Ajker Patrika

বাংলার নবাবদের কোরবানি

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি

তৌসিফ রেজা আশরাফী, সৈয়দপুর, নীলফামারী
ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি
বর্তমানে কোরবানি অনেকাংশে সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের সংস্কৃতি হয়ে পড়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষঙ্গ কোরবানি। এটি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আত্মত্যাগ, সামাজিক সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের এক মহান শিক্ষা। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে কোরবানি বহু সময়েই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলার নবাবি আমলে কোরবানির চর্চা শুধু ধর্মীয় ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সামাজিক ন্যায়বণ্টন, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক বৈধতারও এক কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বাংলার নবাবদের দরবারে ঈদুল আজহার কোরবানি ছিল ধর্মীয় অনুভূতি ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার এক ঐতিহাসিক প্রতিফলন।

বাংলায় মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতায় মোগল আমলে যে প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে, নবাবি আমলে তা আরও সুসংগঠিত হয়। মুর্শিদ কুলি খান বাংলার প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকার পরিবর্তে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তাঁর সময় থেকেই ধর্মীয় উৎসবগুলোকে অধিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া শুরু হয়। ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে নবাবি দরবারে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার অনুষ্ঠান ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ঈদুল আজহার সময় নবাবি দরবারে বিশাল পরিসরে কোরবানির আয়োজন করা হতো। নবাব নিজে ঈদের নামাজ আদায় করতেন এবং পরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানি সম্পন্ন করতেন। এই আয়োজন ছিল মূলত জনগণের সামনে শাসকের ধর্মীয় দায়বদ্ধতা প্রদর্শনের একটি উপায়। তবে এর সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও গভীরভাবে জড়িত ছিল। কোরবানির মাংস দরিদ্র, এতিম, মিসকিন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, অনেক সময় রাজকোষ থেকেও এই বণ্টন কার্যক্রমে সহায়তা দেওয়া হতো।

আলীবর্দী খানের আমল ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মারাঠা আক্রমণের সময়। এই সময় বাংলার অর্থনীতি ও কৃষি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ইতিহাসবিদ গোলাম হোসেন সালিম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’-এ উল্লেখ করেন, আলীবর্দী খান সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে বিভিন্ন ত্রাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ঈদুল আজহার সময় দরিদ্র মানুষের মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণ ছিল তাঁর অন্যতম সামাজিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নবাব শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই পালন করেননি, বরং জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও সুদৃঢ় করেছিলেন।

বাংলার নবাবদের কোরবানির সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পশুপালন, পশুর হাট, পরিবহন ও চামড়াশিল্পে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতো। ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বাংলার কৃষি ও পশুসম্পদের সমৃদ্ধির উল্লেখ করেছেন। যদিও এটি মোগল আমলের দলিল, তবে পরবর্তী নবাবি আমলেও সেই অর্থনৈতিক ধারা অব্যাহত ছিল। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে পশুর হাট বসত এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে একধরনের মৌসুমি গতি সৃষ্টি হতো।

কোরবানির মাধ্যমে নবাবেরা একধরনের সামাজিক পুনর্বণ্টন নীতিও বাস্তবায়ন করতেন। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তায় সম্পদের সুষম বণ্টনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’য় উল্লেখ করেন, শাসকের দায়িত্ব হলো সমাজে ন্যায় ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। বাংলার নবাবদের কোরবানির আয়োজন সেই রাষ্ট্রীয় কল্যাণনীতির একটি প্রতীকী রূপ ছিল। কারণ, কোরবানির মাংস সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো মানে ছিল খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

নবাবদের এই আয়োজন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মুসলিম শাসক হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তাঁদের জন্য অপরিহার্য। বিশেষত বাংলার মতো বহুধর্মীয় অঞ্চলে মুসলিম শাসকদের জনগণের ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা প্রয়োজন ছিল। ফলে ঈদ, মহররম, মিলাদ ও কোরবানির মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় রূপ লাভ করে। ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটন তাঁর ‘The Rise of Islam and the Bengal Frontier’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বাংলায় মুসলিম শাসকেরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উৎসবকে ব্যবহার করেছিলেন সামাজিক সংহতি তৈরির জন্য।

সিরাজদ্দৌলার আমলেও ঈদুল আজহার রাজকীয় আয়োজনের বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও তাঁর শাসনকাল ছিল সংক্ষিপ্ত ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে পরিপূর্ণ, তবু দরবারি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কোরবানির অনুষ্ঠান অব্যাহত ছিল। অনেক গবেষকের মতে, জনগণের সমর্থন ধরে রাখার জন্য নবাবি দরবার ধর্মীয় উৎসবগুলোকে গুরুত্ব দিত। কারণ, এসব আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শাসকের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি হতো।

বাংলার নবাবদের কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আলেম-উলামা ও খানকাহকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক। বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহে কোরবানির মাংস পাঠানো হতো। সুফি দরবার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতা তাঁদের সামাজিক প্রভাব বাড়াতে সাহায্য করেছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় পীর-মাশায়েখদের মাধ্যমে নবাবদের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে ছড়িয়ে পড়ত।

ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মুসলিম সমাজে ধর্মীয় উৎসবগুলো কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় ছিল না; বরং তা সামাজিক ঐক্য গঠনের শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। বাংলার নবাবেরা এই বাস্তবতাকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। কোরবানির মতো ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে তাঁরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে নিজেদের মানবিক শাসক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। ফলে কোরবানি একদিকে যেমন ইবাদত, অন্যদিকে তেমনি জনকল্যাণমূলক রাজনীতিরও অংশ হয়ে ওঠে।

বর্তমান সমাজে কোরবানি অনেকাংশে সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। বড় পশু, ব্যয়বহুল আয়োজন কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রবণতা অনেক সময় কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। অথচ বাংলার নবাবদের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোরবানির মূল চেতনা হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ইসলামি সমাজব্যবস্থায় কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো সম্পদের প্রবাহ নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশে এখনো বহু মানুষ ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। যদি সমাজের বিত্তবান শ্রেণি নবাবি ঐতিহ্যের জনকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, তবে কোরবানি হতে পারে সামাজিক বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর উপায়। বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সম্মিলিত কোরবানি ও মাংস বিতরণের মাধ্যমে সেই কাজ করার চেষ্টা করছে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলার নবাবদের কোরবানি ছিল ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক অনন্য সমন্বয়। তাঁরা কোরবানিকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত হিসেবে দেখেননি; বরং জনকল্যাণ ও সামাজিক সংহতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইতিহাসের এই অধ্যায় আজও আমাদের শেখায়, ধর্মীয় উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন তার সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বাংলার নবাবদের কোরবানির ঐতিহ্য সেই মানবিক ইসলামেরই এক উজ্জ্বল ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত