Ajker Patrika

দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করার আবেদন করেই প্রার্থী ২৩

� দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়া প্রার্থীদের বেশির ভাগ যুক্তরাজ্যের, ১৫ জন।

� সর্বোচ্চ ১০ জন বিএনপির প্রার্থী, জামায়াতের আছেন চারজন।

মো. হুমায়ূন কবীর ও তানিম আহমেদ, ঢাকা
দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগ করার আবেদন করেই প্রার্থী ২৩
ফাইল ছবি

দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন করেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ২৩ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে ১৫ জনই যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছাড়া। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন, কানাডার দুজন এবং তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া ও ফিনল্যান্ড থেকে একজন করে নাগরিকত্ব ছেড়ে প্রার্থী হয়েছেন।

১৮ জানুয়ারি আপিল শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এসব প্রার্থীকে ভোটের মাঠে লড়াইয়ের সুযোগ করে দেয়। ইসির শুনানি শেষে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা তিনজন ভোটের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ছেড়ে ভোটের মাঠে থাকাদের মধ্যে বিএনপি মনোনীত ১০ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৪, জাতীয় পার্টির ২, খেলাফত মজলিসের ১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১ এবং ২ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।

ইসি সূত্র জানায়, দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে ইসি তার অবস্থান শিথিল করেছে। এসব প্রার্থীর অধিকাংশই গত ডিসেম্বরে নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। যাঁরা নাগরিকত্ব ছাড়ার জন্য আবেদন করেছেন এবং পাসপোর্ট জমা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদনের ফি জমা দিয়েছেন, এমন প্রমাণ যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি। অনেকের কাছ থেকে ইসি দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়ার বিষয়ে হলফনামাও জমা নিয়েছে। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বরের আগে এমন প্রমাণ দেখাতে পারলে তাঁদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে কমিশন। তবে কেউ আবেদন করলেই সব দেশের নাগরিকত্ব বাতিল হয় না। নাগরিকত্ব বাতিলের আগে দেশভেদে নানান বিধান রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ইসির এমন ব্যাখ্যার অপব্যবহারের সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে কেউ আবেদন করেই নির্বাচন অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবেদনটি প্রত্যাহার কিংবা আবেদন মঞ্জুর না হলে কিংবা নাগরিকত্ব ত্যাগ করা পূর্ণতা না পেলে আইনের মূল উদ্দেশ্যের অপব্যবহার হতে পারে। এই অপব্যবহারের সুযোগ বন্ধ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শপথের দিন যদি অন্য দেশের পাসপোর্ট থেকেই যায়, তাহলে তো তিনি দ্বৈত নাগরিক।

তবে আবেদন করার মাধ্যমে বোঝাচ্ছেন, তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে চান। এ ক্ষেত্রে ত্যাগ করতে চাওয়া, আবেদন করা এবং নাগরিকত্ব ছাড়া একই বিষয় নয়।

দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়ার আবেদন গ্রহণের প্রমাণ যাঁরা দিয়েছেন এবং আবেদন করার জন্য যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো পূরণের প্রমাণ যাঁরা দিতে পারছেন, তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছি। কারণ, আবেদন করার অর্থ হচ্ছে আমার গ্রহণ করার সুযোগ নেই।’

ইসির সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি তো বিচারিক আদালতে। কমিশন তাদের বিবেচনায় মনে করেছে, প্রার্থীদের অবস্থান যথাযথ। সেই হিসেবে তারা বৈধ ঘোষণা করেছে।

দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নতুন আরেকটি বিধান যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২ক) দফা অনুসারে ৬৬ অনুচ্ছেদের (৯২) দফার (গ) উপদফাতে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে এবং পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে; কিংবা অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলে, এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে আপিল শুনানিতে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। আপিল শুনানি শেষে তিনি বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্বের আপিলের ক্ষেত্রে কমিশন সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একেকজনের ক্ষেত্রে একেক ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সিইসি বলেন, ‘অনেকে নির্যাতিত। তাঁরা জীবন বাঁচানোর জন্য অন্য দেশের সিটিজেন হয়েছেন। আমরা যদি আগের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা নিয়ে থাকি, তাহলে আমরা এগোতে পারব না। যে গণবিপ্লব হয়েছে, সেটার সুবিধা যাতে দেশ-জাতি পায়, সেই বিপ্লবের স্পিরিট ধারণ করে আমাদের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।’

হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) উল্লেখ করেননি। আপিল শুনানির আগেই তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়ার বিষয়টি কমিশনকে লিখিতভাবে জানান। কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়া হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেননি। আপিল শুনানিতে অংশ না নেওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে ইসি।

ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাঁরা নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনী হলফনামায় সত্য বলেছিলেন, তাঁদের মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়াকে সঠিক মনে করি। আর যাঁরা হলফনামায় উল্লেখ করেননি, সেটাকে অবৈধ মনে করি।’

যে ১৫ জন প্রার্থী যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন, তাঁরা হলেন রংপুর-১ আসনে জাতীয় পার্টির মো. মঞ্জুম আলী, নাটোর-১ খেলাফত মজলিসের মো. আজাবুল হক, যশোর-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. মাহবুবুল আলম, সিলেট-১ আসনে এনসিপির এহতেশামুল হক, ঢাকা-১ আসনে জামায়াতের মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির এ কে এম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা-৪-এ বিএনপির মো. মনিরুজ্জামান, সুনামগঞ্জ-২ বিএনপির তাহির রায়হান চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৩ স্বতন্ত্র মো. আনোয়ার হোসেন, মৌলভীবাজার-২ বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, হবিগঞ্জ-১ স্বতন্ত্র শেখ সুজাত মিয়া, ফেনী-৩ বিএনপির আবদুল আউয়াল মিন্টু, নোয়াখালী-১ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জহিরুল ইসলাম ও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির আফরোজা খানম।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছাড়া তিনজন হলেন ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম, চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতের এ কে এম ফজলুল হক ও চট্টগ্রাম-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন।

কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করা দুজন হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে জামায়াতের মো. জোনায়েদ হাসান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিএনপির মুশফিকুর রহমান।

তুরস্কের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ছেড়েছেন শেরপুর-২ আসনে বিএনপির মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী এবং ফিনল্যান্ডের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে জাতীয় পার্টির মু. খুরশিদ আলম।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপির প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়া ও ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর আহমেদ রানা এবং জার্মানির নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আজিজুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত