
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়ে গেল। এটি ছিল দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশন। গত ১২ মার্চ এই অধিবেশন শুরু হয়েছিল। মাঝে রোজার ঈদের ছুটি বাদ দিয়ে সংসদ চলল ২৫ দিন। এই সময়ে ৯৪টি বিল পাস হয়েছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে, ৭টি কমিটি হয়েছে, নানা ইস্যুতে বিতর্ক হয়েছে, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউটও করেছেন। সব মিলিয়ে সংসদ যে খুবই প্রাণবন্ত ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তারপরও সংসদ সদস্যদের নিয়ে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের দু-একটি মন্তব্য সংসদের কার্যক্রম বিষয়ে কিছুটা হলেও হতাশ করেছে। মন্তব্যগুলোর সবই ছিল সংসদ সদস্যদের আচরণ সম্পর্কিত। তিনি বলেন, ‘যাঁরা দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নাতিরা গ্যালারিতে বসে দেখছে, তারা কী ভাববে?’
হাফিজ উদ্দিন আহমদ একজন দুঁদে রাজনীতিক। কাজেই তাঁর এই অভিমত শুধু ক্ষণিকের তির্যক মন্তব্য নয়; এটি আমাদের সংসদীয় সংস্কৃতির গভীর সংকটের প্রতি একধরনের নৈতিক সতর্কবার্তাও। সংসদের ভেতরের আচরণ যখন শিশু-কিশোরের চোখেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন বিষয়টি আর কেবল শৃঙ্খলা ভঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক চেতনার প্রশ্নে রূপ নেয়। বর্ষীয়ান রাজনীতিক হাফিজ উদ্দিন হয়তো সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিলেন।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদ হলো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান। এখানেই আইন তৈরি হয়, বাজেট অনুমোদিত হয়, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কেবল কাঠামোগত নয়, প্রতীকীও। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, অধিবেশন চলাকালে কিছু সদস্য মোবাইল ফোনে ব্যস্ত রয়েছেন, কেউ আসন ছেড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাফেরা করছেন, কেউ পাশের আসনে কারও সঙ্গে আলাপে মগ্ন, আবার কেউ কেউ পুরো সময়টুকুতে কার্যত অনুপস্থিত থাকছেন। এই দৃশ্যগুলো যখন বারবার দেখা যায়, তখন সংসদের গাম্ভীর্য ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।
স্বাভাবিকভাবেই সংসদের স্পিকারের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সংসদের ভেতরের শৃঙ্খলার অভিভাবক। নিয়ম ভঙ্গ হলে তিনি সতর্ক করেন, নির্দেশ দেন, কখনো কখনো রেকর্ডেও তা উল্লেখ করেন। কিন্তু বারবার সতর্ক করার পরও যখন আচরণে পরিবর্তন আসে না, তখন তাঁর ভাষাও কঠোর হয়ে ওঠে।
‘নাতিরা কী ভাববে’—এই প্রশ্নটি তাই কেবল আবেগ নয়, এটি একধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করার চেষ্টা। কারণ, নিয়মের ভাষা কাজ না করলে অনেক সময় বিবেকের ভাষা প্রয়োগ করতে হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদীয় শৃঙ্খলা কেবল ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়ম থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল হয়, তবে ধীরে ধীরে তা সহনীয় হয়ে ওঠে এবং তাতে একটি সহনশীল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তখন সদস্যরা ধরে নেন, নিয়ম ভাঙলেও তা গা-সওয়া হয়ে যাবে কিংবা তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠবে না। তেমন কোনো পরিণতি নেই। এই মানসিকতা একসময় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। করে। কারণ, সংসদ কেবল বিতর্কের জায়গা নয়; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা, যেখানে মনোযোগ, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা অপরিহার্য।
আরও একটি দিক আছে—সংসদে সংসদ সদস্যদের আচরণের বিষয়টি জনমনে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাধারণ মানুষ যখন দেখে, দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় সদস্যরা নিজেদের আচরণে অনিয়মিত, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—যেখানে নিয়ম মানার কথা সবচেয়ে বেশি, সেখানেই যদি নিয়ম উপেক্ষিত হয়, তবে সমাজের অন্য স্তরে কী ঘটছে? এই প্রশ্ন কেবল সমালোচনা নয়, এটি আস্থার সংকট তৈরি করে।
স্পিকারের মন্তব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংসদ কেবল বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির মঞ্চ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষাক্ষেত্রও। যারা আজ শিশু, নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে গ্যালারিতে বসে সংসদের কার্যক্রম দেখছে, তারাই আগামী দিনে ভোটার, নাগরিক এবং নেতৃত্বের অংশ হবে। তারা যদি দেখে যে সংসদে নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক, মনোযোগহীনতা গ্রহণযোগ্য, তবে সেই শিক্ষা সমাজের বৃহত্তর সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
তুলনামূলকভাবে বিশ্বের অনেক সংসদীয় ব্যবস্থায় স্পিকারের নির্দেশ অমান্য করা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সদস্যকে সতর্ক করা, বক্তব্য বন্ধ করা, এমনকি অধিবেশন থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করার মতো পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। এর ফলে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—সংসদীয় শৃঙ্খলা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি বাধ্যতামূলক আচরণবিধি। আমাদের ক্ষেত্রেও বিধি আছে, কিন্তু তা কি সব সময় আমরা মেনে চলছি? আমরা কি তার প্রয়োগ অনেক সময় অনিয়মিত বা নমনীয় করে তুলছি না? এই নমনীয়তা একসময় দুর্বলতায় রূপ নেয়।
তবে সমস্যাটিকে কেবল শাস্তিমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তা পূর্ণাঙ্গ সমাধান হবে না। এখানে প্রয়োজন আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। একজন সংসদ সদস্য কেবল একটি দলের প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর আচরণ তাই ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত। একজন শিক্ষক যেমন শ্রেণিকক্ষে আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন, তেমনি একজন সংসদ সদস্য তাঁর আচরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেন।
আরও একটি বাস্তবতা হলো—দলীয় রাজনীতির চাপ অনেক সময় সংসদের ভেতরের আচরণকে প্রভাবিত করে। বিতর্কের সময় ব্যক্তিগত মনোযোগের চেয়ে দলীয় অবস্থান প্রদর্শন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে আলোচনার মান নেমে যায় এবং মনোযোগের পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীলতা বৃদ্ধি পায়। এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে সংসদের গঠনমূলক ভূমিকাকে দুর্বল করে তোলে।
স্পিকারের মন্তব্য তাই এক অর্থে একটি আয়নার মতো কাজ করছে। তিনি সংসদের ভেতরের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন এমন এক ভাষায়, যা কেবল আইনগত নয়, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধকেও স্পর্শ করে। কারণ, ‘নাতিরা কী ভাববে’—এই প্রশ্নটি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্মানবোধকে একসঙ্গে জাগিয়ে তোলে। এটি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা বা পদমর্যাদা যতই থাকুক না কেন, আচরণের দায় থেকে আমরা কেউই মুক্ত নয়।
তবে এটা বলা যায়, সংসদীয় শৃঙ্খলা কোনো এক দিনের বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক চর্চা। আইন থাকলেই শৃঙ্খলা আসে না, প্রয়োগের ইচ্ছা এবং সংস্কৃতি তৈরি করতে হয়। সংসদের ভেতরে যদি নিয়মিতভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুশীলন না থাকে, তবে সেটি ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিক মঞ্চে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেখানে সিদ্ধান্তের চেয়ে দৃশ্যমানতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজকের প্রশ্ন তাই স্পিকারের কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—আমরা কি এমন একটি সংসদ রেখে যেতে চাই, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্বের সঙ্গে দেখে, নাকি এমন একটি দৃশ্য, যা তারা লজ্জার সঙ্গে মনে রাখে? উত্তরটি কেবল সংসদের ভেতরে নয়, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত আছে।
সংসদের বিতর্ক খুবই আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। দুঁদে রাজনীতিবিদেরা যখন সংসদকে যুক্তি-তর্কের তীর্থস্থান বানিয়ে তোলেন, তখন সেই প্রাণবন্ত সংসদ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে। একজন সংসদ সদস্য সব দিক থেকেই সাধারণ জনগণের প্রেরণাস্থল হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি দলের স্বার্থ দেখতে গিয়ে জাতির স্বার্থের কথা বেমালুম ভুলে যান, সংসদীয় রীতিনীতি ভুলে গিয়ে সংসদের মধ্যেই অসংগত আচরণ করে থাকেন, তাহলে তা সংসদকে কোনো ইতিবাচক লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারবে না। সংসদে যুক্তির নামে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করাও অন্যায়। তথ্য-উপাত্তসহ যখন কোনো সদস্য সংসদে বক্তব্য রাখবেন, তখন তা অন্যের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।
মাননীয় স্পিকার সংসদীয় আচরণ নিয়ে মন্তব্য করছেন। সংসদ সদস্যরা সেই মন্তব্যগুলোকে ঠিকভাবে আত্মস্থ না করলে ‘নাতিদের জন্য’ যে আমরা ভালো কোনো উদাহরণ রেখে যেতে পারব না, সেটা বলাই বাহুল্য।
লেখক: কামরুল হাসান, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আজকের পত্রিকা

পৃথিবীটা বদলে গেছে। আমরা এই পৃথিবীটার পরিবর্তন চেয়েছিলাম। আমরা শুধু নই, সারা বিশ্বের মানুষ, বিশেষ করে নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল সমাজের, রাষ্ট্রের এবং মানুষের। কিন্তু পরিবর্তনটা কি হলো?
১ ঘণ্টা আগে
সেদিন ছিল পয়লা মে। মে দিবস। শ্রমিকদের ছুটির দিন। কিন্তু কেন যে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের বলদিঘাট (লালমাটিয়া) গ্রামে এক বিরোধপূর্ণ জমিতে কিছু শ্রমিককাজ করতে গিয়েছিলেন, তা রহস্য বটে! এদিকে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের হুমকিও পেতে হয়েছে।
২ ঘণ্টা আগে
আজ মহান মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও কর্মঘণ্টা কমানোর সংগ্রামের স্মৃতিবাহী এক ঐতিহাসিক দিন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকেরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে যে আন্দোলন করেছিলেন, সে আন্দোলনের সময় হে মার্কেটের কাছে...
২ দিন আগে
সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশের শ্রমিকেরা ভালো অবস্থায় নেই। কারণ, বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রম খাতের শ্রমিকদের কোনো ন্যূনতম মজুরি নেই। ন্যূনতম মজুরি যেখানে আছে, এমন অনেক খাতেই এখনো ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমাদের দেশে কোনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কার্যকর নেই।
২ দিন আগে