সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও তর্কাতীত নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের সব সময়ের প্রত্যাশা ছিল। জাতীয় নির্বাচন তো বটেই, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনেও জনমানুষের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, প্রতিটি নির্বাচনই যেন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তারা চায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তারা যে যার পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দেবে। তারপর যে বিজয়ী হবেন তাঁকেই জনপ্রতিনিধি মানবে। তিনিই হবেন সাধারণ মানুষের ভরসার স্থল। তবে তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে খুব কম ক্ষেত্রেই। অথচ সব সময়, প্রতিটি নির্বাচনেই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অঙ্গীকার ছিল জনপ্রত্যাশা পূরণের। অর্থাৎ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের। এবারের নির্বাচন কি পারবে জনপ্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যকার এই দূরত্বের ব্যবধান ঘোচাতে?
জনপ্রত্যাশার পাশাপাশি অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যে অঙ্গীকার ছিল, এবারও তা-ই আছে। কিন্তু নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার অসহিষ্ণুতা ততই বেড়ে চলেছে। কোনো কোনো প্রার্থীর আচরণ সাধারণ ভব্যতা পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। সরকারও এমন কিছু বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। যেমন নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের শরীরে বডিক্যাম যুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, দেশের সব সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে (এই ব্যবস্থাটি অবশ্য আগেও রাখা হতো) ইত্যাদি ইত্যাদি। সাধারণ মানুষও ধরেই নিয়েছে যে তাদের প্রত্যাশা যা-ই হোক, বাস্তবতা ব্যতিক্রমী হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আরেকবার তাদের অতীত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
নির্বাচন নিয়ে জনপ্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানের কারণেই বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে ১২টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে তিনটি ছাড়া বাকিগুলো নিয়ে কমবেশি বিতর্ক আছে। ১৯৭৩ সালে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এই বিতর্কের বাইরে ছিল না। অথচ তখন দেশে এমন কোনো বাস্তবতা ছিল না যাতে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে বিন্দুমাত্র সমস্যা হতে পারে। তারপরও কয়েকটি আসনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে দেওয়া হয়নি। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে। ওই নির্বাচনগুলোও যে জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছিল, তা বলার সুযোগ নেই।
এ দেশে সুষ্ঠু ও তর্কাতীত প্রথম নির্বাচন হিসেবে মানুষের মনে স্থায়ী আসন পেতে আছে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনের পরই জাতীয় রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ছিল সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ফলে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারও হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী। মাত্র চার মাসের মাথায়, ওই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচন। কার্যত সেটিই ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে কিছু অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও ভোটের ফলাফল ছিল বিশ্বাসযাগ্য। দেশ-বিদেশে সেই নির্বাচন তর্কাতীত গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছিল।
২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনেকটাই বিতর্কমুক্ত ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচন আর বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। ওই নির্বাচনের ফলাফল দেশি-বিদেশি অনেক মহলের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। ওই নির্বাচনের পরই রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং জনমনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে অবিশ্বাস জন্ম নেয়। এই অবিশ্বাস সম্পূর্ণ অনাস্থায় পরিণত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। একই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও তারা আসন পায় মাত্র ছয়টি। এই নির্বাচনেই রাতের ভোটের অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দল এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এরপর ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও একটি সাজানো নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। একপর্যায়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও ছিল একতরফা। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের নেতারাই নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। যে কারণে অনেকে এটিকে ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন বলে অভিহিত করেন। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ নিজ দলের মধ্য থেকেই একাধিক প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করানোর কৌশল নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।
এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যথারীতি নিরঙ্কুশভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু এবার আর শেষরক্ষা হয়নি। ওই নির্বাচনের ছয় মাসের মধ্যে দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা জুলাই মাসের মাঝামাঝি গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। গঠিত হয় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে জনপরিসরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্যুর শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাঁদের অভিযোগ—অন্তর্বর্তী সরকার দুটি দলের প্রতি পক্ষপাত করছে এবং তাদের ক্ষমতায় আনতে চায়। নাম উল্লেখ না করলেও ওই দুটি দল যে জামায়াত ও এনসিপি—তা দেশবাসী অলরেডি বুঝে নিয়েছে। আবার জামায়াত-এনসিপির পক্ষ থেকেও বিএনপির প্রতি সরকারের ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কখনো কখনো তোলা
হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, একটি নির্দলীয় সরকারের প্রতিও রাজনৈতিক দলগুলো পর্যন্ত কেন এতটা সন্দেহ প্রকাশ করছে? কেন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর সব রাজনৈতিক দল শতভাগ আস্থা রাখতে পারছে না?
এটা কি সরকারের ব্যর্থতা নাকি দেশের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির প্রভাব-সংক্রান্ত ধারণা! নির্বাচনের ময়দানে যখন জমজমাট প্রচার চলছে, তখন মুখরোচক আলোচনার মধ্যে এ কথা শোনা যাচ্ছে যে এবার বিশ্বের একটা প্রভাবশালী রাষ্ট্র নাকি একটি বিশেষ দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায়! রাজনৈতিক অঙ্গনে এই প্রচারটি অনেক আগে থেকে শোনা যাচ্ছে। সেই প্রসঙ্গটি কতটা সত্য আর কতটা মিথ্যা, তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে।
তবে সেই কথাটি নির্বাচনের বাতাসে যে উড়ে বেড়াচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি বিদেশি শক্তি চাইলেই কি কোনো দল ক্ষমতায় চলে আসতে পারে? জনগণের চাওয়া কোনো গুরুত্ব বহন করে না?
অবশ্য পৃথিবীজুড়ে সেই প্রভাবশালী রাষ্ট্রটির আধিপত্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি? বাংলাদেশের
মানুষই শেষ পর্যন্ত তাদের পছন্দসই সরকারকে ভোটের মাধ্যমে জয়ী করবে, তা-ও অস্বীকার করার সুযোগ
নেই। আবার তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বিদেশি হস্তক্ষেপও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এ রকম নির্বাচন হলে জুলাই আন্দোলন যে ব্যর্থ হবে, তা দেশের মানুষ মেনে নাও নিতে পারে।

মাত্র কয়েক মাস আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ যখন ঢাকা নগরের বাড়িভাড়া বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন রাজধানীর অগণিত ভাড়াটের মনে স্বস্তির আশা জেগেছিল। কিন্তু ২০ জানুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ভাড়াটের অধিকার নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বিস্তারিত
৬ ঘণ্টা আগে
নির্বাচন মানে দলের আদর্শ, প্রার্থীর যোগ্যতা-আচরণ এবং দলের বক্তব্যের ফুলঝুরি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে সাধারণ ভোটারদের নিজের পক্ষে নিয়ে আসা। দেশের মানুষ আসলে এরকম নির্বাচনই প্রত্যাশা করে। কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন মানে সহিংসতা। তবে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি একটা উদাহরণ হয়ে আছে। সে রকম নির্বাচন
৬ ঘণ্টা আগে
নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সব রাজনৈতিক দল এখন মাঠে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা—কোথাও চলছে সভা, কোথাও কর্মসূচি, কোথাও ডিজিটাল প্রচার। এই নির্বাচনের মাঠে ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দল বলে কিছু নেই। ক্ষমতাসীনেরা থাকলে তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথা বলত। বিপরীতে বিরোধীরা বলত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির কথা। এখন
১ দিন আগে
১৯৬১ সালের ১৯ মে। সেদিন ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় যে অভূতপূর্ব ও আত্মত্যাগের গাথা রচিত হয়েছিল, আজ তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য এবং চিরস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৫২ সালের ঢাকার রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলনের ঠিক ৯ বছর পর আসামের মাটিতে পুনরায় বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ।
১ দিন আগে