Ajker Patrika

প্রচলিত যুদ্ধের নিয়মে খেলছে না হুতিরা

চিররঞ্জন সরকার
প্রচলিত যুদ্ধের নিয়মে খেলছে না হুতিরা
যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্র দেশ ইয়েমেন হুতিদের ঘাঁটি। ছবি: এএফপি

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যার যেন কোনো শেষ নেই। রাজনীতির মঞ্চে কত বাদ্যবাজনা, কত ঘোষণা, কত প্রতিশ্রুতি, কত পালাবদল; অথচ কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতার দেখা নেই। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, বাজারে স্বস্তি নেই; নিত্যপণ্যের দাম কমারও কোনো দৃশ্যমান সম্ভাবনা নেই। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই, চাঁদাবাজি-দখলদারত্ব-মবতন্ত্রের দৌরাত্ম্যও থামছে না। ফলে নাগরিকের জীবন এখন এক দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, যেন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রশ্নটিই হচ্ছে, আজ আর কী ঘটে! এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার অভিঘাত। পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলেই তার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে আমাদের রান্নাঘরে। ইরান ও ইউক্রেন সংকটের সমাধান-সূত্র না মিলতেই ইয়েমেনের হুতিদের ঘিরে নতুন উত্তেজনা সেই বৈশ্বিক অস্থিরতার পরিধি আরও বাড়িয়েছে।

হ্যাঁ, ছোট্ট এক সশস্ত্র গোষ্ঠী, অথচ আজ গোটা বিশ্বের মাথাব্যথার কারণ। নাম হুতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দরিদ্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেন তাদের ঘাঁটি। উত্থানের গল্প যেন রূপকথার মতো। পরনে লুঙ্গি, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র, অথচ বিশ্বের কাছে এক আতঙ্কের নাম হুতি।

ইয়েমেন কোথায়, জিজ্ঞেস করলে অনেকের চোখে মানচিত্র আসে না। আসে যুদ্ধের ছবি। তারপর মনে পড়ে, আরবের একটি দেশ। কিন্তু সমুদ্রের মানচিত্রে সেই ইয়েমেনের পাশে এমন এক দরজা আছে, যার চাবি নিয়ে বড় রাষ্ট্রগুলোরও মাথাব্যথা। দরজাটির নাম বাব আল-মান্দেব। আসলে এটি এমন জলপথ, যেখানে ড্রোন উড়লেই ইউরোপের বন্দরে জাহাজের রুট বদলায়, বিমা কোম্পানি অঙ্ক কষে, জ্বালানি খরচ বাড়ে এবং ঢাকার বাজারে ভূরাজনীতি এসে বলে, ‘এই যে ভাই, আমাকে চিনতে পারছেন?’

এই জলদরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে হুতিরা। তাদের নাম আনসার আল্লাহ, অর্থাৎ ‘আল্লাহর সমর্থক’। বাস্তবে তাদের জন্ম উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ আন্দোলন থেকে। নব্বইয়ের দশকে জায়দিদের ওপর বৈষম্যের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা আন্দোলনটির ভিত তৈরি করে। হুসাইন বিন বদরুদ্দীন হুতি ছিলেন অন্যতম নেতা। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে হুসেইন নিহত হওয়ার পর আন্দোলনটি হুতি নামে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।

পরে নেতৃত্ব নেন হুসেইনের ভাই আবদুলমালিক আল-হুতি। তাঁর নেতৃত্বে পাহাড়ি এলাকার একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একাধিক যুদ্ধ হয়। ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়ায় তারা। আরব বসন্তের সময় ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতা ছাড়ার আন্দোলনে হুতিরা অংশ নেয়। কিন্তু রাজনীতির রাস্তা এখানে সরল ছিল না। পরে তারাই সালেহর সঙ্গে জোট গড়ে। সেই জোটও টেকেনি। ২০১৭ সালে সালেহ হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি-সমর্থিত পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলে হুতিদের হাতেই নিহত হন।

হুতিদের বড় উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। জ্বালানি ভর্তুকি কমানো ও মূল্যবৃদ্ধির ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা শক্তি বাড়ায় এবং রাজধানী সানা দখল করে। প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি পরে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। এরপর ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট হুতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল তাদের পেছনে সরিয়ে দেওয়া। যুদ্ধের ইতিহাসে ‘দ্রুত সমাধান’ কথাটি যতবার বলা হয়েছে, ইতিহাস সম্ভবত ততবার আড়ালে হেসেছে। ইয়েমেনেও তাই হলো। যুদ্ধ দীর্ঘ হলো, মানবিক বিপর্যয় বাড়ল, আর হুতিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল।

উত্তর ইয়েমেনের জায়দি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ এবং সৌদি প্রভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তাদের উত্থানের মাটি তৈরি করেছিল। পরে সেই স্থানীয় ক্ষোভের সঙ্গে ভূরাজনীতি মিশেছে। তবে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ইরান হুতিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক প্রযুক্তি দিয়েছে। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পাওয়ার কথাও সূত্রে এসেছে। ফলে হুতিদের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, রাডার, গোয়েন্দা প্রযুক্তি এবং সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা বেড়েছে। স্থানীয় বিদ্রোহী আন্দোলন তখন আর শুধু স্থানীয় থাকল না। পাহাড় থেকে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তারা বিশ্ববাণিজ্যকে অস্বস্তিতে ফেলার জায়গা পেল।

বাব আল-মান্দেব সেই জায়গা। লোহিত সাগর থেকে এডেন উপসাগরে যাওয়ার এই প্রণালি সুয়েজ খালের সঙ্গে যুক্ত। এশিয়া ও ইউরোপের বিপুল বাণিজ্য এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। জাহাজ যদি বাব আল-মান্দেব এড়িয়ে চলে, তাহলে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যেতে হয়। বাড়ে জ্বালানি, সময় ও বিমার খরচ। অর্থাৎ হুতিদের খুব বেশি জাহাজ ডুবাতে হয় না। ক্যাপ্টেনকে চিন্তায় ফেললেই চলে। ‘এই পথ দিয়ে যাব?’ ক্যাপ্টেন যদি বলেন, ‘না বাবা, অন্য পথেই যাই’, তাহলেই একটি ড্রোনের অর্থনৈতিক সাফল্য হয়ে গেল।

২০২৩ সালের শেষ দিকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ লক্ষ্য করে গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের রাজনীতি একসময় জাহাজের ভাড়া, বিমার প্রিমিয়াম ও পণ্যদ্রব্যের দাম হয়ে সামনে হাজির হয়। অনেক জাহাজকে তখন লোহিতসাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ফলে বাণিজ্যের সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি সময় ও খরচ যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও এই গল্প দূরের নয়। আমরা সমুদ্রপথনির্ভর একটি বাণিজ্যিক অর্থনীতি। তৈরি পোশাকের কাঁচামাল, জ্বালানি, শিল্পযন্ত্র, ভোগ্যপণ্য এবং ইউরোপমুখী রপ্তানির সঙ্গে বৈশ্বিক শিপিং যুক্ত। সমুদ্রপথ দীর্ঘ হলে খরচ বাড়ে। আর হিসাবের শেষ লাইনে সেই টাকা কোথায় যায়, তা আমরা সবাই জানি। ভোক্তার পকেটে। তাই ইয়েমেনের পাহাড়ে হুতিদের ড্রোন উড়লে ঢাকায় শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি শোনা যায় জ্বালানির দামে, আমদানি ব্যয়ে, কনটেইনার ভাড়ায় এবং বাজারের সেই চিরন্তন প্রশ্নে: ‘ভাই, জিনিসটা এত দামি কেন?’

হুতিদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, তারা প্রচলিত যুদ্ধের নিয়মে খেলছে না। বিশ্বের বড় সামরিক শক্তির সঙ্গে সমান অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি যুদ্ধ করার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু যুদ্ধের জন্য সব সময় বড় সেনাবাহিনী লাগে না। কখনো লাগে সঠিক জায়গা, সস্তা অস্ত্র আর প্রতিপক্ষের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। একটি কম খরচের ড্রোন ঠেকাতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। একজন কম দামে আক্রমণ করবে, অন্যজন বেশি দামে প্রতিরোধ করবে। যুদ্ধের হিসাবরক্ষক তখন ভাববেন, ‘এখানে লাভটা কার?’

হুতিদের শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়, ভূগোলেও। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের লড়াই তাদের যোদ্ধাদের অভিজ্ঞ করেছে। উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জনবহুল এলাকার বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। রাজধানী সানাও তাদের হাতে। তবে পুরো ইয়েমেন তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং অন্যান্য সশস্ত্র শক্তিও দেশের এলাকায় সক্রিয়। অর্থাৎ মানচিত্রে একটি ইয়েমেন, বাস্তবে বহু ইয়েমেন। এই বিভক্ত বাস্তবতাই হুতিদের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি দেশটির জন্য অস্থিরতার কারণ।

২০২৪ ও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবও বহু বছর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু সামরিক শক্তি দিয়ে তাদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। বরং হুতিরা নিজেদের সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশ এবং ইসরায়েলের জন্য নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গাজা যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করে তারা নিজেদের আঞ্চলিক পরিচয়ও আরও জোরালো করেছে।

শেষ পর্যন্ত হুতিদের গল্প শুধু ইয়েমেনের গল্প নয়। এটি দেখায়, একটি দরিদ্র দেশের পাহাড়ি প্রান্তের সশস্ত্র গোষ্ঠী কীভাবে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা বিশ্বশক্তিকে হারাতে পারবে না। কিন্তু বিশ্বশক্তিকে খরচ করাতে পারে। তারা শুধু সমুদ্রের মালিক নয়, কিন্তু সমুদ্রপথ নিয়ে সবাইকে ভাবাতে পারে। ভূরাজনীতিতে অনেক সময় রাজা হওয়ার দরকার হয় না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাহারাদার হলেই চলে।

বাব আল-মান্দেব সেই দরজা। হুতিরা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো তাই যুদ্ধের ভাষায় যতই কথা বলুক, প্রশ্ন করতে হচ্ছে: দরজাটা কে পাহারা দিচ্ছে?

ইয়েমেনের উত্তরটি খুব ছোট। হুতিরা। আর সেই উত্তরের খরচটা পৃথিবীজুড়ে অনেক বড়।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত