
আধুনিক মানব সভ্যতার ইতিহাসে জেনারেশন জেড (১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) এক অনন্য অথচ চ্যালেঞ্জিং সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে একটি বিতর্কিত দাবি জোরালো হচ্ছে—জেনারেশন জেডই ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম, যারা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের (মিলেনিয়ালস) তুলনায় বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড বা আইকিউ টেস্টে দুর্বল ফল করছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. জ্যারেড কুনি হরভাথ এবং সমাজবিজ্ঞানী জোনাথন হাইটের মতো বিশেষজ্ঞরা একে একটি ‘বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সংকটের মূলে রয়েছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী শত্রু—অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং ডিজিটাল আসক্তি।
বিগত শতাব্দীতে মনোবিজ্ঞানী জেমস ফ্লিন লক্ষ করেছিলেন, উন্নত পুষ্টি ও শিক্ষাব্যবস্থার কারণে প্রতি দশকে মানুষের গড় আইকিউ স্কোর বাড়ছে, যা ‘ফ্লিন ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেখা যাচ্ছে, এর ঠিক উল্টো চিত্র। নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলোতে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে আইকিউ স্কোর বৃদ্ধির ধারা শুধু থেমেই যায়নি, বরং তা নিম্নমুখী। একে বলা হচ্ছে ‘রিভার্স ফ্লিন ইফেক্ট’।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে যৌক্তিক যুক্তি (অ্যাবস্ট্রাক্ট রিজোনিং) এবং শব্দভান্ডারের ক্ষেত্রে জেন-জির স্কোরে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। নিউইয়র্ক পোস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ড. হরভাথ উল্লেখ করেছেন, এই প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভরতা তাদের মৌলিক চিন্তাশক্তি এবং ভাষাজ্ঞানকে সংকুচিত করছে। এর প্রধান কারণ হলো ‘অগভীর শিখন’ বা সারফেস লার্নিং। আগে যেখানে একজন শিক্ষার্থী একটি বই পড়ে পুরো বিষয়টি আত্মস্থ করত, এখন তারা গুগল বা টিকটকে ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও দেখে তথ্যের সারাংশ নিতে পছন্দ করে। ফলে মস্তিষ্ক দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি গঠনের সুযোগ পাচ্ছে না।
জেন-জি হলো ইতিহাসের প্রথম ‘ডিজিটাল নেটিভ’ প্রজন্ম, যাদের শৈশব আর স্মার্টফোনের বিবর্তন একই সমান্তরালে চলেছে। এই অবাধ ইন্টারনেট সংযোগ শুধু তাদের জীবনযাত্রাই নয়, বরং মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি বা ‘ওয়ারিং’ চিরতরে বদলে দিয়েছে। বর্তমানে টিকটক বা রিলসের মতো অতি সংক্ষিপ্ত ভিডিও বা ‘শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট’-এর জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে এই প্রজন্মের বিশাল এক সময়। এর নেতিবাচক প্রভাবে তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ফলে গভীর চিন্তার সক্ষমতা বা ‘ডিপ ওয়ার্ক’ করার সহজাত ক্ষমতা হারিয়ে তারা এখন অবিরাম নোটিফিকেশন ও দ্রুত ডোপামিন পাওয়ার এক অন্তহীন চক্রে বন্দী হয়ে পড়ছে। এই নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল কোলাহল তাদের মস্তিষ্ককে দীর্ঘমেয়াদি মনঃসংযোগের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় অভ্যস্ত করে তুলছে।
এখানে একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো ‘কগনিটিভ অফলোডিং’। বর্তমান প্রজন্ম তথ্য মনে রাখার চিরাচরিত চাপের চেয়ে সেই তথ্য ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্রে কোথায় পাওয়া যাবে, তা খুঁজে বের করায় অনেক বেশি পটু। সহজ কথায়, তারা তাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিশক্তির বড় একটি অংশের ভার ‘গুগল’ বা ক্লাউড স্টোরেজের ওপর অর্পণ করেছে। এতে মস্তিষ্কের মেমোরি স্টোরেজ ব্যবহারের ধরনটিই পাল্টে যাচ্ছে; যা প্রথাগত আইকিউ পরীক্ষায় তাদের স্কোর কমিয়ে দিচ্ছে। যেখানে আগেকার প্রজন্ম তথ্যকে মস্তিষ্কে ধারণ করত, জেন-জি সেখানে তথ্য পুনরুদ্ধারের প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে তথ্যের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়েও গভীর বিশ্লেষণ এবং তাত্ত্বিক উপলব্ধির জায়গায় তারা একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার সম্মুখীন হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও বেশি জটিল এবং দ্বিমুখী। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল শিক্ষা কিংবা অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ‘শর্টকাট লার্নিং’-এর সংস্কৃতি তৈরি করেছে। আগে ঢাকার নীলক্ষেত বা লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের ভিড় দেখা যেত বইয়ের সন্ধানে। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ফেসবুক গ্রুপ বা ইউটিউব টিউটরিয়াল। শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবই পড়ার ধৈর্য হারিয়ে খুঁজছে শর্ট নোট এবং মডেল টেস্টের সমাধান। ফলে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এলেও তাদের জ্ঞানের গভীরতা থাকছে না।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্যও দেখা যাচ্ছে। গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কম থাকায় এখনো কাগজের বই এবং সরাসরি শিক্ষকের সান্নিধ্য বেশি পাচ্ছে। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা তথাকথিত আধুনিক শহরকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি মনোযোগী এবং ধৈর্যশীল। অন্যদিকে, ঢাকার নামীদামি স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত সুযোগ বেশি পেলেও তারা ডিজিটাল আসক্তির চোরাবালিতে বেশি নিমজ্জিত। পড়ার টেবিলে ২০ মিনিটের বেশি একাগ্রতা ধরে রাখা তাদের জন্য এখন হিমালয় জয়ের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে জেন-জিকে শুধু প্রথাগত মানদণ্ডে ‘কম বুদ্ধিমান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে, এটি একপক্ষীয় ও সংকীর্ণ বিচার। বাস্তবতা হলো, এই প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার শক্তি ভিন্ন এক ধারায় বিবর্তিত হচ্ছে। যদিও গাণিতিক বিমূর্ত যুক্তি কিংবা তথ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি ধারণে তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু ‘ভিজুয়াল স্পেশাল রিজোনিং’ বা স্থানিক বুদ্ধিমত্তায় তারা অভাবনীয় নৈপুণ্য দেখাচ্ছে। জটিল সব ডিজিটাল ইন্টারফেস, ত্রিমাত্রিক ডিজাইন কিংবা আধুনিক সফটওয়্যারের গতিপ্রকৃতি তারা অত্যন্ত দ্রুত আত্মস্থ করতে পারে। তাদের এই প্রখর ‘টেক-অ্যাডাপ্টিবিলিটি’ বা প্রযুক্তিগত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নির্দেশ করে যে তাদের মস্তিষ্ক এখনকার দ্রুত পরিবর্তনশীল ও দৃশ্যনির্ভর পৃথিবীর উপযোগী এক নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা অর্জনে বেশি মনোযোগী।
এ ছাড়া তাদের সামাজিক ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (ইকিউ) বেশ প্রশংসনীয়। জেন-জি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চিন্তা করে। সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ রক্ষা, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তারা বেশি সচেতন। জলবায়ু পরিবর্তন বা নারী অধিকারের মতো বিষয়ে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নতুন আশার আলো দেখায়। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর জন্য হয়তো এই ধরনের ‘ফ্লুইড ইন্টেলিজেন্স’ বা পরিবর্তনশীল বুদ্ধিমত্তাই বেশি কার্যকর।
শিক্ষার প্রধান অনুষঙ্গ হলো মানবিক মিথস্ক্রিয়া। ভার্চুয়াল ক্লাস বা রেকর্ডেড ভিডিও কখনো একজন শিক্ষকের সরাসরি সংস্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। ড. হরভাথের মতে, মানুষ মূলত মানুষের চোখের ভাষা, অঙ্গভঙ্গি এবং সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে শেখে। জেনারেশন জেড-এর মধ্যে সামাজিক দক্ষতা কমে যাওয়া এবং একাকিত্ব বাড়ার একটি বড় কারণ হলো এই স্ক্রিন-নির্ভরতা। বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতির অভাব আজ স্পষ্ট।
জেনারেশন জেড-কে শুধু ‘দুর্বল প্রজন্ম’ বলে অভিযুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মনে রাখতে হবে, তাদের হাতে ডিভাইস তুলে দিয়েছি আমরাই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—প্রথমত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় ফোন দূরে রেখে বই পড়ার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু পাঠ্যবই নয়, সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী বই পড়ার জন্য পাঠচক্র কিংবা বুক ক্লাব গড়ে তোলা জরুরি। তৃতীয়ত, শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন অর্থাৎ মুখস্থ বিদ্যা বা শর্টকাটের বদলে শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টভিত্তিক কাজ, বিতর্ক এবং সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে চিন্তাশক্তি বাড়াতে উৎসাহিত করতে হবে।
জেনারেশন জেড বর্তমানে এক ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিমত্তা মানে শুধু তথ্য জানা নয়, বরং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।’ জেন-জির মধ্যে সেই অভিযোজন ক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত বুদ্ধিমত্তা সন্দেহাতীতভাবে প্রবল। তবে এই বিবর্তন যেন আমাদের মৌলিক মানবিক গুণাবলিকে গ্রাস না করে। যদি আমরা এখনই বই পড়ার গভীর অভ্যাস, নির্জনতায় চিন্তার চর্চা এবং সরাসরি মানবিক মিথস্ক্রিয়া ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আসন্ন ‘জেনারেশন আলফা’ এক ভয়াবহ জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের মুখে পড়বে।
মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি যেন আমাদের মস্তিষ্কের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়, বরং তা যেন হয় আমাদের চিন্তাশক্তির জন্য এক অনন্য পরিপূরক—এটাই হোক আগামীর পৃথিবীর জন্য আমাদের প্রধান শপথ।

কাউকে এখন আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার সঙ্গে যেকোনো হীন আচরণ করা যেন ন্যায্যতা পেয়ে গেছে! আওয়ামী দোসর বলে যেমন কোনো ব্যক্তিকে মব সৃষ্টি করে মারধর করা যেতে পারে, তেমন তাকে লুটও করা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেখা যাবে, একদিন দোসর বলে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হাল ফ্যাশনে পরিণত হবে!
৩০ মিনিট আগে
পরাধীনতার যুগে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ভাঙচুর ঘটবে, এটা স্বাভাবিক; কিন্তু স্বাধীনতার যুগেও তা যে বৃহত্তর জনগণের পক্ষে যাবে না, বিপদটা সেখানেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনীতি পূর্ববঙ্গের সব বাঙালিকে একত্র করেছিল (গোলাম আযমদের বাদ দিয়ে)। যে জন্য তখন জাতীয় লক্ষ্য যে সমাজতন্ত্র হবে...
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের ওপর। মানুষের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসন বজায় রাখতে এই বাহিনীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গত দুই বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে, পুলিশকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়—এটি আস্থার সংকট,
১ দিন আগে
বর্তমান সময়ে যখন পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানে, তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসরমাণ, তখন সমাজকে বা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আজ থেকে ২৫ বছর বা ৩০ বছর পর কী হবে, সেই চিন্তা এখনই করতে হবে। আজকের সমস্যার জন্য আজকে চিন্তা করলে সমস্যা দূর তো হবেই না, সমস্যায় জট পাকিয়ে যাবে।
১ দিন আগে