১২ ফেব্রুয়ারি শুধু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না, বরং এর ভেতরে নিহিত ছিল অনেক বছরের আশা, ক্ষোভ, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ইতিহাস। গতকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানুষটি শুধু একজন ভোটার ছিলেন না, তিনি এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার ছিলেন। তাঁর আঙুলের একটি ছাপ কেবল একটি প্রতীকে নয়—একটি সম্ভাবনার দিক নির্দেশ করেছে।
স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্রের অনুশীলন, সামরিক শাসন, আন্দোলন, আপস, নির্বাচন—সব মিলিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস এক জটিল বুনন। এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা দেখেছি ইশতেহারের উজ্জ্বল ভাষা, আবার দেখেছি ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা। প্রতিশ্রুতি এসেছে—সুশাসন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানুষের মর্যাদা। কিন্তু প্রতিবারই প্রশ্ন থেকেছে—এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
গত এক দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের আরও সংবেদনশীল করেছে। রাজনৈতিক উত্তাপ, আস্থার সংকট, ভিন্নমতের প্রতি অস্বস্তি—এসবের মধ্য দিয়ে সমাজ এগিয়েছে। অনেকেই মনে করেছেন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের প্রাণকে সংকুচিত করেছে। আবার অনেকে স্থিতিশীলতার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। এই বিতর্কের ভেতরেই জন্ম নিয়েছে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা—একটি বাংলাদেশ, যেখানে ভয় নয়, ভরসা থাকবে; বিভাজন নয়, সংলাপ থাকবে।
জুলাইয়ের সেই আন্দোলন, সেই উত্তাল দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, তরুণেরা কেবল দর্শক নয়। তারা প্রশ্ন করতে জানে, দাবি তুলতে জানে, স্বপ্ন দেখতে জানে। তারা চায় একটি রাষ্ট্র, যেখানে ভোট শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; আস্থা। যেখানে আইন সবার জন্য সমান। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্তচিন্তার, আদালত হবে ন্যায়ের, প্রশাসন হবে সেবার প্রতীক। সেই স্বপ্নে আছে একাত্তরে লাখো শহীদ এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কল্পিত বাংলাদেশ—একটি জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে প্রশ্নটি কেবল কে জিতবে, সেই ভাবনা ও প্রত্যাশা ছিল না; বরং যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা কি নয়া বাংলাদেশের ধারণা বুকে ধারণ করবে? তারা কি বুঝবে, এই ভোট কেবল রাজনৈতিক বিজয় নয়, একটি নৈতিক দায়িত্ব? ক্ষমতা মানে সুবিধা নয়; এটি মানুষের বিশ্বাসের ভার বহন করা।
নয়া বাংলাদেশ মানে প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। এটি মানে পুনর্মিলন, পুনর্গঠন, পুনরুদ্ধার। এখানে বিরোধী দল শত্রু নয়; তারা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। এখানে সমালোচনা-বিদ্বেষ নয়; এটি উন্নতির সুযোগ। এখানে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী—সবাই রাষ্ট্রের সহযাত্রী।
এবারের নির্বাচনটা ছিল তরুণদের স্বপ্ন প্রয়োগের মাধ্যম। তারা কর্মসংস্থান চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় ন্যায্যতা। তারা উন্নয়ন চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় স্বচ্ছতা। তারা চায় এমন একটি দেশ, যেখানে মেধা মূল্যায়িত হবে, যেখানে বিদেশে পাড়ি দেওয়া একমাত্র মুক্তি নয়। তারা চায় এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে নিজের দেশেই ভবিষ্যৎ গড়া যায় গর্ব নিয়ে।
এবারের নির্বাচনটা ছিল আবেগেরও ব্যাপার। একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভোট দিয়েছেন, একজন তরুণ প্রথমবার ভোট দিয়ে মনে মনে একটি নতুন ভোরের সূর্য ওঠার কল্পনা করেছে। একজন প্রবীণ নাগরিক বোধের জায়গা থেকে অতীতের সংগ্রাম স্মরণ করে বর্তমানকে বিচার করেছেন। তাদের প্রত্যাশা আলাদা হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন এক—একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক, মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ।
গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিদিনের আচরণে, ভাষায়, সহনশীলতায় বেঁচে থাকে। এই নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, তাদের মনে রাখতে হবে—এই জয় চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারলে তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ক্ষমতার আসনে বসে যদি তারা নয়া বাংলাদেশের অঙ্গীকার স্মরণ করে—স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন—তবে এই ১২ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসে আলাদা হয়ে থাকবে।
আজ আমরা হয়তো জানি না আগামীকাল কেমন হবে। কিন্তু আমরা জানি, একটি জাতির শক্তি তার জনগণের মধ্যে নিহিত থাকে। যদি সরকার মানুষের কথা শোনে, যদি বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখে, যদি নাগরিক সমাজ সতর্ক ও সক্রিয় থাকে—তবে নয়া বাংলাদেশ কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে রূপ নেবে। তাই নির্বাচনের পরের সময়টি বিভাজনের নয়, প্রত্যাশার। এবারের নির্বাচনের জয় যেন কারও পরাজয়ের আনন্দ না হয়ে সবার সম্ভাবনার সূচনা হয়।
১২ ফেব্রুয়ারির সারা দিনটি শুধু একটি দলকে জয়ী করার ঘটনা ছিল না, বরং দিনটি ছিল একটি দিকনির্দেশকে বেছে নেওয়ার শপথ। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন মনে রাখে—বাংলাদেশ এখন নতুন প্রজন্মের হাতে গড়া এক স্বপ্নের নাম। সেই স্বপ্নকে সম্মান করা, রক্ষা করা এবং নতুন রূপে গড়ে তোলাই আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। নয়া বাংলাদেশ—এটি হোক আজকের দিনের নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিশ্রুতি।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে গঠিত হয় ‘আপৎকালীন’ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। ফলে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বহুল আলোচিত ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনে সরকার প্রথমে ব্যর্থ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্ততপক্ষে ন্যায়সংগত সময়ের
৩ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের দুই দিন আগে উত্তরবঙ্গে যেতে হয়েছিল কাজে। খেয়াল করলাম, এবারের নির্বাচন নিয়ে মফস্বলের জনগণ বেশ তৎপর, ব্যতিব্যস্ত। চায়ের দোকানে, হোটেলে জটলা করে বসে তারা নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছে। ছোট ছোট হোটেলে টেলিভিশন চালু রাখা হয়েছে নির্বাচনসংক্রান্ত সংবাদ শোনার জন্য।
৩ ঘণ্টা আগে
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর অবশেষে নির্বাচনটা হয়ে গেল। সারা দেশের মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এককথায় এই নির্বাচনকে উৎসবমুখর বলতে হবে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সম্ভবত নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ছিল ‘নির্বাচন কি হবে?’ এত সংশয় প্রকাশের কারণ একেবারে
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট গ্রুপের দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। এ বছরের সূচক এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তার আগের বছরে বিশ্বজুড়ে ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রচর্চার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এসব দেশের মধ্যে
১ দিন আগে