Ajker Patrika

ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত গ্রামীণ জীবন

  • দিনে ১২-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ।
  • জনজীবন অতিষ্ঠ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য।
  • উৎপাদন চাহিদার অনেক কম হওয়াতেই সংকট।
  • গ্যাস-সংকটসহ নানা কারণে উৎপাদনে সমস্যা।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত গ্রামীণ জীবন
প্রতীকী ছবি

সাধারণত শহরের তুলনায় বরাবরই গ্রামে লোডশেডিং বেশি হয়। গরমের তীব্রতা আবার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষকে এখন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকা সইতে হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা শহরের বাসিন্দারাও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে রয়েছে। গত সোমবার এবং গতকাল মঙ্গলবার দেশের অন্তত ২০টি জেলায় খবর নিয়ে এমন পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।

সরকারি হিসাবেই সারা দেশে গড়ে চাহিদার ২০-২৫ শতাংশ বিদ্যুৎ স্বল্পতা রয়েছে। সোমবার ১৬ হাজার ৩৩৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ১৩ হাজার ২৫৮ মেগাওয়াট। একই দিন বেলা ১টায় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৫৫০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দিনের ওই সময়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। সারা দেশের অনেক জেলা থেকে সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন স্তরের নাগরিকেরা লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানাচ্ছেন।

বিদ্যুতের এই পরিস্থিতির মধ্যেও সম্প্রতি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, লোডশেডিং নেই। তবে গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুতের সরবরাহ

লাইনগুলো অনেক লম্বা হওয়ায় মাঝেমধ্যে বিকল হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অন্যান্য কারিগরি ত্রুটির কারণেও মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকা কামারখন্দ ও সদর উপজেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো রয়েছে। তবে পাশের উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাচ্ছে সেখানকার বাসিন্দারা। দিনে-রাতে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যায়। কোনো কোনো এলাকায় একবার বিদ্যুৎ গেলে এক ঘণ্টায়ও ফেরে না। চৌহালী উপজেলার এক ব্যক্তি বলেন, গত রোববার রাত-দিন মিলিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

জেলায় জেলায় ভোগান্তি

রাজশাহী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, বাগেরহাট, নাটোর, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, ভোলা, চাঁদপুর, ফরিদপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, পটুয়াখালী, বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দিনে ১০-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করেছেন অধিবাসীরা। বিদ্যুতের অভাবে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধসহ সবাই কষ্ট পাচ্ছে। কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং হাসপাতালের সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সোমবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়ে ৪ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং ছিল সিলেটে।

সোমবার নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সদর দপ্তরের চাহিদা ৫০ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছিল ২৭ মেগাওয়াট। এ সমিতির আওতায় থাকা বাঘা উপজেলার বাজুবাথান গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক শাহজাহান আলী সরকার জানান, তাঁর এলাকায় মোটামুটি প্রতি এক ঘণ্টা থাকার পর আবার দুই ঘণ্টার জন্য লাপাত্তা হয় বিদ্যুৎ।

নাটোরের লক্ষ্মীকোল বাজারের এক ওয়ার্কশপের মালিক আল আমিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকার কারণে কাজ করা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে ওয়ার্কশপ বন্ধ করে দিতে হবে।’

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বড়ালী গ্রামের মনিরুল হক ও আবু জাফর বলেন, গত রবিবার তাদের এলাকায় ১৫ বার লোডশেডিং হয়েছে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা-কর্ণফুলী এলাকায় গত কয়েক দিনে গড়ে ৭-৮ ঘণ্টার বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ফটিকছড়ি পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, এর আওতায় প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ৫০০ গ্রাহকের প্রয়োজন ৪৫ মেগাওয়াটের জায়গায় সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩২-৩৭ মেগাওয়াট।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে রোববার রাত ১০টা থেকে সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ১৯ ঘণ্টায় ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হয়। তবে জেলার গ্রামাঞ্চলে ১৪-১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পটুয়াখালী শহরের পাশাপাশি কলাপাড়া, গলাচিপা, বাউফল, দশমিনা, মির্জাগঞ্জ, দুমকী ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা লোডশেডিং নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। কুয়াকাটা পৌর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ পারভেজ সাগর বলেন, ‘বিদ্যুৎ একবার গেলে ২-৩ ঘণ্টায়ও আসে না।’ রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমন্তাজ ইউনিয়নের বাসিন্দা আইয়ুব খান বলেন, ‘দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। রাতে বিদ্যুৎ মোটেও থাকে না।

ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ মাদারীপুরবাসীও। দিনরাত মিলিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বিদ্যুৎ বিভাগ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের ১৭ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১১ মেগাওয়াট।

অপর দিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের ১০৬ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট।

মাদারীপুর শহরের পুরানবাজার এলাকার ‘গোল্ডেন সাইন প্রিন্ট’ প্রতিষ্ঠানের মালিক সোহাগ হাসান বলেন, ‘প্রায়ই বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা প্রায় কোনো কাজই করতে পারছি না।’

শহরের আমিরাবাদ এলাকার গৃহবধূ লামইয়া বেগম বলেন, ‘সারা দিন গরমের মধ্যে রান্নাসহ ঘরের কাজকর্ম করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পরিবারের ছোট শিশু আর বয়স্কদের কষ্ট বেশি হচ্ছে।’

এলাকায় যে পরিমাণ লোডশেডিং

ফকিরহাট পল্লী বিদ্যুতের জোনাল কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আনন্দ কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘ফকিরহাট উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ২২ মেগাওয়াট। আমরা পাই ১০ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং এক ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছি।’

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম আব্দুল ফাত্তাহ বলেন, রাতে ১৫-১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৭-৮ মেগাওয়াট।

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মাহাবুবুর রশিদ জানান, বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৫০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ২৭ মেগাওয়াট। এর ফলে এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা আবাসিক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) আজিজুল ইসলাম আজাদ সোমবার বলেন, আগের ২৪ ঘণ্টায় এ উপজেলায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল প্রায় ১০ মেগাওয়াট। কিন্তু পাওয়া গেছে ৪-৫ মেগাওয়াট।

জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কালাই জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলী মো. জোবায়ের আলী বসুনীয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, কালাই উপজেলায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তার প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২-৩ ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে।

পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আবুল কাশেম বলেন, বর্তমানে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে।

মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার অসিত সাহা বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমাদের কিছুই করার নেই।’

তিন জেলায় বিক্ষোভ

লোডশেডিং বন্ধ করে জনজীবনে স্বস্তি দেওয়ার দাবিতে গতকাল বরিশাল নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ। অশ্বিনী কুমার হলচত্বরে এ মিছিল-পরবর্তী এক বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাসদ জেলা সমন্বয়ক ডা. মনিষা চক্রবর্ত্তী।

গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ মিছিলের পর নীলফামারী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বিদ্যুৎ মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়। স্মারকলিপিতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ডিমান্ড চার্জ বাতিল, মিটার ভাড়া বন্ধ, ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত স্বল্প রেট এবং ভ্যাটের রেট কমানোর দাবি জানানো হয়।

রোববার রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সিলেটের টুকের বাজার ও খাদিমপাড়া এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।

শীর্ষ কর্তৃপক্ষ যা বলছে

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে সোমবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও আশানুরূপ উৎপাদন হচ্ছে না। ভারতের আদানি পাওয়ার ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা। কিন্তু অতি বৃষ্টির কারণে তাদের মজুত কয়লা ভিজে যাওয়ার কারণে উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আরএনপিসিএলের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা নামাতে বিলম্ব হওয়ার কারণে সেখানে একটা বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। এসব কারণে আমরা উৎপাদন বাড়াতে পারছি না।’

চেয়ারম্যান সোমবার আশা প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে পরিস্থিতির আরেকটু উন্নতি হবে। বর্তমানে বিদ্যুতের জন্য ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও তা বাড়িয়ে ৯০০ মিলিয়ন করা হচ্ছে। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও পুরোপুরি চালু হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও ঠিক হয়ে যাচ্ছে। ফলে দুই দিন পর সমস্যা থাকবে না।

দেশে গরমের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠতে পারে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে ১৬ হাজারের কিছু বেশির চাহিদাই পূরণ করতে পারেনি কেন্দ্রগুলো।

নতুন জ্বালানিসচিব জিয়াউল হক সোমবার আজকের পত্রিকাকে জানান, তিনি নতুন দায়িত্বে আসার পর সবকিছু বুঝতে কিছুটা সময় নিচ্ছেন। আগামী কয়েক দিন পর সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলবেন।

{প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার প্রতিনিধিরা}

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত