Ajker Patrika

হাওরের কান্না

সম্পাদকীয়
হাওরের কান্না

আমাদের দেশে ধানের চাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ করে থাকেন হাওরের কৃষক। কিন্তু প্রতিবছর আগাম বন্যা, শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকের মুখের হাসি ফিকে হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই হাওরের কৃষকের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে হাওরের কৃষকের অবস্থা একটু ভিন্ন। কারণ, অন্যান্য অঞ্চলের কৃষক ধান বাদে আরও নানা ধরনের কৃষিপণ্য চাষ করতে পারেন। কিন্তু হাওরাঞ্চলের কৃষক বছরে একবার মাত্র ফসল ফলাতে পারেন।

হাওরের ধান কাটার মূল চ্যালেঞ্জ হলো সময়। এখানে প্রকৃতি কৃষকের জন্য খুব কম সময় বরাদ্দ দেয়। আর এ বছর অসময়ে পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরাঞ্চল তলিয়ে গেছে। শ্রমিকসংকটের কারণে কৃষকেরা বেশির ভাগ ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

যেটুকু ধান কাটতে পেরেছেন, সেটুকুও রোদের অভাবে শুকাতে পারেননি। ফলে ধান থেকে চারা গজিয়েছে। এই ধান কৃষকের কোনো কাজে আসবে না।

এ বছর বিশেষ করে সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলের হাওরগুলোতে ধানের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার অভাবে কৃষকের দুঃখ আরও দীর্ঘতর হবে। কারণ, তাঁরা এই এক ফসল দিয়ে সারা বছরের পরিবারের খরচ জোগান।

হাওরাঞ্চলের কৃষকের দুঃখ লাঘবে বৈজ্ঞানিকভাবে বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি। কিন্তু প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণ, সংস্কারের দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির কারণে তাঁরা এর কোনো সুবিধা পান না। টেকসই এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে কৃষক অন্তত নিশ্চিন্তে ধান কাটার সময়টুকু পাবেন।

শ্রমিকসংকট লাঘবে প্রথাগত কাস্তে দিয়ে ধান কাটার বদলে ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ মেশিন ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটার ব্যবস্থা করা কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। প্রয়োজনে কৃষককে কিস্তিতে বা বিনা সুদে এ যন্ত্র কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার বর্তমানে হারভেস্টার মেশিন ক্রয়ে ভর্তুকি দিলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

হাওরের প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ হারভেস্টার এবং রিপার মেশিন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া এই যন্ত্রগুলো মেরামত করার জন্য স্থানীয়ভাবে দক্ষ মেকানিক প্রস্তুত রাখতে হবে।

এ অঞ্চলের মাটির উপযোগী বিশেষ জাতের ধান উদ্ভাবনের কথা ভাবতে হবে। যাতে স্বল্প সময়ে ধান পেকে ওঠে। স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে আবহাওয়ার নিয়মিত বার্তা কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য হাওরের কৃষিকে সুরক্ষিত করতে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার চেয়ে রাষ্ট্রের নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা বেশি প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে কৃষক যাতে নিঃস্ব না হয়, সে জন্য ‘কৃষিবিমা’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সহজ শর্তে এবং দ্রুত সময়ে কৃষিঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক কার্ড দিয়ে ‘দায় শেষ’ বলে ভাবলে চলবে না। মনে রাখতে হবে, হাওরের ধান শুধু কৃষকের খাদ্য নয়, এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত