দলীয় পরিচয় নয়, তার অপরাধ দিয়েই বিচার করা হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, তরুণ-যুবকদের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, খাল খননসহ আরও নানা রকম জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরছেন বিএনপির চেয়ারম্যান।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান তাঁর বক্তৃতায় নৈতিকতা ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘দুর্নীতির মূলে আছে নৈতিক অবক্ষয়। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপস নয়, আমানতদার নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তন আনব।’ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করে জামায়াতের আমির বলছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে চাঁদাবাজির জায়গা থাকবে না। দলীয় পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিবেচ্য। সর্বোপরি ন্যায়বিচারের (ইনসাফ) ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি।

দোষারোপ থেকে বেরিয়ে বিএনপির জনকল্যাণমুখী গঠনমূলক প্রচার নিয়ে জানতে চাইলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আসলে পরস্পর দোষারোপ করে তো কোনো লাভ নেই। নির্বাচন মানেই তো আমি কী করতে পারি, আমরা কী করতে পারি দেশের জন্য। কাজেই সেই ইতিবাচক কথাগুলোই আমরা বলছি।’

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দোষারোপের রাজনীতি দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। এটাকে আমরা ইতিবাচক মনে করি, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু রাজনীতির ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে।’

নির্বাচনী প্রচারে দুই পক্ষের প্রচার কৌশলের পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও। তাঁদের মতে, পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট এবং আওয়ামী লীগবিহীন ভোটের মাঠের বাস্তবতা মেনেই দলগুলো এই কৌশল নিয়েছে। কারণ, দলগুলো ভালো করেই জানে, অতীতের রেকর্ডের পাশাপাশি বর্তমান আচরণ, অঙ্গীকারগুলোর বাস্তবতা এবং রাজনীতি ও সরকারে অভিজ্ঞতা সবকিছুই ভোটের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তাই শুরুতে নেতাদের মুখে আবেগময় ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য বেশি থাকলেও এখন নির্বাচনী প্রচার ঝুঁকেছে বাস্তবভিত্তিক প্রতিশ্রুতির দিকে।

তবে বক্তৃতার কথা আর বাস্তবতার মধ্যে ফারাক দেখা গেলে ভোটারের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও বলছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। তাঁরা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতারা সংযত হলেও এখনো স্থানীয় পর্যায়ে তার পুরো প্রতিফলন নেই। বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় দলগুলোর কেন্দ্র থেকে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জন্য কঠিন নির্দেশনা যাওয়া জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এটা ধরে রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দলের নেতা-কর্মীরা যেভাবে সহিংসতায় জড়িয়ে যাচ্ছে, সেটাই সমস্যা। তাদের ওপর নির্দেশনা থাকা জরুরি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত