
পরাধীনতার যুগে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ভাঙচুর ঘটবে, এটা স্বাভাবিক; কিন্তু স্বাধীনতার যুগেও তা যে বৃহত্তর জনগণের পক্ষে যাবে না, বিপদটা সেখানেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনীতি পূর্ববঙ্গের সব বাঙালিকে একত্র করেছিল (গোলাম আযমদের বাদ দিয়ে)। যে জন্য তখন জাতীয় লক্ষ্য যে সমাজতন্ত্র হবে, এটা খুব স্বাভাবিক ও সর্বজনস্বীকৃত সিদ্ধান্ত ছিল; আজ যে বড় দলগুলো সমাজতন্ত্র পরিত্যাগ করেছে, তার কারণটা তাত্ত্বিক নয়, বস্তুগত বটে। তাদের আদর্শ সমগ্র জনগণের স্বার্থ রক্ষা নয়, নিজেদের স্বার্থকে পুষ্ট করাই শুধু। তারা সমাজতন্ত্রী হবে কেন? কার ভয়ে, কোন দুঃখে!
বাঙালির জন্য সবচেয়ে বড় গর্বের বিষয় তার ভাষা ও সাহিত্য। ব্রিটিশ আমলে এই ভাষা ও সাহিত্যের যে অমন উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে, তার কারণ সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণে নিহিত নেই, নিহিত আছে সেই অবনত দশাতেও জনগণের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ভালোবাসায়। ইঙ্গবঙ্গরা বাংলা ভাষার চর্চা করেনি। এমনকি ইয়াং বেঙ্গলও নয়; চর্চা করেছেন তাঁরাই, যাঁরা ইংরেজের অধীনে থেকেও বাঙালিকে ভালোবেসেছেন। কিন্তু ওই সাহিত্যচর্চার অতি মর্মান্তিক সীমাবদ্ধতা ছিল দুটো। প্রথমটি হলো এই যে জনগণের ক্ষুদ্র একটি অংশই শুধু লেখাপড়া জানত বলে সাহিত্যের পাঠক-পরিধি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ, দ্বিতীয়টি এই যে ওই সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতার উপাদানও বিদ্যমান ছিল বৈকি। উভয় বঙ্গেই বাঙালি এখন স্বাধীন। কিন্তু সাহিত্যের পাঠকসংখ্যা এখনো সীমিত। অধিকাংশ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত; যারা আলো পেয়েছে, তাদেরও অনেকের সামর্থ্য নেই বই কেনার এবং যাদের সামর্থ্য ও শিক্ষা—দুটোই রয়েছে, তাদেরও অনেকে ইংরেজি পড়ে, বাংলা না পড়ে। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা কমেনি, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ভয়াবহ মাত্রায় তা বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রেণিগত সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে বৈকি। সমাজ পরিবর্তনের পক্ষে সাহিত্য কমই লেখা হচ্ছে, সামাজিক বিন্যাসকে টিকিয়ে রাখার পক্ষের সাহিত্যের তুলনায়।
আওয়ামী লীগ ছিল উঠতি মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠান, পাকিস্তান আমলে এই শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে জনগণের স্বার্থের কোনো বিরোধ বাধেনি; তখন তাই সমাজতন্ত্রের আওয়াজ চলে এসেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের যে অংশ ধনী হয়েছে, তারা সমাজতন্ত্রের কথা বলবে কোন কারণে? বিএনপির পক্ষে রাষ্ট্রীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তি সাধন যেমন স্বাভাবিক ছিল, আওয়ামী লীগের পক্ষেও তেমনি দলীয় কর্মসূচি থেকে সমাজতন্ত্রকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া ছিল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা; বিরোধিতাটা পেটে ছিল, তা মুখে চলে এসেছে, এই যা। আমাদের দুই জাতীয়তাবাদী দলই তাই অজাতীয়। কেউই বাঙালি নয়। কেউই বাংলাদেশের বাঙালিদের স্বার্থ দেখবে না। দেখবে শুধু নিজেদের স্বার্থ।
তাহলে বাঙালির কী হবে? তার স্বার্থ কে দেখবে? পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির অবস্থা এখন ভালো নয়। হিন্দির অত্যাচারে। টেলিভিশন সুযোগ হয়ে এসেছে—যেমন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মধ্যবিত্তের জন্য, তেমনি উত্তর ভারতীয় হিন্দির জন্যও। বাঙালি মধ্যবিত্ত বিনোদন লাভ করছে ঠিকই, কিন্তু ওদিকে হিন্দি আরও একটি পথ পেয়ে গেছে, মধ্যবিত্তের একেবারে অন্তঃপুরে প্রবেশের। বাঙালির জন্য গর্বের বস্তুত তার ভাষা, সেই বাংলা ভাষা ভারতে শুধু যে একটি প্রাদেশিক ভাষা, তা নয়; একটি কোণঠাসা ভাষাও বটে। কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এখন বাঙালির কর্তৃত্ব নেই, সেখানে অবাঙালিদেরই দৌরাত্ম্য। এই সহজ কারণে যে টাকার থলি এখন অবাঙালিদের করতলেই থাকে, বাঙালির হাতে না গিয়ে। এয়ারকন্ডিশন্ড মার্কেটে হেমন্তের গানের মাহাত্ম্য শিখ দোকানদারের কাছ থেকেই শুনতে হয়, বাঙালি ছেলেটি কর্মচারী হিসেবে সিডি এগিয়ে-পিছিয়ে দেয় মাত্র। কলকাতার জন্য একটি গৌরবের বিষয় ছিল তার চলচ্চিত্র। সে বিশেষ গৌরব এখন আর নেই। এখন আর কোনো সুচিত্রা-উত্তমের কথা শোনা যায় না। অদূরভবিষ্যতে মনে হয় যাবেও না। ব্যবসায়ী পুঁজির সেবক হয়ে মুম্বাইয়ের ধুমধাড়াক্কা ভারতের সর্বত্র যেমন রাজত্ব করছে, পশ্চিমবঙ্গেও তেমনি একাধিপত্য কায়েম করে বসে রয়েছে। তাকে হটায় কে? কলকাতার পাশের গঙ্গা এখন একটি আবর্জনাবাহী নদী।
সব মিলিয়ে সত্য এই যে বাঙালি সংস্কৃতি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে বেশ বিপন্ন। এ কথাটা ‘আনন্দবাজার’ গোষ্ঠীর সাহিত্যিকেরাও বলেন, যখন তাঁরা বাংলাদেশে আসেন। অবশ্য কলকাতায় বলেন বলে মনে হয় না। কেননা কলকাতায় এমন কথার বিশেষ মূল্য নেই। ভারতীয় বাঙালিরা যা করার তা-ই করবে—যেভাবে পারে, যতটা পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কী করব? বাংলাদেশে বাঙালির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য কে কতটা করবে এবং কী করবে?
এ দেশের জাতীয়তাবাদী দলগুলো বড় কিছু করবে বলে আশা করা বৃথা। তারা করবে না, তাদের করার কথাও নয়। বাঙালিকে বাঁচাতে হলে মূল যে কাজ করতে হবে, তা হলো বিদ্যমান আর্থসামাজিক বৈষম্য দূর করা। বৈষম্য দূর করার জন্য চাই পুঁজিবাদের ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের এবং সামন্তবাদী অবশেষগুলোর অবসান ঘটানোর জন্য সংঘবদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া। এটা তথাকথিত জাতীয়তাবাদীরা করবে না; বাংলাদেশীয় জাতীয়তাবাদীরা তো নয়ই, বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও নয়।
প্রসঙ্গত স্মরণ করার একটা বিষয় রয়েছে। সেটি এই যে অতীতের জাতীয়তাবাদীরা বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ নেয়নি। ব্রিটিশ আমলে তারা যখন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েছে, তখন সামন্তবাদকে শত্রু মনে করেনি এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাকে প্রশ্রয়ই দিয়েছে। বহু বছর আগে, এই শতাব্দীর প্রথম দিকে, প্রমথ চৌধুরী ‘রায়তের কথা’ নামে ছোট একটি বই লিখেছিলেন, তাতে তাঁর বক্তব্য যে বৈপ্লবিক ছিল, তা নয়, মোটামুটি সংস্কারবাদীই ছিল। কিন্তু তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন ‘ন্যাশনালিস্ট ওরফে এক্সট্রিমিস্ট’রা তো চটে একেবারে আগুন। তাদের পক্ষ থেকে শ্রীযুক্ত ব্যোমকেশ চক্রবর্তী মহাশয় এক বার্তা বের করেছেন। তার মোদ্দাকথা হলো ‘রায়তদের কোনো অধিকার দেওয়া হবে না, অন্তত এখন তো নয়ই। এখন তাদের লিবার্টি, ইক্যুয়িটি মন্ত্র জপ করতে শেখানো যাক, পরে দূরভবিষ্যতে তাদেরকে কোনোরূপ অধিকার দেওয়া হবে কি না, তা বিবেচনা করা যাবে।’
ওদিকে আবার সত্য ছিল সেটাও যে ভারতীয় কংগ্রেস সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করতে চাইলেও একটা বিশেষ সম্প্রদায়েরই মুখপাত্রে পরিণত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত। আর মুসলিম লীগের তো জন্মই হয়েছিল তার নিজের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠানরূপে। ফলে এই দুই জাতীয়তাবাদী দল রাজনীতি করতে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ করবে কি, বঙ্গ তথা ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিতই করেছে। চিত্তরঞ্জন দাশ চেষ্টা করেছিলেন বাঙালির রাজনীতিকে আলাদা করে রাখবেন ভারতীয় রাজনীতি থেকে। তাঁর মৃত্যুর পর ওই চেষ্টা করার মতো আর কেউ রইলেন না।
বাংলাদেশে বাঙালির জন্য ভবিষ্যতের উজ্জ্বলতা জাতীয়তাবাদী দলগুলোর কাজের ওপর নির্ভর করছে না, নির্ভর করছে সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী মানুষেরা, অর্থাৎ যথার্থ অর্থে জাতীয়তাবাদীরা কী করেন, তার ওপরই। রাজাকার গোলাম আযমের বিচার করার জন্য যে গণ-আদালত বসেছিল, তার ব্যাপারে উদ্যোগ যেমন বিএনপি বা আওয়ামী লীগ—কেউই নেয়নি, দলবহির্ভূত বুদ্ধিজীবীদেরই নিতে হয়েছে এবং তার সমাবেশে মানুষের যোগদান যে দলীয়ভাবে ঘটেনি, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে এর তাৎপর্য লক্ষ করার বিষয়। নেতৃত্ব ওই অংশকেই নিতে হবে। কিন্তু কোনো আন্দোলনই স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর নির্ভরশীল হয়ে দীর্ঘস্থায়ী, কিংবা সুদূরপ্রসারী হতে পারে না। তাকে সংগঠিত হতে হয়। তাই প্রয়োজন হবে সুগঠিত ও স্থির লক্ষ্যাভিসারী আন্দোলনের। প্রয়োজন হবে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে জনগণের ঐক্যের। লক্ষ্য হবে বৈষম্যহীন সমাজ গড়া, যে লক্ষ্য অর্জনের মৌলিক শর্ত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ।
বাঙালি বাঁচবে কথায় নয়, কাজে। সব কাজের অন্তর্গত লক্ষ্য হবে বৈষম্য বাড়ানো নয়, বৈষম্য কমানো। এখন আমরা যা-ই করি না কেন, লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বৈষম্য বৃদ্ধি। তাই তো এত হতাশা, এমন পশ্চাৎপদতা আর বিপন্ন দশা।

কাউকে এখন আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে যেকোনো হীন আচরণ করা যেন ন্যায্যতা পেয়ে গেছে! আওয়ামী দোসর বলে যেমন কোনো ব্যক্তিকে মব সৃষ্টি করে মারধর করা যেতে পারে, তেমন তাকে লুটও করা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেখা যাবে, একদিন দোসর বলে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হাল ফ্যাশনে পরিণত হবে!
৩০ মিনিট আগে
আধুনিক মানব সভ্যতার ইতিহাসে জেনারেশন জেড (১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) এক অনন্য অথচ চ্যালেঞ্জিং সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে একটি বিতর্কিত দাবি জোরালো হচ্ছে—জেনারেশন জেডই ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম...
২ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের ওপর। মানুষের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে এই বাহিনীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে, পুলিশকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়—এটি আস্থার সংকট,
১ দিন আগে
বর্তমান সময়ে যখন পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানে, তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসরমাণ, তখন সমাজকে বা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আজ থেকে ২৫ বছর বা ৩০ বছর পর কী হবে, সেই চিন্তা এখনই করতে হবে। আজকের সমস্যার জন্য আজকে চিন্তা করলে সমস্যা দূর তো হবেই না, সমস্যায় জট পাকিয়ে যাবে।
১ দিন আগে