Ajker Patrika

বিনিয়োগ ও কর নিয়ে পুরোনো বাগাড়ম্বর

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর আহরণ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা কিংবা বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের এই যে বাগাড়ম্বরপূর্ণ চটকদার নানা কথাবার্তা, তা থেকে এ দেশ শিগগিরই বেরিয়ে আসতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, এই বাগাড়ম্বর সৃষ্টিকারীদের নিয়োগকর্তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তোষামোদ ও চাটুকারিতাপূর্ণ মনোরঞ্জক চটকদার কথাবার্তা শুনতেই অধিক পছন্দ করেন।

আবু তাহের খান 
বিনিয়োগ ও কর নিয়ে পুরোনো বাগাড়ম্বর

বহু বছর ধরে একটা আলোচনা চলছে যে, দেশে কর-জিডিপির অনুপাত কিছুতেই বাড়ছে না। কোনো বছর সামান্য বাড়লেও, পরের বছর আবার তা কমে যায়। সে কারণে সেই অনুপাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর একটি। এমন পরিস্থিতিতে কর আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যার যার মতো করে নানামাত্রিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। কেন ব্যর্থ হচ্ছে? তা পরে আলোচনা করা হবে। তার আগে অত্যন্ত বিরক্ত ও হতাশার সঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, গৃহীত ওই সব কার্যক্রম ও কর্মকৌশল লক্ষ্য অর্জনে কাজে না এলেও এ বিষয়ে তাদের চটকদার বাগাড়ম্বর এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। বরং আগের সরকারগুলোর শাসনামলের মতো করে তারা নতুন সরকারের সময়েও সেই পুরোনো বাগাড়ম্বর আবারও নতুন করে শুরু করে দিয়েছে। বিষয়টি একদিকে যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি তা প্রকৃত অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তাই খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালনকারী ‘বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এখনো সে পদে বহাল আছেন। তিনি বিনিয়োগ ও উন্নয়নের মাধ্যমে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে ঘোষণাকে তাঁর পৃষ্ঠপোষক ও অভিভাবক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুধু করতালি দিয়ে অভিনন্দিতই করেননি, বরং এরূপ অবাস্তব আকাঙ্ক্ষাকে উদ্ধৃত করে তিনি এটাও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্ববাসীর জন্য এক আশার বাতিঘর’। যে দেশ তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ন্যূনতম ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে এখনো হিমশিম খাচ্ছে, যে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশে নেমে গিয়ে এখন আবার তা উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। শিক্ষার মানে যে দেশের অবস্থা এখনো এশিয়ার পশ্চাৎপদ দেশগুলোর মধ্যে আবার সর্বনিম্নে, সে দেশ ২০৩৫ সাল নাগাদ সিঙ্গাপুরের সমকক্ষ হয়ে উঠবে এবং বিশ্বের মানুষ একে আশার বাতিঘর বলে গণ্য করবে—এমন কথাবার্তাকে সীমাহীন বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কী-ইবা বলা যাবে?

অবশ্য স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে বাগাড়ম্বরপ্রিয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এগুলো ব্যাপক পরিসরে বিস্তার লাভ করলেও, আগের সরকারগুলো তা থেকে মুক্ত ছিল না এবং সদ্যগঠিত নতুন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোকজনও অনুরূপ বাগাড়ম্বরমূলক কথাবার্তা বলা এতটাই জোরেশোরে শুরু করে দিয়েছেন যে তা শুধু হতাশাই বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে আগের সরকার থেকে যাঁদের ফুলমাল্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে, তাঁরাও যে একই পথের পথিক হবেন, সেটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু নতুনদের মধ্যে যাঁরা এখনো একইভাবে চটকদারি কথাবার্তায় পুরোনোদের ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন তো আর বিরক্ত না হয়ে পারা যায় না। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দায়িত্ব নিয়েই ক্রমাগতভাবে বলে চলছেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশের কর-জিডিপি অনুপাতকে ১৫ শতাংশে উন্নীতকরণ, যা বর্তমানে মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ আগামী ৯ বছরে তিনি এ হারকে প্রায় আড়াই গুণ বৃদ্ধি করতে চান।

উপদেষ্টা মহোদয়ের এরূপ অবাস্তব কথার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর প্রতি আমার প্রশ্ন—আপনার হাতে কি এ তথ্য আছে বাজার স্থিতিশীল রাখার নামে, ঈদে পণ্যমূল্য কমিয়ে আনার কথিত লক্ষ্যে এবং নানা তদবির ও অন্তরালের সমঝোতায় বছরে কী পরিমাণ শুল্ক ও কর সরাসরি মওকুফ হয়ে যায়? সে ক্ষেত্রে কর-জিডিপির অনুপাত ৯ বছরে আড়াই গুণ বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার আগে এসব অযৌক্তিক ও হীনতাপূর্ণ চর্চা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ কি সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে? উপদেষ্টার দপ্তর কি হিসাব করে দেখেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রামীণ ট্রাস্টের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, স্টারলিংকের মতো বিভিন্ন চতুর কোম্পানি এবং অন্যান্য উপদেষ্টা ও সমন্বয়কদের ‘শুভার্থীদের’ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যেসব কর ও শুল্কসুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা একই ধারায় অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ কী পরিমাণ রাজস্ব হারাবে? সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার এসব কর মওকুফ সুবিধা প্রদানের বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে এবং অবিলম্বে এসব সুবিধার ধারাবাহিকতা বন্ধ না করে কর-জিডিপির উল্লিখিত লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন করা সম্ভব, তা কি ভেবে দেখেছেন?

এ হিসাব কি সরকারের কাছে আছে অথবা তা থাকলে তারা কি জনসমক্ষে তা প্রকাশ করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) মতো বিভিন্ন অসম বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে সামনের বছরগুলোতে বাংলাদেশকে কী হারে ও কী পরিমাণে রাজস্ব হারাতে হবে? সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের এক সাম্প্রতিক হিসাবে দেখিয়েছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এআরটির কারণেই বাংলাদেশকে বছরে ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে হবে—চুলচেরা হিসাবে এর পরিমাণ হয়তো আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এটি তো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এআরটির ফলাফল। এখন এআরটির উদ্ধৃতি দিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে (জাপান ও ইইউর সঙ্গে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রষ্টব্য) উল্লিখিত কর-শুল্ক মওকুফের পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা কি উপদেষ্টা মহোদয় হিসাব করে দেখেছেন? আর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি এবং অন্য দেশের সঙ্গে অনুরূপ কোনো চুক্তি করে থাকলে সেগুলোও বাতিল করার কোনো চেষ্টা না নিয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীতকরণের চিন্তা কি আদৌ বাস্তবসম্মত?

কর-শুল্ক, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে নতুন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের নানা বাগাড়ম্বরের অতিসামান্যই এখানে উল্লেখ করা হলো। আর বিস্তারিতটাও মোটামুটি একই রূপ। তবে ভয় ছড়াচ্ছে এ ঘটনা যে, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের মতো পুরোনো বাগাড়ম্বর সৃষ্টিকারীরা এই নতুন সরকারে এসেও এক মুহূর্তের জন্য থেমে নেই। বরং এখন তাঁরা নির্বাচিত সরকারের আশীর্বাদের খোলস গায়ে লাগিয়ে আরও অধিক জোরের সঙ্গে সেসব চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীনে বিডার নতুন দপ্তর খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু বিডার প্রধান কি জানাবেন, বিদেশে এ রকম একটি স্বতন্ত্র দপ্তর পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রকে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে? তার চেয়ে বেইজিংয়ের বাংলাদেশ দূতাবাসকে ব্যবহার করে চীনা বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়ার কাজটি অতি সহজেই করা যায় কি না? সেটা ভাবা জরুরি। বেইজিংয়ে বিডার দপ্তর হলে সে দপ্তরকে তো শেষ পর্যন্ত দূতাবাসের মাধ্যমেই কাজ করতে হবে। তাহলে অহেতুক নতুন দপ্তর খুলে ব্যয় বাড়ানো কেন? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বহু চীনা বিনিয়োগকারীই এখন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাঁদের মূল সমস্যা হচ্ছে, বিনিয়োগ সংস্থাগুলোর কাছ থেকে তাঁরা যথাযথ ও ত্বরিত সেবা পান না।

ফলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বেইজিংয়ে বিডার দপ্তর স্থাপনের চেয়েও অধিক জরুরি হচ্ছে আগ্রহী চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আনুষঙ্গিক সেবাসহায়তাগুলোকে সহজলভ্য, হয়রানিমুক্ত ও গতিশীল করা। কিন্তু সেসব মূল কাজে মনোযোগ না দিয়ে বিডা যে চীনে নতুন দপ্তর খোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, সেটি কার্যত বাগাড়ম্বর ছাড়া আর কিছুই নয়, যে কাজে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তিনি যথেষ্টই এগিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বেজার আওতাধীন পাঁচটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০২৬ সাল নাগাদ ৫৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ ও আড়াই লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ঘোষণা দিয়েছিলেন (উল্লেখ্য, তিনি বেজারও নির্বাহী চেয়ারম্যান)। ২০২৬ সালের এখন প্রায় মাঝামাঝি। বেজা কর্তৃপক্ষ কি জানাবে, এ সময়ের মধ্যে সেখানে কত কোটি ডলারের নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে এবং নতুন করে কত লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে? আসলে এ বিষয়ে জানানোর মতো কোনো অগ্রগতিই তাদের নেই। মূল কথা হচ্ছে, এগুলোর অধিকাংশই হচ্ছে, সব যুগে ও সব কালে সরব থাকা চাটুকার শ্রেণির চমক সৃষ্টিকারী বাগাড়ম্বর।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর আহরণ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা কিংবা বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের এই যে বাগাড়ম্বরপূর্ণ চটকদার নানা কথাবার্তা, তা থেকে এ দেশ শিগগিরই বেরিয়ে আসতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, এই বাগাড়ম্বর সৃষ্টিকারীদের নিয়োগকর্তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তোষামোদ ও চাটুকারিতাপূর্ণ মনোরঞ্জক চটকদার কথাবার্তা শুনতেই অধিক পছন্দ করেন। তাঁদেরকে ডানে-বাঁয়ে রেখে ওই নীতিনির্ধারকেরা জনগণকে শ্রুতিমধুর আশ্বাস ও কথাবার্তা শোনাতেও যথেষ্টই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তা জনগণের ভাগ্যে সেগুলো কোনো দিন জুটুক বা না জুটুক। ভাবটা এমন যে স্বপ্নেই যখন খাব, তখন ভক্ষণ সবচেয়ে উত্তমটি দিয়ে নয় কেন? তবে আশার কথা, বাগাড়ম্বরের এসব ফাঁকি এখন সাধারণ মানুষও ব্যাপকভাবে বুঝে গেছে বা বুঝতে শুরু করেছে।

তাই সংশ্লিষ্টদের কাছে বিনীত অনুরোধ, কর-জিডিপির অনুপাত ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৫ শতাংশে উন্নীতকরণের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রার প্রগলভতা বাদ দিয়ে কীভাবে এটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরও যৌক্তিক ও টেকসই করে তোলা যায়, সে দিকটা নিয়ে ভাবা জরুরি। সে জন্য জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে—প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি করা, কর ফাঁকি রোধ, হয়রানি ও অনৈতিক লেনদেন বন্ধ করে মানুষকে করদানে উৎসাহিত করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এআরটি বাতিল করা এবং ভবিষ্যতে এ রকম নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টার আগে স্থানীয় বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়া। মনে রাখতে হবে, স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে কখনোই কোনো বিদেশি এখানে বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আর দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিনিয়োগের অনুকূল করে তোলাও জরুরি।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত