
বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের পাতা ওল্টালে পেলে, ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা নাজারিও রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের নাম জ্বলজ্বল করে। কেউ বল নিয়ন্ত্রণে জাদুকর, কেউ গোলমুখে খুনে মেজাজের জন্য পরিচিত, আবার কারও শক্তির জায়গা ছিল গতি আর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং। তবে এই মহানায়কদের খেলায় কোথাও না কোথাও মানবিক কোনো খামতি বা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে যেভাবে একাই গুঁড়িয়ে বিদায় করে দিল নরওয়ে, তাতে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড কি সত্যিই একজন মানুষ, নাকি ল্যাবরেটরিতে তৈরি কোনো বিশেষ ‘বায়ো-ইঞ্জিনিয়ার্ড’ অ্যান্ড্রয়েড বা রোবট?
বর্তমান যুগে যেখানে ফুটবলারদের অত্যন্ত সংবেদনশীল স্পোর্টস কারের মতো সূক্ষ্মভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, সেখানে নরওয়ের এই ৯ নম্বর জার্সিধারী যেন এক ভিন্ন গ্রহের মহাকাশযান। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির দানবীয় শরীর, চোখের পলকে ডিফেন্ডারদের পেছনে ফেলে যাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য গতি এবং গোলপোস্টের সামনে যান্ত্রিক নিখুঁত কার্যকারিতা—সব মিলিয়ে হালান্ডকে দেখে মনে হয় তিনি কোনো অত্যাধুনিক অ্যাথলেটিক ল্যাবরেটরি থেকে সরাসরি ফুটবল মাঠে নেমে এসেছেন।
মাঠে যখন হালান্ড গোল লক্ষ্য করে ছুটতে শুরু করেন, তখন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের হাঁটু কাঁপতে থাকে। তবে হালান্ডের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পেছনে শুধু জিনগত সুবিধাই নয়, বরং নিজের শরীর থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট বের করে নেওয়ার জন্য তাঁর বৈজ্ঞানিক ও কঠোর নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রার বড় ভূমিকা রয়েছে। আদিম ধাঁচের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে অদ্ভুত ঘুমের রুটিন—সবকিছু মিলিয়ে নিজের জীবনকে এক অনন্য গবেষণার বিষয়ে পরিণত করেছেন এই স্ট্রাইকার।
আধুনিক স্পোর্টস নিউট্রিশনে যেখানে প্রোটিন শেক আর মেপে মেপে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়, সেখানে হালান্ড বিশ্বাস করেন আদিম ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। স্প্যানিশ গণমাধ্যম ‘হোলা!’-এর তথ্যমতে, তিনি প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার ক্যালরি খাবার গ্রহণ করেন। তাঁর খাবারের তালিকায় প্রধান উপাদান হলো স্থানীয় কসাইয়ের কাছ থেকে সংগ্রহ করা উন্নতমানের গরুর হৃৎপিণ্ড ও কলিজার মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাংস।
নিজের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘হালান্ড: দ্য বিগ ডিসিশন’-এ তিনি নিজেই এই রহস্য উন্মোচন করে বলেছিলেন, ‘আপনারা হয়তো এসব খান না, কিন্তু আমি আমার শরীরের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন।’
শুধু খাবারেই নয়, হালান্ডের পানীয়র তালিকাতেও রয়েছে অভিনবত্ব। সাধারণ পানির বদলে তিনি বিশেষ পদ্ধতিতে ফিল্টার করা পানি পান করেন, যাতে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। এ ছাড়া তাঁর একটি নিজস্ব বিশেষ পানীয় রয়েছে, যাকে তিনি রসিকতা করে বলেন ‘ম্যাজিক পোশন’ বা জাদুকরী পানীয়। এটি মূলত কাঁচা দুধ, পালং শাক ও কেলের (একধরনের পাতাকপি) মিশ্রণে তৈরি। তাঁকে এই জুস খেতে দেখা যেন বাস্তব জীবনের ‘পপাই দ্য সেইলর ম্যান’ কার্টুনের সেই পালংশাক খাওয়ার দৃশ্যকেই মনে করিয়ে দেয়।
বর্তমান যুগের ফুটবলাররা যেখানে ম্যাচ জয়ের পর নাইট ক্লাবে পার্টি করতে বা আড্ডায় মেতে উঠতে পছন্দ করেন, সেখানে হালান্ডের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত ঘুম। ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার বারবার বলেছেন, তাঁর সেরা পারফরম্যান্সের পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো ঘুম। দৈনিক ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য থাকে তাঁর, যার মধ্যে দুপুরে একটি নিয়মমাফিক ঘুমও অন্তর্ভুক্ত।
ঘুমের গুণগত মান বজায় রাখতে ঘুমাতে যাওয়ার তিন ঘণ্টা আগে হালান্ড কমলা রঙের চশমা (অরেঞ্জ-টিন্টেড গ্লাসেস) পরিধান করেন, যা কৃত্রিম নীল আলো প্রতিরোধ করে তাঁর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে ‘মেলাটোনিন’ হরমোন তৈরি করতে সাহায্য করে।
এখানেই শেষ নয়, ঘুমানোর সময় মুখে বিশেষ টেপ লাগিয়ে নেন তিনি। এটি তাঁকে কেবল নাক দিয়ে শ্বাস নিতে বাধ্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার ফলে ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ে, বাতাস প্রাকৃতিকভাবে ফিল্টার হয় এবং গভীর ঘুমের সময় হৃদ্স্পন্দনের তারতম্য ঠিক থাকে। ঘুমানোর সময় তাঁর শোয়ার ঘরের সমস্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ থাকে, যাতে ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
মাঠে হালান্ডের খেলার মূল ভিত্তি হলো অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তি ও ক্ষিপ্রতা। তাঁর প্রশিক্ষণে ভারী ব্যায়ামের পাশাপাশি শরীরের নমনীয়তা বজায় রাখার জন্য বিশেষ যোগব্যায়াম সেশন থাকে। রেড বুল সালজবার্গে খেলার সময় তাঁর সাবেক কোচ স্তানিস্লাভ মাচেক জানিয়েছিলেন, কিশোর বয়সেই হালান্ড প্রতিদিন ৩০০ পুশ-আপ এবং ১ হাজার সিট-আপ দিতেন! এ ছাড়া পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে ওপরে দৌড়ানোর মতো কঠিন স্প্রিন্ট ট্রেনিং তাঁর রুটিনের অংশ।
অনুশীলনের পাশাপাশি শরীরকে দ্রুত সতেজ করতে (রিকভারি) হালান্ড প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন চমৎকারভাবে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য মিরর’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, হালান্ড তাঁর বাড়িতে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭৫ লাখ টাকা) খরচ করে একটি বিশেষ ‘ক্রায়োথেরাপি চেম্বার’ স্থাপন করেছেন। সেখানে তিনি হিমাঙ্কের নিচে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় নিজের শরীরকে উন্মুক্ত করেন। এটি তাৎক্ষণিকভাবে পেশি থেকে ল্যাকটিক অ্যাসিড দূর করে এবং শরীরের প্রদাহ কমায়, যার ফলে প্রতি ম্যাচের পর দ্রুত ক্লান্তি কাটিয়ে তিনি আবারও একই গতিতে মাঠে ঝড় তুলতে পারেন।
কেবল শারীরিক শক্তি দিয়ে ফুটবলের ইতিহাসে এত অবিশ্বাস্য গোল করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন মানসিকতা। আধুনিক ফুটবলে যেখানে খেলোয়াড়েরা গণমাধ্যমের সামনে খুব মেপে মেপে কূটনৈতিক উত্তর দেন, সেখানে হালান্ড একেবারেই ব্যতিক্রম। তিনি সরাসরি এবং সোজাসাপ্টা কথা বলতে ভালোবাসেন, যা অনেক সময় সাংবাদিকদের বোকা বানিয়ে দেয় কিন্তু ভক্তদের ভীষণ আনন্দ দেয়।
তাঁর কাছে গোল করাটা যেন একটি গাণিতিক হিসাব। বিশ্বকাপ ফুটবলে শেষ ৩২-এর ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় পাওয়ার পর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল সেই গোলটি নিয়ে। হালান্ড সোজাসাপ্টা উত্তর দেন, ‘আমি প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম। ভাবলাম, অতিরিক্ত সময়ে খেলার মতো শক্তি আমার নেই, তাই এখনই গোলটা করতে হবে!’
মাঠে হালান্ডকে চিনে নেওয়া মোটেও কঠিন কাজ নয়। ম্যাচের শেষভাগে যখন তিনি মাথার চুল আলগা করে দিয়ে ডিফেন্ডারদের দিকে ধেয়ে যান, সেটি আধুনিক ক্রীড়াবিশ্বের অন্যতম এক আইকনিক দৃশ্য তৈরি করে। ফুটবলের মতো শারীরিক শক্তিনির্ভর খেলায় এমন লম্বা চুল রাখার পেছনে লুকিয়ে আছে এক মজার গল্প।
হালান্ড নিজেই এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, সুইডিশ কিংবদন্তি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ তাঁকে একবার চুল না কাটার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ইব্রাহিমোভিচ নাকি হালান্ডকে বলেছিলেন, ‘কখনো চুল কেটো না, কারণ ফুটবলারের সব শক্তি তাঁর চুলেই থাকে।’ হালান্ড হেসে বলেন, ‘জ্লাতান যখন বলেছেন, তখন আমার কি আর তা না শুনে উপায় আছে!’
বয়স মাত্র ২৫, অথচ এরই মধ্যে ফুটবল বিশ্বের অনেক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন হালান্ড। তাঁর খেলার ধরন আধুনিক হলেও আড়ালে যে কঠোর পরিশ্রম তিনি করেন, তা চিরন্তন ও ক্লাসিক ঘরানার। বিজ্ঞান ও কঠোর পরিশ্রমের মেলবন্ধনে আর্লিং হালান্ড নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা তাঁকে সাধারণ অ্যাথলেটের গণ্ডি পেরিয়ে এক আধুনিক আদর্শ ফুটবলারে পরিণত করেছে।

ফ্যাশন বরাবরই সমাজের দর্পণ। এটিকে সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং আমাদের আত্মপ্রকাশের পছন্দের উপায়ও বলা চলে। তবে এতকাল ফ্যাশন শিল্প লম্বা, স্লিম ও নিখুঁত ফরসা রংকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সৌন্দর্যের ধারণাকে ধন্য ধন্য করেছে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে।
৫ ঘণ্টা আগে
গত কয়েক বছরে পুরো বিশ্বে রূপচর্চার ধরন বদলে গেছে। শুধু ক্লিনজার আর ময়শ্চারাইজারে ঠেকে নেই ত্বকসচেতনেরা। ক্লিনজার থেকে ময়শ্চারাইজারে বা সানস্ক্রিনে এসে ঠেকতে পার হতে হচ্ছে আরও দুই থেকে চার ধাপ।
৫ ঘণ্টা আগে
শহরে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের প্রায় সবার অভিযোগ, ঘর যতই ঝাড়ামোছা করা হোক না কেন, ধুলাবালি কমে না। রোজই আসবাবের ওপর পড়ে ধুলাবালুর স্তর। ঘরবাড়ি ধুলাবালিমুক্ত রাখতে যা করা যেতে পারে...
৬ ঘণ্টা আগে
বর্ষাকালে অনেক শিশুর মাথার ত্বকে বেশি খুশকি হয়। এর কিছু কারণ রয়েছে। শিশুর চুল ভালোভাবে শ্যাম্পু না করলে মাথার ত্বকে জমা মরা কোষ ভালোভাবে অপসারিত হয় না। এতে সেগুলো জমে যায় এবং পরে পুরু স্তরে পরিণত হয়, যাকে খুশকি বলি।
৭ ঘণ্টা আগে