Ajker Patrika

নারী প্রার্থীর সংকট ছাত্র সংসদ নির্বাচনে

আল শাহারিয়া
নারী প্রার্থীর সংকট ছাত্র সংসদ নির্বাচনে
যাঁর নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচিতি পেয়েছে, সেই নামের দর্শনটিই এখানে অবহেলিত। ছবি: সংগৃহীত

একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি কেবল শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের মঞ্চ নয়, বরং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সূতিকাগারও। প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্র সংসদ নির্বাচনের যে হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। শিক্ষার্থীরা তাঁদের নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। ক্যাম্পাসের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বলার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফোরাম পাবেন। কিন্তু এই আপাত আনন্দের মাঝে একটি গভীর ও বেদনাদায়ক নীরবতা আমাদের শঙ্কিত করে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নাম, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এবং তাঁদের অধিকারবিষয়ক কোনো জোরালো স্বর শোনা যাচ্ছে না।

যে নামটি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিচিতি দিয়েছে, সেই নামের দর্শনটিই যেন এখানে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বেগম রোকেয়া কেবল নারীশিক্ষার কথা বলেননি, তিনি বলেছিলেন নারীর সামগ্রিক মুক্তির কথা। তিনি চেয়েছিলেন অবরোধবাসিনী নারীরা সমাজের প্রতিটি স্তরে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করুক। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি— সবখানেই তাদের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত হোক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীদের সমাজে সামগ্রিক অংশগ্রহণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার কথা ছিল। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নেতৃত্ব নির্বাচনের মহাযজ্ঞ আয়োজন হচ্ছে, তখন নারী শিক্ষার্থীরা হয় অদৃশ্য নতুবা প্রান্তিক। এই দৃশ্যপট আমাদের কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা অংশগ্রহণমূলক কাজে কেন পিছিয়ে থাকছেন? এর দায় কার?

প্রথমেই ক্যাম্পাসের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে বিশ্লেষণ করতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও ছাত্ররাজনীতির পরিবেশ নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোপুরি অনুকূল নয়। রাজনীতি বলতেই আমরা যা বুঝি তা অনেক ক্ষেত্রেই পেশিশক্তি প্রদর্শন, কোন্দল এবং পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের চর্চা। এই চর্চায় আদর্শিক বা নীতিগত বিতর্কের চেয়ে প্রাধান্য পায় ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের রূঢ় বহিঃপ্রকাশ। এমন একটি পরিবেশে একজন নারী শিক্ষার্থী যখন রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান, তাঁকে প্রথমেই তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। তাঁকে লড়তে হয় সমাজের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে। রাজনীতিতে সক্রিয় হলে নারী শিক্ষার্থীদের চরিত্রহনন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি এবং নানা ধরনের কুৎসা রটনার শিকার হতে হয়। এই ঝুঁকি নিয়ে কজনই-বা এগিয়ে আসতে সাহস পান? ফলে মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বহু নারী শিক্ষার্থী এই অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন।

দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব একটি বড় কারণ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে, এটি ভালো খবর। কিন্তু এই নির্বাচনে নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তাদের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি? নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে প্যানেলগুলো গঠিত হবে বা যাঁরা প্রার্থী হবেন, তাঁদের মধ্যে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কেমন থাকবে, তা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাঁরা নির্ভয়ে তাঁদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে পারেন এবং নেতৃত্ব বিকাশের চর্চা করতে পারেন।

অধিকাংশ সংগঠনের শীর্ষ পদগুলো পুরুষের দখলেই থাকে। নারী কর্মীরা কেবল আলংকারিক পদে বা কেবল নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজ করার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন। ছাত্রসংগঠনগুলো যদি আন্তরিকভাবেই নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিশ্বাসী হতো, তবে তারা সাংগঠনিকভাবেই নারী শিক্ষার্থীদের সামনে নিয়ে আসত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নারী শিক্ষার্থীদের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাই বেশি। তাঁদের নীতিনির্ধারক হিসেবে দেখার মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি।

সম্ভবত সবচেয়ে জটিল কারণটি হলো, নারী শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে বিরাজমান জড়তা। একে কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত করলে অবিচার হবে। এই জড়তার পেছনে পূর্বোক্ত তিনটি কারণই দায়ী। যখন একজন নারী শিক্ষার্থী দেখেন যে তাঁর সিনিয়ররা বা অন্য ক্যাম্পাসের নারীরা রাজনীতি করতে গিয়ে নানাভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বা কাঙ্ক্ষিত সম্মান পাননি, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই নিরুৎসাহিত হন। তিনি তাঁর শিক্ষাজীবন নির্বিঘ্নে শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করাকেই শ্রেয় মনে করেন।

নেতৃত্ব তৈরি হয় চর্চার মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উর্বর সময়ে যদি নারী শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বচর্চা থেকে বিরত থাকেন, তবে জাতীয় পর্যায়ে আমরা যোগ্য নারী নেতৃত্ব পাব কোথা থেকে? বেগম রোকেয়ার দর্শন কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে, তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটবে না।

এই অচলায়তন ভাঙার উপায় কী? সামনেই নির্বাচন। খুব অল্প সময়ে সবকিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে কিছু উদ্যোগ এখনই নেওয়া যায়। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নারী শিক্ষার্থীদের যেকোনো ধরনের হয়রানি বা ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে তারা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। প্রতিটি প্যানেলে বিভিন্ন পদে নির্দিষ্ট নারী কোটা বরাদ্দ থাকার নিয়ম করতে হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের প্রথম দায়িত্ব। নারী শিক্ষার্থীদের নিজেদেরই সংঘবদ্ধ হতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে কেউ তাঁদের অধিকার হাতে তুলে দেবে না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়। নারী শিক্ষার্থীদের একটি স্বতন্ত্র জোট বা ফোরাম গঠন করা যেতে পারে, যা নির্বাচনের পরও তাঁদের অধিকার নিয়ে কাজ করবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি নারী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ থাকে, তবে তা বেগম রোকেয়ার আদর্শের প্রতি চরম অবমাননা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন আসুক। কিন্তু এই নির্বাচন যদি নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত না করে কেবল আরেকটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার মঞ্চ হয়ে ওঠে, তবে তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গেই বেমানান।

লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত