Ajker Patrika

ভর্তি পদ্ধতি: লটারি না পরীক্ষা

মাসুদ উর রহমান, কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী
ভর্তি পদ্ধতি: লটারি না পরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ভর্তি পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও ভর্তি পরীক্ষা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই সিদ্ধান্তটি কি আরও কিছুটা সময় নিয়ে, বাস্তব অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে নেওয়া যেত না? ২০২০ সালে যখন করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল, স্থবির হয়ে পড়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, তখন অনেকটা উপায়ান্তর না দেখে তৎকালীন সরকারের শিক্ষা বিভাগ স্কুলগুলোর ভর্তি কার্যক্রমে লটারি পদ্ধতি চালু করেছিল।

সময়ের প্রয়োজনে সে সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে সে সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মতামত থাকলেও সরকার সিদ্ধান্তটিকে তুলনামূলক ভালো বিবেচনায় রেখে দেয়। এভাবেই পরবর্তী বছরগুলোতে লটারি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন আমলে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে এবং পক্ষে-বিপক্ষের আলোচনা শেষে লটারি পদ্ধতিটিকেই অন্তর্বর্তী সরকারও বহাল রাখে।

২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর আমরা আবারও ফিরে পেলাম রাজনৈতিক সরকার। সব সরকারেরই একটা নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে, যার ভিত্তিতে তারা পলিসি নির্ধারণ করে। নতুন সরকারও তাদের পলিসি মোতাবেক সবকিছু নির্ধারণ করবে—এমনটিই স্বাভাবিক, যেমনটি হয়েছে অতীতে। অতীত বাস্তবতায় দেখা গেছে, সব সরকারই অনেকটা তড়িঘড়ি করে নতুন নতুন শিক্ষাক্রম, শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেছে। ফলে অতীতের অনেক সিদ্ধান্তই কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার অন্তত ব্যতিক্রম হবে, এমনটাই মানুষের প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে যখন লটারির মাধ্যমে ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যাচটি এ বছরই এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছে, তখন তাদের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই নীতিগত পরিবর্তন কতটা যৌক্তিক—তা ভাবনার দাবি রাখে।

লটারি পদ্ধতিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাস এইটে ছিল, তখন বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে এই পদ্ধতিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক একাডেমিক সক্ষমতা মূল্যায়নের সুযোগ তেমনভাবে পাওয়া যায়নি। তবে এ বছরের এসএসসির ফল সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। এটি হবে লটারি পদ্ধতির একটি বাস্তব মূল্যায়ন, যা শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়নের আগে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কিছুটা তাড়াহুড়ো বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে সম্প্রতি প্রকাশিত জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার ফল একটি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। দেখা গেছে, শুধু নামকরা বা ঐতিহ্যবাহী স্কুলই নয়, শহরের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের পাশাপাশি গ্রামের স্কুল থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে। আগে যেসব স্কুল ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে সেরা শিক্ষার্থীদের বেছে নিয়ে ভালো ফল করত, সেখানে এবার বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে। এর বিপরীতে, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো ফল করেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে একটি সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী বণ্টনের ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আর কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত থাকেনি। বরং তারা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন স্কুলে। ফলে আগে যেসব প্রতিষ্ঠান ‘দুর্বল’ হিসেবে বিবেচিত হতো, তারাও এখন ভালো শিক্ষার্থী পেয়েছে এবং সেই শিক্ষার্থীরাই তাদের সাফল্যের মুখ দেখিয়েছে।

এত অল্প বয়সে শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ তৈরি করা কতটা যুক্তিসংগত?

এই প্রক্রিয়া শুধু ফলাফলের পরিবর্তনই আনেনি, বরং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনেছে। বেসরকারি স্কুলগুলোর প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, তা কিছুটা হলেও কমেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে—তারা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে, ভালো ফল অর্জনের জন্য শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, ব্যক্তিগত পরিশ্রম ও সঠিক দিকনির্দেশনাই মুখ্য।

আসলে শিক্ষার মান নির্ধারণে কেবল প্রতিষ্ঠানই একমাত্র নিয়ামক নয়। একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য নির্ভর করে তিনটি প্রধান উপাদানের ওপর—শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক। এই তিনের সমন্বিত প্রচেষ্টাই একটি শিক্ষার্থীকে ভালো ফলের দিকে নিয়ে যায়। তাই ভর্তি পদ্ধতি পরিবর্তনের চেয়ে এই সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করার দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার যৌক্তিকতা কী? বিশেষ করে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি গভীরভাবে ভাবা দরকার। এত অল্প বয়সে শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ তৈরি করা কতটা যুক্তিসংগত? এটি যেমন শিশুদের মানসিক চাপ বাড়ায়, তেমনি অভিভাবকদের মধ্যেও অযথা উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করে।

ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে কোচিং-নির্ভরতা। অভিভাবকেরা সন্তানকে এগিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে পাঠান। ফলে গড়ে ওঠে একধরনের প্রতিযোগিতামূলক বাজার, যেখানে শিক্ষা নয়, বরং পরীক্ষায় ভালো করার কৌশলই মুখ্য হয়ে ওঠে। এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষাকে আনন্দময় করার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

এ ছাড়া গাইড বই, সহায়ক বই এবং কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা বাড়ার ফলে অভিভাবকদের আর্থিক চাপও বৃদ্ধি পায়। রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কোচিং ব্যবসা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তোলে, যা দীর্ঘ মেয়াদে একটি সুস্থ শিক্ষা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। হঠাৎ করে একটি পদ্ধতি বাতিল করে অন্যটি চালু করার বদলে, বিদ্যমান পদ্ধতির কার্যকারিতা যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে যখন লটারি পদ্ধতির ইতিবাচক কিছু প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান, তখন সেটিকে আরও সময় দিয়ে মূল্যায়ন করা যেত।

সবশেষে বলব, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এখানে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণ। ভর্তি পদ্ধতি যাই হোক না কেন, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশ নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জিয়ার নাম না বলায় বিএনপির স্বাধীনতার অনুষ্ঠান বর্জন, ইউএনও বদলি

ইসরায়েলের পরমাণু বোমার তথ্য ফাঁসকারী আরব ইহুদি ভানুনুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস

টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে শিশুসহ নিহত ৫

ইরানের প্রেসিডেন্টের পুত্র ইউসেফ পেজেশকিয়ানের ডায়েরিতে উঠে এল যুদ্ধের চিত্র

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত