Ajker Patrika

একটি ট্র্যাজিক কমেডি

সম্পাদকীয়
একটি ট্র্যাজিক কমেডি

পরিবানুর আর কীই-বা করার ছিল? স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পুলিশ বা আদালতে ঘুরে বেড়ানোর মতো উপায় কি তাঁর ছিল? মামলা করেছিলেন বটে, কিন্তু অভিযুক্তরা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন প্রকাশ্যে।

হুমকি দিচ্ছিলেন। তাই সবচেয়ে সহজ পথটাই বেছে নিয়েছেন তিনি। স্থানীয় বিএনপির এক বড় নেতার আহ্বানে কিছু টাকা হাতে পেয়ে মামলা আর চালাবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আসামিরা অভিযোগপত্র থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। উচ্চপর্যায় থেকে সুপারিশও করা হয়েছে। আসামিদের উল্লাস কে ঠেকাবে?

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়া বা না হওয়া নিয়ে যাঁরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন, তাঁদের সবার জন্যই এই ঘটনা একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে থাকবে। শিরোনামে আমরা একটি বিজাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছি ইচ্ছে করেই। কারণ, ট্র্যাজেডির ভেতর কমেডিকে এই শব্দটি ধারণ করে বলে ঘটনাটিকে এই শব্দই মোক্ষম আঘাত করতে পারে।

ট্র্যাজিক অংশটাই আগে বলা হোক। গত বছরের ৬ মার্চের ঘটনা। আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাইকে পুলিশে তুলে দেওয়া নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল রাজশাহী নগরের দড়িখড়বোনা এলাকায়। মারপিটের মধ্যে পড়ে ছুরিকাহত হন গোলাম হোসেন নামের একজন রিকশাচালক। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসারত অবস্থায় সে বছরেরই ১১ মার্চ মৃত্যু হয় তাঁর। বোয়ালিয়া থানায় এ ব্যাপারে মামলা করেছিলেন গোলাম হোসেনের স্ত্রী পরিবানু। পরিবানু তখনো জানতেন না, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করার মানে কী হতে পারে! যাঁদের নামে মামলা করেছেন তাঁরা সবাই এলাকার ডাকসাইটে নেতা। মামলার পর পুলিশ কি সততার সঙ্গে গিয়ে সবাইকে পাকড়াও করল এবং আইনের শাসনের পরাকাষ্ঠা দেখাল? মোটেই না। প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো আসামিদের টিকিটিও ছুঁয়ে দেখেনি পুলিশ।

টিকতে না পেরে কিছুদিনের মধ্যে এলাকা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন পরিবানু। তারপর ফিরে এসেছেন। মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন-অর-রশীদ পরিবানুকে ডেকে পাঠান। বলেন, ‘তুমি কি মামলা চালাতে পারবা? না চালালে কিছু টাকা নিয়ে আপস করে নাও।’ অনেক ভেবে পরিবানু প্রস্তাবটা গ্রহণ করেছেন। মামলা চালাবেন না বলেছেন। কিছু টাকা এসেছে তাঁর কাছে।

সত্যিই তো! পরিবানু কি জানতেন না, আমাদের দেশে আইনের শাসন হচ্ছে কাজির গরুর মতো হাফ প্যান্টের বুক পকেট? বিএনপির সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা! ভাবা যায়! ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সব বীরপুঙ্গবই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে কী হয়, জনগণ তা তো বছরের পর বছর দেখেই চলেছে। পরিবানুর জন্যইবা তার অন্যথা হবে কেন? কোনো চলচ্চিত্র হলে পরিচালককে বলা যেত, স্বামী হারানোর যন্ত্রণার দৃশ্যধারণ করে ক্ষমতাসীন এক নেতার হাত থেকে টাকা নিয়ে পরিবানুকে দিয়ে নাচের একটি দৃশ্যের অভিনয় করান। আর সেই নাচের সঙ্গে বাজতে দিন একটি গান: ‘স্বামীর বদলে টাকা পেলাম, তাক দুমাদুম দুম...।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত