Ajker Patrika

রবীন্দ্রজয়ন্তী

‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান’

তাপস মজুমদার 
‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান’

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত পৃথক দেশ ছিল না। ছিল এক দেশ। নাম তার ভারতবর্ষ। সুতরাং ‘দুর্ভাগা দেশ’ বলে সম্বোধন বা তার আচার-ব্যবহারের অসংগতি অথবা নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণের মহামিলনের যে আহ্বান ও আকুতি রবীন্দ্রনাথের বয়ানে রয়েছে, তার সবই ভারতকে ঘিরে—যার একটি অংশ আমাদের এই ভূখণ্ড বাংলাদেশ। অর্থাৎ একই সঙ্গে আমাদেরকে ঘিরেও উচ্চারিত সেসব বয়ান। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে আমাদের যোগ অবিচ্ছিন্ন।

ভূমিকাটুকু অবতারণা করা এ জন্য যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মভাবনামূলক একটি কবিতার নাম দেন ‘ভারততীর্থ’। বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়েও আমরা যদি সেটিকে স্বদেশতীর্থ হিসেবে চিন্তা করি, তাহলেও হয়তো কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না বরং সুবিধা হতে পারে। এই কবিতায় তিনি আমাদের অতীত ইতিহাস অবলোকন ও বিশ্লেষণ করে এই ভূখণ্ডের মহামিলনের মন্ত্রকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মূল ফোকাস সেখানেই।

কেহ নাহি জানে/কার আহ্বানে/কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে/এলো কোথা হতে/সমুদ্রে হল হারা।

মানুষই এখানে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে। সমুদ্র এখানে বিশ্বমানবের প্রতিভূ। মানুষের যে সত্তা, তাকে সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন নানান নদীর ধারা বিভিন্ন নাম নিয়ে, বিচিত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, নানা স্থান পরিভ্রমণ করে, অবশেষে সাগরে মেশে এবং তার অতীতের সব পরিচয় লীন হয়ে যায় সেই সাগরে, এ সংসারও তেমন। নানা জায়গা থেকে নানা পরিচয় নিয়ে আসা মানুষও তেমনি মানবসমুদ্রে এসে মিশে যায়। আমাদের ভূখণ্ডে তাই-ই ঘটেছে। যুগে যুগে কালে কালে বহু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে এসেছে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক আচরণ, অবস্থানের স্থান ভিন্ন হলেও সে মূলত মানুষ। তার এই মানুষ পরিচয়টিই প্রধান। কবিতার মধ্যে মানবজাতির সামগ্রিকতাকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এই যে সমগ্রতাবোধ এই বোধই আত্মবোধ। সবাইকে কাছে টানার ও কাছে পাওয়ার মন্ত্র।

রণধারা বাহি/জয়গান গাহি/উন্মাদ কলরবে

ভেদি মরুপথ/গিরি পর্বত/যারা এসেছিল সবে

তারা মোর মাঝে/সবাই বিরাজে/কেহ নহে নহে দূর

আমার শোণিতে/রয়েছে ধ্বনিতে/তারি বিচিত্র সুর।

বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দিক থেকে আর্য-শক-পাঠান-মোগলরা, জয়গান গেয়ে, রক্ত ঝরিয়ে, মরু গিরি অতিক্রম করে, হইহুল্লোড় করে এ দেশ জয় করতে এসেছিল। সাম্রাজ্যের লোভে এসে অবশেষে তারা এখানে নিজেদের সত্তা হারিয়ে এই ভূখণ্ডের মহত্ত্বে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তারা তাদের সেই মূল পরিচয়ে নেই। এটাই এই ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য। আমরাই সেই বিলীয়মান বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার।

আমাদের সংকীর্ণতা, ক্ষুদ্র স্বার্থ আর ভুল-বোঝাবুঝি মানুষে মানুষে যে বিভেদ বাড়িয়ে তুলেছে তার মধ্যে কোনো ভালো দিক নেই। থাকতে পারে না। বরং সেখানে রক্ত আছে, অসুস্থতা আছে, দুঃখ আছে, দহন আছে, অপমান-অসম্মান আছে, ভয়-ঘৃণা-হিংসা আছে। ‘ওরা কাজ করে’ কবিতায় তিনি বলছেন—

রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত আঁখি।

শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।

তার মানে এসব থেকে বুঝতে হবে হিংসা-দ্বেষ-ক্ষোভ-লোভ কতটা অসার! সেই যে দোর্দণ্ড প্রতাপে মোগল-পাঠান এসেছিল, আজ কি তাদের কোনো চিহ্ন আছে? নেই। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে একসময় প্রবল পরাক্রমে এসেছিল ইংরেজ। তাদেরও তেজ ছিল বিপুল। কিন্তু আজ আবার সেসবেরও রেখামাত্র নেই।

তপস্যা বলে/একের অনলে/বহুরে আহুতি দিয়া বিভেদ ভুলিল/জাগায়ে তুলিল/একটি বিরাট হিয়া।

এই বিশালতাকে ধরে একটি মহৎ হৃদয়কেই আবার আমাদের জাগিয়ে তুলতে হবে। আত্মবোধের উদ্বোধন ঘটাতে গেলে ব্যক্তিসত্তাকে বিলীন এবং বহুকে আত্তীকরণ করে এক মহাবিরাটে প্রবেশ করাতে হবে। তবেই প্রাণে প্রাণ মিলবে। নতুন করে জন্ম নেবে ‘বিশাল প্রাণ’। আজ আমাদের এর বড্ড প্রয়োজন। জীবনের মূল মন্ত্রের প্রকৃত সুরটাকে ধরে কাজ করে যাওয়াই হবে প্রধান দায়িত্ব।

এসো হে আর্য/এসো অনার্য/হিন্দু মুসলমান

এসো এসো আজ/তুমি ইংরাজ/এসো এসো খ্রিস্টান।

এসো ব্রাহ্মণ/শুচি করি মন/ধর হাত সবাকার এসো হে পতিত/হোক অপনীত/সব অপমানভার।

কি নরম কোমল অসাধারণ আহ্বানে সবাইকে মন শুচি করে, পরস্পরের হাত ধরে, অপমানভারমুক্ত চলার কথা বলা হয়েছে এই অংশে! রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় ওসব লিখেছেন বলে নয়, এর প্রাসঙ্গিকতা আমাদের সময়ে রয়েছে বলেই তাঁর কবিতা বা গানকে আমাদের গ্রহণ করা। যেসব ক্ষণজন্মা পুরুষ যুগে যুগে আবির্ভূত হন, সেসব মানব প্রেমিককে মহাকালই তার তুলাদণ্ডে মূল্যায়ন করে। অতঃপর কালের তুলিতে এঁকে নির্ণয় করে দেয় তাদের অবস্থান। কোনো একটি বিশেষ সময় বা অবস্থা সে মূল্যায়নে কাঁটা ফেলতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কেন মানুষের মহামিলনের পথকে জটিল করে তুলব! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জগতের যে অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন, তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নিজেদেরকে যেটুকু পুনরায় বিন্যস্ত করা দরকার, সেটুকু করে নিয়ে হাতে হাত রেখে চলাই তো উত্তম। যে ভূখণ্ড অজস্র জাতিগোষ্ঠীর মিলিত প্রবাহের উত্তরাধিকার বহন করছে, বহুকে গলিয়ে এক-এ রূপান্তর করেছে সে তো শক্তিমান। সেই-ই তো হবে ন্যায়নিষ্ঠ, উদার, কল্যাণকামী, সত্যবাদী, অনুভবপরায়ণ, সভ্য, রুচিশীল, কর্মঠ জাতি! আমরা কি সেই শক্তির ওজনটুকু বুঝতে অক্ষম!

লেখক: কলামিস্ট, সাংস্কৃতিক সংগঠক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

লন্ডনে পাপনের আইসক্রিম খাওয়ার ছবি ভাইরাল

‘মোদির অনুরোধে অমিত শাহকে বাঁচান শারদ পাওয়ার, পরে তাঁর দলই ভেঙে দেয় এই জুটি’

নেত্রকোনায় যৌতুক ও নির্যাতনের মামলায় ব্যাংক কর্মকর্তা কারাগারে

সঙ্গী করে ক্ষমতায় আরোহণ, সেই বিজেপির হাতেই পতন হয়েছে যে ৬ মুখ্যমন্ত্রীর

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে চাকরি, ফ্রেশারদের আবেদনের সুযোগ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত