Ajker Patrika

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনন্য স্কুল

মামুনুর রশীদ
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনন্য স্কুল

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং সেন্টার ফর স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস যৌথভাবে দীর্ঘদিন যাবৎ একটি আবাসিক কর্মশালাভিত্তিক স্কুলের আয়োজন করে আসছে। স্কুলটির একাদশ বার্ষিকী টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়। কুমুদিনী হাসপাতাল ভারতেশ্বরী হোমসে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ধরনের নৃশংসতা এবং গণহত্যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আগে থেকেই এ ব্যাপারে নানা ধরনের তদন্তকাজও সম্পাদিত হয়েছে। এই ঘটনায় দানবীর রণদা প্রসাদ সাহাকে তাঁর পুত্রসহ তুলে নিয়ে যায়। তারপর তাঁদের আর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। ধরে নেওয়া যেতে পারে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত রাজাকাররা দুজনকেই নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

এবারের আবাসিক স্কুলটির অনুষ্ঠান হয়েছে কুমুদিনী কমপ্লেক্সে, যেখানে ২৯ জন তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। বিষয়টি নিয়ে দেশি-বিদেশি অধ্যাপকেরা কর্মশালায় তাঁদের বক্তব্য দেন। এখান থেকেই অংশগ্রহণকারীরা পাথরাইল তাঁতশিল্প এবং আটিয়ার মসজিদ পরিদর্শন শেষে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত মওলানা ভাসানীর ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন স্থলে আসেন। এই অংশটি অংশগ্রহণকারীদের কাছে তুলে ধরার জন্য আমি ও রবীন্দ্র সৃজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর শাহেদ দায়িত্ব নিই। এই স্কুলের কর্মপরিকল্পনা এবং পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্বেচ্ছাসেবকেরা, তাঁরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজগুলো করে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবকদের এবং অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা বিশেষভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছে। মফিদুল হককে ধন্যবাদ, তিনিই আমাকে যুক্ত করেছেন এই কর্মে।

কাগমারী সম্মেলন আমাদের জাতির ইতিহাসে এক অসাধারণ ঘটনাই নয়, আমাদের জাতির ইতিহাসে এক মূল্যবান ঘটনা। সাতচল্লিশের স্বাধীনতা আমাদের পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য একটা যে বড় ধরনের প্রতারণা, এটা বুঝতে মওলানা ভাসানীর একেবারেই সময় লাগেনি। তাঁর প্রিয় দুই সহচর একজন সামসুল হক, আরেকজন শেখ মুজিব, তাঁদের নিয়ে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর পাকিস্তানকে মেনে নিয়েই কাজকর্ম শুরু করেছিলেন। কিন্তু পদে পদেই তিনি দেখেছেন বঞ্চনা ও প্রতারণা।

প্রথম আঘাতটা আনলেন জিন্নাহ নিজেই, আমাদের ভাষার ওপর আক্রমণ করে। তাঁর বশংবদ খাজা নাজিম উদ্দিন এবং পরে নুরুল আমীন একই ধারা অনুসরণ করলেন। কিন্তু মওলানা ভাসানী এক অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে একের পর এক আন্দোলন রচনা করেছেন এবং কারাবরণও করেছেন। এসব বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একপর্যায়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতভেদ শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ডাকলেন কাগমারী সম্মেলন।

সে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। হাজার হাজার কর্মী, সমর্থক, দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক নেতারা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যিক, শিল্পী—সবাই এসে হাজির হলেন ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখে কাগমারীতে। আমরা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গেলাম। এখন আর সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তর নেই। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে জাদুঘরটি আছে। যেখানে রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই দরবার হলটি পুনর্নির্মিত হয়েছে। জমিদারবাড়িটি আছে, স্কুল আছে, দিঘিটি আছে। সেই সময়ে কাগমারী যাওয়ার দুর্গম পথ অতিক্রম করে ভারত থেকে সাহিত্যিক এবং তখনকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হুমায়ুন কবির এসেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রাজনীতিবিদেরা এসেছিলেন, একজন নৃত্যশিল্পীও এসেছিলেন। ঢাকা থেকে শিল্পী-সাহিত্যিকেরা এসেছিলেন, তাঁদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাও হয়েছিল।

এর মধ্যে আমরা শতাব্দীর আলো নামে আদিব রশীদ মামুন নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি দেখিয়েছি। সেখানে দেখানো হয়েছে হাজার হাজার লোকের রান্না করা হচ্ছে, সেই রান্না করা খিচুড়ি নৌকায় রেখে পরিবেশন করা হচ্ছে। মওলানা ভাসানীর পুত্রকে দিয়ে মওলানার অভিনয় করিয়ে জনসভা দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে উপস্থিত কর্মীদের বিনোদনের জন্য লাঠিখেলা, জারিগান, সারিগানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এত বড় কর্মকাণ্ড মওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক ক্ষমতার জন্যই সম্ভব হয়েছিল।

এখান থেকে একটা ভাঙনের শুরু হয়—স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মওলানার মতভেদ তীব্র হয়ে ওঠে। এখানে তিনি পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বিদায় দেন। আওয়ামী লীগকে তিনি অক্ষত রাখেন কিন্তু নিজে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সম্মেলন ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার—মওলানা ভাসানী একজন রাজনীতিক, তিনি সেই সময় কী করে বুঝলেন যে, রাজনীতি ও সংস্কৃতি হাতে হাত ধরে চলতে হয়? এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীনের মতো লোকেরা। দেশে লোকায়ত শিল্পকে যে রাজনীতির সঙ্গে থাকতে হবে, এটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। কাগমারীর এই দুর্গম পথে তিনি বিখ্যাত সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এসেছিলেন।

কাগমারীতে অংশগ্রহণকারীরা সেসব ঘুরে ঘুরে দেখেন আর নানা প্রশ্ন করেন। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ও শাহেদ খুবই আনন্দ পেয়েছি। মেহজাবিন, অগ্নি এবং আরও অনেকের মাঝেই নানা রকম প্রশ্ন জাগে, যা আমাদের নতুন করে ভাববার অবকাশ দিয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই আইনের শিক্ষার্থী অথবা আইন পাস করে গেছেন। কেউ কেউ এখনো চাকরিরত আছেন। আবার দুজন বিদেশিও ছিলেন, যাঁদের বাংলাদেশের গণহত্যা বিষয়ে প্রচুর আগ্রহ রয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কিছু বিদেশি অধ্যাপক, যাঁরা বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়ে অবগত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সম্পর্কেও যথেষ্ট অবহিত। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষক এই স্কুলের সঙ্গে জড়িত হয়ে তাঁদের ভাবনাকে উন্মুক্ত করেছেন। যদিও আমি এবং শাহেদ যুক্ত হয়েছি একটু পরে, তবু দুদিনে আমাদের অংশগ্রহণে মনে হয়েছে আমরা অনেক দিন ধরেই আছি। সবার সঙ্গে প্রীতি বিনিময় এমন একটা পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাল যে মনে হলো তাঁরা আমাদের অনেক দিনের চেনা।

মাঝে মাঝে হতাশ হই, হয়তো আমাদের তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে খুবই অনাগ্রহী। কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের দিন-রাতের পরিশ্রম দেখে অনুভব করলাম, মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের নতুন এক চেতনায় সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শুধু যে একটি নির্লিপ্ত সংগ্রহশালা নয়, একে জীবন্ত ও জাগ্রত রাখতে নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতার যে প্রয়োজন, তা সত্যিই নতুন চিন্তার উদ্রেক করে।

কুমুদিনী হাসপাতাল ও ভারতেশ্বরী হোমস আমার অবাল্যের এক কৌতূহলের জায়গা। কী করে রণদা প্রসাদ সাহা বিনা চিকিৎসায় তাঁর মায়ের মৃত্যুকে স্মরণ করে সারা বাংলাদেশের অসুস্থ মানুষের জন্য এ রকম একটি কীর্তি করে গেলেন, যেখানে বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়! বর্তমানের চিকিৎসা ব্যবসার সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। আর সেই সঙ্গে মেয়েদের জন্য একেবারেই অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে গেলেন। পাশাপাশি এর অর্থায়নের জন্য নারায়ণগঞ্জে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানও রেখে গেলেন। এই দূরদর্শিতা ভারতবর্ষের কজন মানুষ দেখেছেন? তিনি প্রথম মহাযুদ্ধে সৈনিক ছিলেন। একজন সৈনিকের উচ্চাভিলাষ যদি জনকল্যাণকর ও আদর্শে রূপান্তরিত হয়, সেটিও ভাববার বিষয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর পরিচয় ছিল। ইস্কান্দার মির্জা নামে হাসপাতালের একটি কক্ষের নামকরণ তিনি করেছিলেন।

কিন্তু তাঁর জনকল্যাণই একটি নিষ্ঠুর পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে অপরাধ হয়ে দাঁড়াল। তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। হত্যা করলেই যে সবকিছু শেষ হয়ে যায় না, তার প্রমাণ এই কুমুদিনী ট্রাস্ট। সেই হাসপাতালের আছে ভারতেশ্বরী হোমস এবং নতুন করে হয়েছে নারীদের জন্য একটি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট। রণদা প্রসাদ সাহার বংশধরেরা অত্যন্ত দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং গভীর মমতা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচিয়ে রেখেছেন।

মওলানা ভাসানী আমাদের বাঙালিদের জীবনে এক আশীর্বাদ—কত কৃষক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন! তাঁর কাছে এ দেশের বামপন্থী, কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রী সবাই আশ্রয় পেতেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো মিথ্যা মামলায় দেশের বিভিন্ন নেতা-কর্মী, শেখ মুজিবসহ কত সামরিক এবং বেসামরিক আমলা, কর্মকর্তা, কর্মচারীকে ফাঁসানো হয়েছিল। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এমন এক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল যে, পাকিস্তান ক্যান্টনমেন্টে অন্তরীণ সবাইকে আইয়ুব খান মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এই দুটি স্থান পরিদর্শন করে এর তাৎপর্য অনুভব করা প্রতিটি তরুণের অবশ্য কর্তব্য। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিঃসন্দেহে তরুণদের নিয়ে গেছে এক আবিষ্কারের সন্ধানে।

আমাকে তরুণেরা প্রশ্ন করেছেন—এসব আমরা আগে কেন জানতাম না? রাজনীতির একটা চোরা পথ আছে। সেই পথটি হচ্ছে তথ্য সংকোচন। সেই সংকোচনের পথই এসব অন্ধকার করে রেখেছিল আর এই অন্ধকারকে আলোকিত করার দায়িত্ব এখন ওদের মতো তরুণ-তরুণীদের।

অধ্যাপক শাহেদ এবং আমি একসঙ্গে ঢাকায় ফিরছিলাম। বারবার মাথাটা ভারী হয়ে আসছিল। সেই সঙ্গে একটা অসহায়তা। কেন আমরা সবাই মিলে এই দায়িত্বটা পালন করতে পারলাম না, এতগুলো বছর কেন নষ্ট হয়ে গেল? জবাব মেলে না। শুধু রাত্রিই গভীর হয়, আশায় থাকি এই তরুণ-তরুণীরা যদি ভোরটা নিয়ে আসতে পারে, তখন তারাই ডাকবে—উঠুন, ভোর হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত