Ajker Patrika

ডিএনসিসির বাড়িভাড়া নির্দেশনা: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

রাইসুল সৌরভ
ডিএনসিসির বাড়িভাড়া নির্দেশনা: মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
ডিএনসিসির ঘোষিত নির্দেশিকা অনুযায়ী বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে উভয়ের স্বার্থহানির শঙ্কা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র কয়েক মাস আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ যখন ঢাকা নগরের বাড়িভাড়া বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল, তখন রাজধানীর অগণিত ভাড়াটের মনে স্বস্তির আশা জেগেছিল। কিন্তু ২০ জানুয়ারি ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ভাড়াটের অধিকার নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রকের পক্ষে বিস্তারিত নির্দেশিকা তুলে ধরার পর এ বিষয়ে নতুন কিছু আইনি প্রশ্ন ও বিড়ম্বনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডিএনসিসি ঘোষিত নির্দেশিকার কয়েকটি বিধান ভাড়াটেদের মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ডিএনসিসির বাড়িভাড়াসংক্রান্ত নির্দেশিকার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও ভাড়াটে নিষ্পেষিত বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। এখন সেটিই বরং আইনগত বৈধতা ও বাস্তবে প্রয়োগযোগ্যতার প্রশ্নে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ষিক বাড়িভাড়া বৃদ্ধি বাড়ি/ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি না হওয়ার বিদ্যমান আইনি বিধান সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে বরং তা বহাল রাখার বিধানে, যা প্রকৃতপক্ষে ভাড়া আকাশচুম্বী করার জন্য এখন একটি বৈধ ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করবে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আইন লঙ্ঘন করে তিন মাস পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্তি।

তা ছাড়া, ডিএনসিসি বাড়িভাড়াসংক্রান্ত যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার অধিকাংশই বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটে উভয়েরই স্বার্থবিরোধী, দায়সারা, অগোছালো, অযৌক্তিক, অস্পষ্ট ও বেআইনি। মূলত দেশে ১৯৯১ সাল থেকে প্রচলিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের পুনরাবৃত্তি। এ ধরনের আইন, বিধি বা নির্দেশিকা প্রণয়নের সময় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হয়। ডিএনসিসির এই নির্দেশিকা বিভিন্ন বিষয়ে ভাড়াটেদের সঙ্গে আলোচনার ওপর জোরারোপ করলেও নির্দেশিকা প্রস্তুত করার আগে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ নিজে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে ও মতামত নিয়েছে বলে মনে হয়নি। নিলেও সেসব সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত না করে নিজেদের মনমতো একটি অপরিকল্পিত নির্দেশিকা জারি করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

৫ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া প্রদান করবেন। অথচ ১৯৯১ সালের আইনানুসারে চুক্তির অবর্তমানে বাড়িভাড়া মাসের পরবর্তী মাসের ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলা আছে। ফলে ভাড়াটেদের আইনি অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

আবার ৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ভাড়া বাড়ানোর সময় হবে জুন-জুলাই। কোনো ভাড়াটে নিশ্চয় জুন-জুলাই মাসের জন্য অপেক্ষা করে বাড়ি ভাড়া নেবেন না। সে ক্ষেত্রে বছরের অন্য সময় কেউ ভাড়া নিলে দুই বছর মেয়াদান্তে জুন-জুলাই না হলে বাড়ির মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবেন না, যা মোটেও যৌক্তিক কোনো নির্দেশনা নয় এবং বাড়ির মালিকের স্বার্থ পরিপন্থী।

অপর দিকে, নির্দেশিকার ৯ দফায় বলা হয়েছে, কেবল নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ করা যাবে। কিন্তু আইনের ১৮ ধারায় আরও কিছু ক্ষেত্র সংযুক্ত করে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারবেন এবং পারবেন না। ফলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটে উভয়ের স্বার্থহানির শঙ্কা রয়েছে।

তা ছাড়া, ১৩ দফা আইনের বাইরে গিয়ে নির্ধারণ করে দিয়েছে যে বাড়িওয়ালা চাইলে এক থেকে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া নিতে পারবেন। যদিও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনানুসারে সর্বোচ্চ এক মাসের ভাড়া অগ্রিম হিসেবে নেওয়ার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ১৫ দফায় উল্লেখ রয়েছে যে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে না পারলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। কিন্তু কত সময়ের মধ্যে এবং কী পদ্ধতিতে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া সমিতি বিরোধ নিষ্পত্তি করবে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা নেই। আবার আইনানুযায়ী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা নেই।

রাজধানীকেন্দ্রিক বাসা-বাড়ির ব্যাপক চাহিদা, জমির অপ্রাপ্যতা ও আকাশচুম্বী দাম, নির্মাণসামগ্রীর অস্থিতিশীল উচ্চমূল্য এবং অস্বাভাবিক নির্মাণ খরচের কারণে ঢাকায় ভাড়াটে হিসেবে বসবাস ও জীবনযাপন এমনিতেই ভীষণ ব্যয়বহুল। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ তাই ব্যয় হয় আবাসস্থলের মতো মৌলিক চাহিদার পেছনে। আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে সময়মতো বিল পরিশোধ করেও চাহিদামতো বা নিরবচ্ছিন্ন অপরিহার্য নাগরিক সুবিধা, যথা পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি না পাওয়া।

অপরদিকে, ন্যায়সংগত অধিকার না পেলে ভুক্তভোগী যে আইনের আশ্রয় নেবেন, তাতেও রয়েছে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা। আমাদের প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় বাড়িভাড়ার মতো দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমায় বিরোধ নিষ্পত্তি হতে প্রচুর সময় লাগে এবং বিচারপ্রার্থীকে অপরিসীম খরচ ও ভোগান্তি পোহাতে হয়। তাই ভুক্তভোগী সাধারণত এই বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন না।

১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের মূল সমস্যাই হলো বাজারমূল্য নির্ধারণের কোনো সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি না থাকা। ঢাকার স্থাবর সম্পত্তির (রিয়েল এস্টেট) বাজার অত্যন্ত অনিয়ন্ত্রিত এবং অস্বচ্ছ। একই ধরনের দুটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এলাকা, উপকরণ, সুবিধা, প্রতিষ্ঠানভেদে আকাশ-পাতাল হতে পারে। তবে বাৎসরিক বাড়িভাড়া বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে ৭০ লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাটের ১৫ শতাংশ হারে মাসিক ভাড়া ৮৭ হাজার টাকার বেশি হবে, যা এক হিসাবে বর্তমান ভাড়ার প্রায় পাঁচ গুণ! ফলে আইনের এই উদ্ভট বিধান ভাড়াটেদের স্বার্থরক্ষার বদলে বাড়ির মালিকদের জন্য ভাড়া বাড়ানোর আইনি হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং আইনের অপব্যবহারের দরজা খুলে দেবে।

বাংলাদেশের এই দুরবস্থার বিপরীতে আয়ারল্যান্ডের বাড়িভাড়াসংক্রান্ত আইনে চোখ বুলালে মালিক ও ভাড়াটে উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণে অধিকতর সুষম ও কার্যকর কাঠামো রয়েছে বলে প্রতীয়মান হবে। যেমন আয়ারল্যান্ডে এখন চরম আবাসন সংকট চলছে। ফলে বাড়িভাড়া আগের তুলনায় অধিক এবং বাড়িভাড়া পাওয়াও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। তথাপি বাড়িভাড়া বৃদ্ধি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বর্তমান ভাড়ার একটি সর্বোচ্চ বার্ষিক শতাংশের (বর্তমানে সাধারণত ২ শতাংশ) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যা একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও ভাড়াটেবান্ধব ব্যবস্থা। মালিক ভাড়া বৃদ্ধি করতে চাইলে অবশ্যই বাজারমূল্যের তুলনায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ভাড়াটেকে নির্ধারিত ফরমে কমপক্ষে ৯০ দিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে। উচ্ছেদ করতে চাইলেও ভাড়ার ধরন ও ব্যাপ্তি অনুসারে পৃথক পৃথক সময়সীমা নির্ধারণ করা আছে। সাধারণত চুক্তির শর্ত না ভাঙলে, সম্পত্তির সংস্কার বা পরিবারের কারও জন্য প্রয়োজন না হলে ভাড়াটে উচ্ছেদ করা যায় না। সেখানে এ-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তিশালী একটি স্বাধীন রেসিডেনশিয়াল টেনান্সিজ বোর্ড রয়েছে। আবার বোর্ডে কেউ মামলা করে হারলে তাকে জয়ী পক্ষের মামলার সমস্ত খরচ বহন করতে হবে।

আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বাড়িভাড়াবিষয়ক এই মডেল থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

সরকারের তাই এখন উচিত হবে বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের পরিবর্তে, স্থানীয় বাজারমূল্য, ভবনের মান, প্রদত্ত সুবিধা, এলাকা, প্রদত্ত নাগরিক সেবার মান, বসবাস উপযোগিতা এবং ভাড়াটের আয়ের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি চালু করা; অবিলম্বে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার, আইনের অধীনে সত্বর বিধিমালা প্রণয়ন এবং প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় ভাড়া নিয়ন্ত্রক পদ সৃষ্টি ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ করা; বাড়িভাড়া বিরোধ নিষ্পত্তিতে ওয়ার্ডভিত্তিক পৃথক প্রতিষ্ঠান তৈরি; আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ এক মাসের অগ্রিম ভাড়া ও অন্যান্য বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নজরদারি করা ইত্যাদি।

ঢাকার ভাড়াটে জনগোষ্ঠী হলো এখানকার অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, বঞ্চনা ও শোষণের শিকার। একটি কার্যকর ও ন্যায়সংগত ভাড়া নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো; যেন উভয় পক্ষের অধিকার সুনির্দিষ্ট এবং একটি

দ্রুত প্রতিকার প্রক্রিয়া সবার নাগালের মধ্যে থাকে। সরকার এবং নগর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই একটি কল্পনাপ্রসূত নীতিমালা নয়, বরং দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। নতুবা এই নির্দেশিকা বরাবরের মতোই কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর বাড়ির মালিক ও ভাড়াটেরা বহন করবেন তার বিপরীতমুখী ফল। তাই সময় এসেছে ঢাকাসহ সারা দেশের আবাসন বাজারের জন্য একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও মানবিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তবে কি এপস্টেইনই ছিলেন বিটকয়েনের রহস্যময় স্রষ্টা ‘সাতোশি’

চীনের হোটেলে গোপন ক্যামেরার বাণিজ্য, পর্নো সাইটে নিজেকে আবিষ্কার করছেন দর্শকেরা

মাশরাফিকে রাজশাহীতে নাগরিক সংবর্ধনা

বিএনপি ইশতেহারে গণভোট ও সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে: এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া কমিটির প্রধান

কুমিল্লা-৪: জসিমের পাশে বিএনপি, চাপে হাসনাত

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত