ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনের দুই দিন আগে উত্তরবঙ্গে যেতে হয়েছিল কাজে। খেয়াল করলাম, এবারের নির্বাচন নিয়ে মফস্বলের জনগণ বেশ তৎপর, ব্যতিব্যস্ত। চায়ের দোকানে, হোটেলে জটলা করে বসে তারা নির্বাচন নিয়ে আলাপ করছে। ছোট ছোট হোটেলে টেলিভিশন চালু রাখা হয়েছে নির্বাচনসংক্রান্ত সংবাদ শোনার জন্য। কোথাওবা ছোট ছোট প্যান্ডেল এবং সেখানে সারিবদ্ধভাবে চেয়ার রাখা হয়েছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই গ্রামের মানুষজন এখানে এসে নির্বাচনী কাজ করবে। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতীকে প্রার্থীদের ভোট চাওয়ার পোস্টার, ব্যানার চারপাশে। নির্বাচনের দুই দিন আগে বিধায় মনে আশঙ্কা ছিল, হয়তোবা কোনো অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হব। কিন্তু এতটাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ লক্ষ করলাম, যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ছিল। স্থানীয়দের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নির্বাচন নিয়ে এলাকায় কোনো ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটেছে কি না। ঘটনা ঘটার আওয়াজ মিলল না। উপরন্তু উৎসব উৎসব ভাব। ভোট দেওয়ার জন্য সবাই মোটামুটি প্রস্তুত।
ঢাকায় ফেরার সময় দেখলাম, ঢাকা থেকে প্রচুর মানুষ গ্রামে যাচ্ছে। সেসব ঘটনা দেখে মনে হলো, এবার ভোটাধিকার প্রয়োগের তাগিদ বেশ লক্ষণীয়। অতীতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচন এবং নির্বাচনের প্রতি জনগণের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। যদিও আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতি ছিল। কিন্তু তার শূন্যতা সেই অর্থে চোখে পড়েনি। অনেকের ধারণা, আওয়ামী সমর্থকেরা সাধারণ জনগণের মধ্যে থেকে হয়তোবা তাঁদের সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করবেন।
শুধু পরিবর্তনের আশায় নয়, এবারের নির্বাচন যেন আলোচিত ও কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক দলগুলোর নারীবিষয়ক নির্বাচনী প্রচারণার কারণে, এমনটাই মনে করেন কেউ কেউ। এবারের নারী ভোটারের সংখ্যা ৫১ শতাংশ। নারীদের সমর্থন পাওয়ার জন্য বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামের আমির নারীদের সুবিধা প্রদানের কথা বলেছেন যেমন, তেমনি জামায়াতে ইসলাম ক্ষমতায় গেলে নারীদের কর্মঘণ্টা ৮-এর স্থলে ৫ করা হবে তাঁদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। আবার তিনি বলেছেন, যেসব নারী ঘরে অবস্থান করবেন তাঁদেরকে সরকার থেকে সম্মানী প্রদান করা হবে। অর্থাৎ তার কথায় প্রতীয়মান হয় যে এই ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নারীদের গৃহের ভেতরে অবস্থানকে সমর্থন করে এবং সেটা সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে। যে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের পেছনে ফেলেছে, সেই দেশের নারীদের ঘরবন্দী করবার পাঁয়তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করে না। বরং অন্য অ্যাজেন্ডা যা দেশের অস্তিত্ব সংকটের কারণ হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। জামায়াতের আমির এখানেই থেমে যাননি, তিনি তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্ষণ বিষয়ে নতুন সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, ধর্ষণ হলো অসৎ পুরুষ ও নারীর বিবাহবহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক। তাঁর এমন উক্তি জনমনে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়। এই দেশে আড়াই বছরের কন্যাশিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তিন বছর, পাঁচ বছরের কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এমন পাশবিক ঘটনায় দেশের মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। এসব নিশ্চয়ই তাঁর জানা। প্রশ্ন হলো, এমন পাশবিক ঘটনায় আড়াই, তিন কিংবা পাঁচ বছরের কন্যাশিশুর কি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল? উত্তর হলো, না। তিনি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় কীভাবে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক পান? জানতে ইচ্ছে করে জামায়াতের নারী সমর্থকদের অভিমত কী এই প্রসঙ্গে? জামায়াতপ্রধানের আরও একটি বক্তব্য জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর রাজনৈতিক সংগঠনে কখনো নারীরা আমির হতে অর্থাৎ দলের প্রধান হতে পারবেন না। অবাক হতে হলো যখন দেখা গেল জামায়াতের মহিলা সংগঠনের সেক্রেটারি বললেন, জামায়াতের আমির নারীরা হতে পারবেন না এটা জেনেই তাঁরা জামায়াত করেন। নারীর যোগ্যতা থাকলেও জামায়াতের নেতৃত্বে আসতে পারবেন না, সম্ভবত এমন ভয়ংকর বৈষম্যমূলক কথা ইতিপূর্বে শোনা যায়নি। আর সেই কারণে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তারা মনোনয়ন দেয়নি। জামায়াতের অনবরত নারীকেন্দ্রিক নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ নিয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে বিএনপি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নারীর প্রতি তাদের সমর্থনমূলক প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রচারণায় অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে নারীকেন্দ্রিক প্রচারণা মুখ্য হয়ে উঠেছে।
গত এক-দেড় বছরে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। ধর্মীয় অজুহাত দেখিয়ে নারীদের বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে হেনস্তা করা হয়েছে। যেটা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। ৫ আগস্টের পর সংস্কার বা পরিবর্তন নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকলেও নারীর নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ বা পদক্ষেপ, কোনোটাই চোখে পড়ার মতো ছিল না। এভাবে নারীসমাজকে বিভিন্ন দিক দিয়ে বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করার পাঁয়তারা চলেছে। ঠিক এমন এক অবস্থায় নারীকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধানের বক্তব্য নারীসমাজকে সংশয়ে ফেলে, হতভম্ব করে দেয়। অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ হয়। নারীসমাজের একটা বড় অংশ ভেবে নেয়, এই ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নির্বাচনে জয়ী হলে তাঁদের সুবিধা নয়, বরং অসুবিধা হবে। নারীদের পুরুষের অধীন করে রাখা হবে, নারীর যোগ্যতা, মেধা থাকলেও তাঁদের সেই অনুসারে অবস্থান, সম্মান, মর্যাদা দেওয়া হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
এবার নারী ভোটার পুরুষের সমান সমান। তবে কিঞ্চিৎ বেশি। নারীদের অনেকেই মনে করছেন, নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য এবার ভোটাধিকার প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। ফলে নির্বাচনের দিন দুপুর পর্যন্ত দেখা গেল, অসংখ্য নারী ভোটার উপস্থিত হয়েছেন ভোটকেন্দ্রে।
এবারের নির্বাচনে চার কোটি তরুণ ভোটার। তারা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অস্তিত্ব, সংস্কৃতির ধারণা লাভ করে ভোট প্রয়োগ করে তাহলে একটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা থাকবে। যাই হোক, নির্বাচনের আগের রাতে নির্বাচন নিয়ে আপত্তিকর সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পরও ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয় দেখা গেছে। সবাই উৎসবমুখর আবহে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে নারী ও পুরুষ সবাই ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করেছেন।
জনগণ যে পরিবর্তন চায় সেটা সুস্পষ্ট হয়েছে এ নির্বাচনে। বলাবাহুল্য, জনগণ বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা চায়। দুর্নীতিমুক্ত সরকার চায়। চায় রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সম-অধিকার ও নিরাপত্তা। সেই সঙ্গে দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস সুরক্ষিত থাকবে সেই প্রত্যাশা সবার। নির্বাচনে তাঁদেরই জয়ী হওয়া দরকার, যাঁরা ইতিপূর্বে জনগণের আস্থা ও ভরসা অর্জন করেছেন বা অর্জন করবার সুযোগ চেয়েছেন।
সবশেষে বলব, নির্বাচনে কেবল জয়ী হওয়া নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার যেন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, জবাবদিহির আওতায় থাকে—নির্বাচন তারই পূর্বশর্ত হয়ে থাক।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে গঠিত হয় ‘আপৎকালীন’ ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট। ফলে জনগণ প্রত্যাশা করেছিল এই সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। কিন্তু বহুল আলোচিত ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠনে সরকার প্রথমে ব্যর্থ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল অন্ততপক্ষে ন্যায়সংগত সময়ের
৩ ঘণ্টা আগে
১২ ফেব্রুয়ারি শুধু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না, বরং এর ভেতরে নিহিত ছিল অনেক বছরের আশা, ক্ষোভ, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ইতিহাস। গতকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানুষটি শুধু একজন ভোটার ছিলেন না, তিনি এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার ছিলেন। তাঁর আঙুলের একটি ছাপ কেবল একটি প্রতীকে
৩ ঘণ্টা আগে
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর অবশেষে নির্বাচনটা হয়ে গেল। সারা দেশের মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এককথায় এই নির্বাচনকে উৎসবমুখর বলতে হবে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সম্ভবত নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ছিল ‘নির্বাচন কি হবে?’ এত সংশয় প্রকাশের কারণ একেবারে
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট গ্রুপের দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতিবছর গণতন্ত্র সূচক প্রকাশ করে। এ বছরের সূচক এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে তার আগের বছরে বিশ্বজুড়ে ১৬৭টি দেশের গণতন্ত্রচর্চার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এসব দেশের মধ্যে
১ দিন আগে