যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এমন পর্যায়ে যে যুদ্ধের আগুন লেগে যাওয়ার জন্য একটি স্ফুলিঙ্গ দরকার মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী অভূতপূর্ব রকম সমরশক্তি জড়ো করেছে। এ ছাড়া ওয়াশিংটনের ‘গানবোট ডিপ্লোমেসির’ ওপর নির্ভরতা যুদ্ধের ঝুঁকি স্পষ্টতই বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের আগুন ইরান তথা গোটা অঞ্চলকে গ্রাস করবে, যার জন্য সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্য চোকাতে হতে পারে।
ইরানে গণবিক্ষোভের ওপর সাম্প্রতিক সরকারি দমনপীড়নের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে অপসারণের সময় এসেছে। এরপর ট্রাম্প সরকার মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন, সহায়ক যুদ্ধবিমান এবং অতিরিক্ত থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করার এই প্রস্তুতির মধ্যে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে পরবর্তী আক্রমণ গত বছরের জুনে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে চালানো হামলার চেয়ে অনেক ভয়াবহ হবে।
মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একটি পছন্দসই চুক্তির জন্য ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে হবে। একই সঙ্গে গুটিয়ে আনতে হবে তার আঞ্চলিক প্রভাববলয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের মনে বরাবরই গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এ ধরনের সর্বোচ্চ মাত্রার দাবি তোলা হলে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিশনের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সেই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে চাপাচাপি করাকে তেহরান বিবেচনা করবে ‘লাল রেখা’ হিসেবে। এটি অতিক্রম না করাই ভালো হবে।
এর মানে অবশ্য এই নয় যে একটি স্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছেই। তবে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাত্রার এই দাবিকে তার শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের সম্ভাব্য হুমকি হিসেবেই ব্যাখ্যা করছে। ট্রাম্প নিজে এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ‘যুদ্ধবাজ’ মনোভাবের নেতারা অনেকবারই তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো নিয়ে কথা বলেছেন। এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি মার্কিন হামলাকে ইরানের জন্য ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবেই দেখা হবে। এ কারণে তারা আর সংযম দেখাতে উৎসাহিত বোধ না-ও করতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব মূলত নির্ভর করবে আক্রমণের ধরন, মাত্রা এবং লক্ষ্যবস্তুর ওপর। ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক অভিযানের পক্ষে। এর মধ্যে সম্ভবত থাকবে ইরানের নেতৃত্বের সক্ষমতা হ্রাস করা। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সামরিক ঘাঁটি, আইআরজিসি নিয়ন্ত্রণাধীন আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ ইউনিট এবং পুলিশ স্টেশনগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করার চেষ্টা থাকবে এর মধ্যে।
সামরিক উপায়ে শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার মার্কিন চেষ্টা নিঃসন্দেহে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এবং আঞ্চলিকভাবে বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনবে। মার্কিন হামলা ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূতকরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি তা আইআরজিসি কর্তৃক দেশের পুরো ক্ষমতা দখল বা এমনকি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকেও নিয়ে যেতে পারে দেশটিকে। গত বছরের মতো আক্রমণ করা হলে জনগণ আবার সেভাবে জাতীয় পতাকা নিয়ে দেশের সমর্থনে পথে নামতে পারে। বিভিন্ন কারণে তারা শাসক পরিবর্তনের তৎপরতাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। প্রথমত, ইরানি জনগণ সিরিয়া এবং লিবিয়ার মতো পরিস্থিতির ভয় পায়, যেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থারই পতন ঘটবে। দ্বিতীয়ত, দেশটিতে পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতে পারে এমন নির্ভরযোগ্য মধ্যপন্থী বিরোধী শক্তি এখনো নেই। তৃতীয়ত, ইরানে জনগণের মধ্যে জোরদার আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি রয়েছে।
ইরানে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী এবং আইআরজিসি বাহিনী সুসংগঠিত এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিশেষ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কাছ থেকে যথেষ্ট সম্পদ পায়। তা ছাড়া, সরকারের প্রতি সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন রয়ে গেছে। বিশেষ করে কর্মজীবী শ্রেণির, যাদের সরকারি মহল অনেক সময় ‘বিপ্লবী’ বলে অভিহিত করে থাকে। ইরানের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা শেষ পর্যন্ত সফল হলে এটি দেশশাসনে উত্তরাধিকারের সংকট তৈরি করতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শূন্যতা সৃষ্টি হতে পারে। আরও গভীর হতে পারে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে। আইআরজিসির হাতে প্রচুর ক্ষমতা সন্নিবেশিত থাকার কারণে একটি সামরিক-প্রাধান্যপুষ্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাড়বে।
ইরানকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য গৃহযুদ্ধ শুরু করার চেষ্টাও চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। গত মাসে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজের মতো কিছু মার্কিন নেতা ও কর্মকর্তা ইরানি বিক্ষোভকারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার আহ্বান পর্যন্ত জানিয়েছিলেন। এর পরের ধাপ হতে পারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও অস্ত্র সরবরাহ করা। তাদের মধ্যে রয়েছে মুজাহেদিন-ই খাল্ক (এমইকে), সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠী পার্টি অব ফ্রি লাইফ অব কুর্দিস্তান (পিজেএকে); তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশের বিচ্ছিন্নতা সমর্থনকারী আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আল-আহওয়াজিয়া; সশস্ত্র গোষ্ঠী জইশ আল-আদল ইত্যাদি।
ওয়াশিংটনের ক্রমাগত উত্তেজনাকর বক্তব্য এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কর্মকাণ্ডের ইতিহাসের মুখে ইরান দৃশ্যত কথিত ‘খ্যাপা লোকের নীতি’ গ্রহণ করেছে: একই সঙ্গে সমঝোতা আর সংঘর্ষের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে তারা। সম্প্রতি সর্বোচ্চ নেতা খামেনির গরম ভাষণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার একটি কাঠামো গড়ে তোলার আগ্রহের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। খামেনি তাঁর ভাষণে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ইরানের ওপর সামরিক আক্রমণ ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ সৃষ্টি করবে। ইরান যে যেকোনো মূল্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেওয়াকে প্রধান অগ্রাধিকার মনে করে, সেটাই বোঝানো হয়েছে এ নীতির মধ্য দিয়ে। এমনকি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিণতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও।
ইরান বলে দিয়েছে, হামলা হলে তারা প্রতিশোধ নেবে। তার মধ্যে তাদের আঞ্চলিক মিত্র বাহিনীগুলোর সহায়তা থাকবে। এটি ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তা অঞ্চলজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক মন্দার সূত্রপাত করবে। তা ছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে ইরান জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা করলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম বাড়বে। জ্বালানির পেছনে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে দেশে দেশে বেড়ে যাবে মুদ্রাস্ফীতির চাপ।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক অভিযান কেবল ইরানের জন্যই নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখিয়েছে এখানে সংঘাত একবার শুরু হলে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অনেক সময় এমন কিছু ঘটে যা আগে থেকে অনুমান করাও যায় না।
(আল জাজিরা অনলাইনে প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)

সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও তর্কাতীত নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের সব সময়ের প্রত্যাশা ছিল। জাতীয় নির্বাচন তো বটেই, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, প্রতিটি নির্বাচনই যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তারা চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তারা যে যার
১ দিন আগে
মাত্র কয়েক মাস আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ যখন ঢাকা নগরের বাড়িভাড়া বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন রাজধানীর অগণিত ভাড়াটের মনে স্বস্তির আশা জেগেছিল। কিন্তু ২০ জানুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ভাড়াটের অধিকার নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বিস্তারিত
১ দিন আগে
নির্বাচন মানে দলের আদর্শ, প্রার্থীর যোগ্যতা-আচরণ এবং দলের বক্তব্যের ফুলঝুরি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে সাধারণ ভোটারদের নিজের পক্ষে নিয়ে আসা। দেশের মানুষ আসলে এরকম নির্বাচনই প্রত্যাশা করে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন মানে সহিংসতা। তবে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি একটা উদাহরণ হয়ে আছে। সে রকম নির্বাচন
১ দিন আগে
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সব রাজনৈতিক দল এখন মাঠে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—কোথাও চলছে সভা, কোথাও কর্মসূচি, কোথাও ডিজিটাল প্রচার। এই নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দল বলে কিছু নেই। ক্ষমতাসীনেরা থাকলে তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলত। বিপরীতে বিরোধীরা বলত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির কথা। এখন
২ দিন আগে