Ajker Patrika

এত বাড়ানোর পরও বাড়তি ভাড়া বাসে

প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২১, ০৮: ৪৯
এত বাড়ানোর পরও বাড়তি ভাড়া বাসে

তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গণপরিবহনের মালিকদের তিন দিনের অঘোষিত ধর্মঘট শেষ হয়েছে ভাড়া বাড়ানোর মধ্য দিয়ে। গত রোববার রাতে বর্ধিত ভাড়ার প্রজ্ঞাপন জারির পর গতকাল সোমবার থেকে গণপরিবহন চলাচল শুরু হলেও যাত্রীদের ভোগান্তি কমেনি, উল্টো বেড়েছে।

মালিক-শ্রমিকদের চাপে সরকার হুট করে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে যাত্রীদের মধ্যে। গতকাল দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন রুটের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে বর্ধিত ভাড়ার চেয়েও বেশি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনের শ্রমিকদের বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে।

সুযোগ বুঝে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সিএনজিচালিত বাস-অটোরিকশা এমনকি সাধারণ রিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনেও। অথচ বর্ধিত ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছিল।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বর্ধিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে সরকার। কিন্তু মাঠে মন্ত্রীর কথার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সিএনজিচালিত যানবাহন যেন বেশি ভাড়া নিতে না পারে সে ব্যাপারে যাত্রীদেরই সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চেয়ারম্যান। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।

এমন প্রেক্ষাপটে সংবাদ সম্মেলনে বর্ধিত ভাড়া বাতিল করে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

জ্বালানি তেলের দাম ও গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। আগামীকাল বুধবার রাজধানী বাদে দেশের সব মহানগর এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। ১২ নভেম্বর তারা বিক্ষোভ সমাবেশ করবে জেলা শহরগুলোতে। একই কারণে আগামী ১৮ নভেম্বর ঢাকায় আধা বেলা হরতাল ডেকেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)। 

বাসে বাসে ভোগান্তি: সরেজমিন চিত্র
রোববার রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ধরা হয়েছে ৮-১০ টাকা। কিন্তু গতকাল বেশির ভাগ গণপরিবহনে সর্বনিম্ন ভাড়া আদায় করা হয়েছে ১৫ টাকা করে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় রজনীগন্ধা পরিবহনের বাসে ওঠার সময় গেটে দাঁড়িয়ে হেলপার যাত্রীদের জানাচ্ছিলেন, ‘যেইহানেই নামেন, সর্বনিম্ন ভাড়া পনেরো টাকা।’

বসিলা থেকে দুই সন্তানকে সায়েন্স ল্যাবের স্কুলে দিতে এসেছেন শাহনাজ বাবলী নামে এক অভিভাবক। তিনি জানান, আগে সন্তানদের হাফ এবং নিজের ফুল ভাড়া মিলিয়ে ২৫ টাকা দিতেন। এখন তাঁকে দিতে হয়েছে ৩৫ টাকা। ক্ষুব্ধ এই অভিভাবক বলেন, বাড়ার কথা দুই টাকা কিন্তু এরা বাড়িয়েছে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা। ওই বাসেই স্টুডেন্ট ভাড়া নিয়ে এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে হেলপারকে তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা করতে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে যান ওই ছাত্রী। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাসটির চালক শাহীন আহমেদ বলেন, প্রতিটি চেকপোস্টে ৫ টাকা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তাই বেশি নিচ্ছেন। এ ব্যাপারে বেশি কিছু জানতে চাইলে বাসমালিকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে প্রতিদিন মতিঝিলে যাতায়াত করেন সাদ্দাম হোসেন। দুই দিন আগেই এই রুটের ভাড়া ছিল ২০ টাকা। কিন্তু গতকাল তাঁকে ভাড়া দিতে হয়েছে ২৫ টাকা। এই যাত্রী বলেন, যে বাসে উঠেছিলাম, সেটি সিটিং সার্ভিস না। তারপরও বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী মিডলাইন, স্বাধীন, তরঙ্গ, বিহঙ্গ, শিকড়, প্রজাপতিসহ বেশির ভাগ গণপরিবহনেই এভাবে ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভাড়া নিয়ে বিপত্তির তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকা থেকেও।

বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ স্বীকার করে দিশারী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহারাজ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গুটিকয় পরিবহন শ্রমিক ও মালিক ৫০ শতাংশ ভাড়া বেশি নিচ্ছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। কয়েকটি রুটে এমন কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরে শাস্তিও দিয়েছি। প্রথম দিনে কিছু নৈরাজ্য হলেও এই পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে।’ তিনি জানান, সিএনজিচালিত বাস বেশি ভাড়া নিলে তাদের রুট পারমিট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিএনজিচালিত বাসে বেশি ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানতে চাইলে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেছেন, যাত্রীরা যখন ভাড়া দেবেন, তখন দেখে নেবেন যানবাহনটি সিএনজি নাকি ডিজেলচালিত। যাত্রীরা কীভাবে তা দেখবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, সিএনজির সিলিন্ডার তো গাড়িতেই থাকে। যাত্রীরা একটু কষ্ট করে দেখে নিয়ে ভাড়া দিলেই হয়। 

ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণের দাবি
বাসমালিকদের অধিক লাভের সুযোগ করে দিতে তাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সরকার একচেটিয়াভাবে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ মন্তব্য করে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সব মহলের সঙ্গে আলোচনা করে সহনীয় মাত্রায় ভাড়া বাড়ানোর কথা বলেছিল সরকার। কিন্তু সেই আশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেনি। বাস ও লঞ্চমালিকদের ফাঁদে পা দিয়ে সরকার যাত্রী প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ১ টাকা ৪২ পয়সার ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। কিন্তু এটি বড়জোর ১ টাকা ৬০ পয়সা হতে পারত। 

রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এই পকেটমার সরকার পরপর আবার দুইবার জনগণের পকেট মারল। একবার পকেট কাটছে ডিজেল, এলপিজির দাম বাড়িয়ে দিয়ে। দ্বিতীয়বার পকেট কাটল বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়ে। এটা পাতানো খেলা।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সরকার অযৌক্তিকভাবে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা দাবি করেছিলাম তেলের দাম কমাতে। কিন্তু সরকার তেলের দাম না কমিয়ে উল্টো সড়ক ও নৌপথের ভাড়া বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিয়েছে।’

প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত সমাবেশে কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এ সামাদ বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে দেশের মানুষ এমনিতেই দিশেহারা, নিত্যপণ্যের দাম জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। সরকার জনগণের দায়িত্ব নিচ্ছে না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে ডিজেল, কেরোসিন তেল, এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে।’

গণপরিবহনের বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল পল্টন মোড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।

সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে তারা জ্বালানি মন্ত্রণালয় ঘেরাও করতে গেলে সচিবালয়ের পূর্ব গেটে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি হলে তাঁরা সচিবালয়ের সামনের রাস্তা অবরোধ করে আবারও সমাবেশ করেন।

বিকেলে প্রেসক্লাবের সামনে গণ অধিকার পরিষদের বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনটির সদস্যসচিব নুরুল হক নুর বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রতিবাদে জনগণ যখন রাস্তায় নামবে তখন সরকার নাটকীয়ভাবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়েছে। দ্রুত তেল-গ্যাসের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় না আনলে ধারাবাহিক কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তারেক রহমান ও মির্জা ফখরুলের খ্রিষ্টীয় নববর্ষের বাণী প্রত্যাহার করেছে বিএনপি

এনইআইআর চালু করায় বিটিআরসি ভবনে মোবাইল ব্যবসায়ীদের হামলা-ভাঙচুর

‘আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াতে আসেন, দায়দায়িত্ব আমাদের’

কাজী নজরুলের ‘বিদায় বেলায়’ কবিতায় দাদিকে স্মরণ জাইমা রহমানের

ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভের মুখে মোবাইল ফোনের শুল্ক ও কর কমাল সরকার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত