
আমাদের জাতীয় জীবনে বিচিত্র সব রোগের প্রকোপ দেখা যায়। তার মধ্যে একটি রোগ নানা সময়ে মাথা চাড়া দেয় এবং সেটা ফিরে ফিরে আসে। রোগটির নাম ‘রবীন্দ্র-চুলকানি’। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর স্বীকৃতি এখনো না মিললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর মহামারি রূপ দেখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত নড়েচড়ে বসতে পারে। এ রোগের প্রধান উপসর্গ হলো, রোগী রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়েছেন কি না, তাঁর গান শুনেছেন কি না, এমনকি তাঁর লেখা কোনো বইয়ের মলাট খুলেছেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না; কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করার বেলায় তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনলে মনে হয়, বিশ্বসাহিত্যের ময়নাতদন্ত তিনি একাই শেষ করে ফেলেছেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান যত কম, তাঁকে নিয়ে আপত্তির মাত্রা তত বেশি। যেন জ্ঞানের সঙ্গে আপত্তির একটি উল্টো সম্পর্ক আছে—জ্ঞান কমলে আপত্তি বাড়ে, আর যুক্তি কমলে গলার স্বর আপনাআপনি চড়তে থাকে।
এই রোগের জীবাণু খুবই শক্তিশালী। এর সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবিষ্কার করেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু এবং ভারতীয়। অতএব, তাঁর লেখা পড়া যাবে না, তাঁর গান গাওয়া যাবে না, বাংলাদেশের দেয়ালে তাঁর ছবি আঁকাও চলবে না। তাঁদের দেশপ্রেমের অভিধানে বাঙালিত্বের আগে ধর্মপরিচয়, সাহিত্যের আগে নাগরিকত্ব এবং যুক্তির আগে আবেগের স্থান। বাংলা ভাষাকে তাঁরা এমন এক সম্পত্তি মনে করেন, যার দলিল তাঁদের পূর্বপুরুষেরা বুঝি কোনো গোপন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে লিখে দিয়ে গেছেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন কবিকে বাংলার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার থেকে বাদ দিতে তাঁদের বিশেষ অসুবিধা হয় না। কবিতার বই খুলে পড়ার দরকার কী? কবির ধর্মের ঘরটিতে টিকচিহ্ন মেরে দিলেই তো সাহিত্যবিচারের কাজ শেষ!
তাঁদের যুক্তি মেনে নিলে বাংলা ভাষার জন্য শিগগিরই একটি সীমান্তচৌকি খুলতে হবে। কবিতা পড়তে ঢোকার আগে পাঠককে পাসপোর্ট দেখাতে হবে, গান শোনার আগে গীতিকারের নাগরিকত্ব যাচাই করতে হবে, আর সাহিত্যিকের ধর্মীয় পরিচয় সন্দেহজনক হলে তাঁর বই বাজেয়াপ্ত করতে হবে। লাইব্রেরিতে বইয়ের তাকের বদলে ধর্মীয় পরিচয় অনুযায়ী খাঁচা বানানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। পাঠক বই চাইতে এলে গ্রন্থাগারিক জিজ্ঞেস করবেন, ‘আপনার ধর্ম কী?’ পাঠক বলবেন, ‘আমি বাংলা সাহিত্য পড়তে এসেছি।’ গ্রন্থাগারিক বিস্মিত হয়ে বলবেন, ‘সাহিত্য দিয়ে কী হবে? আগে ধর্মীয় যোগ্যতার সনদ দেখান!’ এমন ব্যবস্থা চালু হলে অজ্ঞতাও একদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে যেতে পারে।
অথচ রবীন্দ্রনাথ যখন সাহিত্য রচনা করেছেন, তখন বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানা ছিল না। আমরা ছিলাম অবিভক্ত ভারতবর্ষের অধিবাসী। আজকের বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি থেকেছেন, পদ্মার বুকে নৌকায় ঘুরেছেন, বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখেছেন, সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। এই ভূখণ্ড তাঁর অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সৃষ্টির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশভাগের পর মানচিত্র বদলেছে, রাষ্ট্রের নাম বদলেছে, নাগরিকত্বের পরিচয় বদলেছে; কিন্তু ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করে রাতারাতি বদলে ফেলা যায় না। অথচ আমাদের ইতিহাসের নতুন দারোগারা এমনভাবে রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি ঘোষণা করেন, যেন দেশভাগের আগেই তিনি ভিসার মেয়াদ শেষ করে অবৈধভাবে শিলাইদহে অবস্থান করছিলেন!
এই দারোগাদের যুক্তি অনুযায়ী, দেশভাগের আগে জন্ম নেওয়া আমাদের পূর্বপুরুষদেরও একদিন নাগরিকত্বের পরীক্ষায় বসতে হতে পারে। তাঁরা কোন রাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হয়তো বলা হবে, ‘আপনার জন্মের সময় তো এই রাষ্ট্রই ছিল না, কাজেই আপনার পরিচয় সন্দেহজনক।’ ইতিহাসকে তাঁরা এমন এক খেলনার বাক্স মনে করেন, যেখান থেকে সুবিধামতো পরিচয় বের করে পরিয়ে দেওয়া যায়, আবার অসুবিধা হলে খুলে ফেলে দেওয়া যায়। তাঁদের হাতে ইতিহাস পড়লে অতীতও নিরাপদ নয়; মৃত মানুষদেরও নতুন করে পরিচয় যাচাইয়ের লাইনে দাঁড়াতে হবে।
এরপর আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার অভিযোগ। অভিযোগটি এতবার উচ্চারিত হয়েছে যে কোনো কোনো মানুষের মনে হয়তো এটি ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ের প্রথম পাতায় ছাপা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও দালিলিক প্রমাণ কোথায়? কোনো অভিযোগ বারবার বললেই তা সত্য হয়ে যায় না। মিথ্যাকে শতবার পুনরাবৃত্তি করলে সত্যের পোশাক পরানো যায় বটে, কিন্তু তার গায়ে প্রমাণের মাংসপেশি গজায় না। ইতিহাসের বিচার করতে হয় দলিল, নথি, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও গবেষণার ভিত্তিতে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজিত মন্তব্যের ভিত্তিতে নয়।
কিন্তু আমাদের স্বঘোষিত ইতিহাসবিদদের এসব ঝামেলা পছন্দ নয়। তাঁদের আদালতে সাক্ষীর প্রয়োজন নেই, দলিলের প্রয়োজন নেই, গবেষকের প্রয়োজন নেই। আসামির নাম রবীন্দ্রনাথ, ধর্ম হিন্দু—ব্যস, অভিযোগ প্রমাণিত! রায়ও প্রস্তুত: সাহিত্য বর্জন, গান নিষিদ্ধ, প্রতিকৃতি অপসারণ। তাঁদের বিচারব্যবস্থায় বিচারকের চেয়ারটি খালি থাকলেও চলে; সেখানে একটি ধর্মীয় পরিচয়পত্র আর কয়েকটি জোরালো স্লোগান রাখলেই ন্যায়বিচারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন। দেশের আদালতে বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু তাঁদের আদালতে রায় হয় মুহূর্তে। শুধু প্রমাণ হাজির করার সময় এলেই আদালত মুলতবি হয়ে যায়।
অবশ্য রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করা যাবে না, এমন কথা কেউ বলছে না। তিনি কোনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। তাঁর সাহিত্য, বক্তব্য কিংবা চিন্তার কোনো দিক নিয়ে আপত্তি থাকলে তা নিয়ে যুক্তিসংগত আলোচনা হোক। কিন্তু সমালোচনা করতে হলে পড়তে হয়, জানতে হয়, বুঝতে হয়। না পড়ে নিন্দা করা অনেকটা না খেয়ে রান্নার সমালোচনা করার মতো। পার্থক্য হলো, রান্নার সমালোচককে অন্তত খাবারের গন্ধ নিতে হয়; রবীন্দ্রনাথের সমালোচকদের সেই কষ্টটুকুও করতে হয় না। কবির ধর্মীয় পরিচয় জেনে তাঁরা সাহিত্যবিচারের এমন দ্রুত নিষ্পত্তি করেন যে বইয়ের পাতা উল্টানোর আগেই বইটি তাঁদের কাছে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যায়।
সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য অবশ্য রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর বীরত্ব। একদল বীরপুঙ্গব দেয়ালে আঁকা কবির মুখে কালি মেখে নিজেদের দেশপ্রেমের প্রমাণপত্র তৈরি করতে চান। তাঁদের সাহস দেখে ইতিহাসের বীরেরা নিশ্চয়ই নতুন করে আত্মজীবনী লেখার কথা ভাবছেন। যাঁরা নির্বাক একটি প্রতিকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বিজয়ী হন, তাঁদের বীরত্বের পদক কোন মন্ত্রণালয় দেয়, তা জানা দরকার। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করতে সাহস লাগে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মেরুদণ্ড লাগে; কিন্তু দেয়ালে কালি মাখাতে লাগে একটি কৌটা আর সামান্য হাতের জোর। এই সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে দেশপ্রেমের এমন প্রদর্শনী করা যায় যে, প্রকৃত দেশপ্রেমও লজ্জায় মুখ ঢাকে।
দেশের দুর্নীতি, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা শিক্ষার সংকট নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ কতটা, সে প্রশ্ন করলে অবশ্য পরিস্থিতি একটু জটিল হয়ে যায়। এসব সমস্যার সমাধান করতে হলে তথ্য জানতে হয়, যুক্তি দিতে হয়, দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু কবির ছবিতে কালি মাখানোর জন্য কোনো গবেষণাপত্র লাগে না, কোনো জবাবদিহিও নেই। দুর্নীতির মুখোশ খুলতে যে সাহস দরকার, দেয়ালের মুখে কালি মাখাতে তার প্রয়োজন হয় না। তাই হয়তো তাঁদের দেশপ্রেমের সবচেয়ে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছে শিল্পীর প্রতিকৃতি। সেখানে প্রতিবাদী সাজা যায়, অথচ নিজের কাজের হিসাব দিতে হয় না।
আসল কথা হলো, রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এই বিদ্বেষ রবীন্দ্রনাথের সমস্যা নয়; এটি আমাদের একাংশের আত্মপরিচয়ের সংকট। নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী মানুষ অন্যের অবদানকে ভয় পায় না। বাংলা ভাষা কোনো ধর্মের একক সম্পত্তি নয়, বাঙালিত্ব কোনো একটি পরিচয়ের একচেটিয়া লাইসেন্স নয়। রবীন্দ্রনাথ পড়লে কেউ নিজের ধর্ম হারান না, নজরুল পড়লে কারও পরিচয় বদলে যায় না। সাহিত্য মানুষকে সংকীর্ণ খাঁচা থেকে বের করে বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে পরিচিত করে। সেই দরজা বন্ধ করে যাঁরা নিজেদের সংস্কৃতির পাহারাদার সাজেন, তাঁরা আসলে পাহারা দেন নিজেদের অজ্ঞতাকে।
তাই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি মাখানোর আগে আয়নায় একবার তাকানো দরকার। কবির মুখ মুছে ফেলার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেদের মুখটাই যে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সে খবর কি তাঁরা রাখেন? কালি দিয়ে ছবি ঢাকা যায়, ইতিহাস নয়; দেয়াল নষ্ট করা যায়, ভাষার উত্তরাধিকার নয়। রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি প্রমাণ করতে গিয়ে যদি নিজের বাঙালিত্বের শিকড়ই অস্বীকার করতে হয়, তবে সেই দেশপ্রেমের রোগনির্ণয় জরুরি। কারণ, কবির গায়ে কালি মাখিয়ে কেউ দেশকে বড় করতে পারেন না; বড়জোর নিজের সংকীর্ণতাকে দেয়ালজোড়া করে প্রদর্শন করতে পারেন। আর সেটিকে বীরত্ব বলা হলে, বীরত্ব শব্দটিরও বোধ হয় নতুন করে চিকিৎসা প্রয়োজন।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল অনেকগুলো। রাশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজসহ হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। রাশিয়ার এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিতে বাকি রেখেছে। রাশিয়াকে চরম শিক্ষা দিতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার মানুষ যেন
১ ঘণ্টা আগে
চারদিকে মিথ্যাচার ও প্রতিশোধস্পৃহার যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কেউ কেউ ধর্মীয় হানাহানি উসকে দিচ্ছে, কেউ কেউ ইতিহাস বিকৃত করে দেশের তরুণদের বিভ্রান্ত করছে, কেউ কেউ মবতন্ত্রকে ভবিষ্যৎ উন্নতির পথ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। এই সমস্ত নেতিবাচক ঘটনার জন্মদাতা বি
১ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকী ঘিরে কর্মসূচি; ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে মব সৃষ্টি করে রিকশাচালক, হকার, নারী, সাংবাদিকসহ নানাজনকে হেনস্তা-মারধর; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়ার দাবি তুলে প্রতিপক্ষকে...
১ দিন আগে
দুর্গাপূজাকে আমরা শারদীয় উৎসব নামেও ডেকে থাকি। শরৎকাল বাংলাদেশের এক অপূর্ব ঋতু। যদিও কাগজ-কলমে ছয়-ছয়টি ঋতু, কিন্তু বাস্তবে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত—এরাই টিকে আছে। তবু আরেকটি ঋতু নীরবে এসে দাঁড়ায়। মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখে এই পোড়ার সমাজে, ভঙ্গুর রাষ্ট্রে সর্বদা ক্রন্দনরত দেশে শিউলি ফোটে।
১ দিন আগে