Ajker Patrika

পার্টনার প্রকল্প: কৃষক কার্ড কার্যক্রমে ধীরগতি ৩ সংকটে

  • চলতি বছর ৪৭ লাখ কৃষককে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা
  • ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড না থাকায় যাচাই করা যাচ্ছে না কৃষকের তথ্য
  • তিন মাসে সর্বোচ্চ দেড় লাখ ডেবিট কার্ড দিতে পারবে তিন ব্যাংক
  • কার্ডের জন্য ডিপিপি সংশোধন, বরাদ্দ বেড়ে ১৪০০ কোটি টাকা
সাইফুল মাসুম, ঢাকা 
পার্টনার প্রকল্প: কৃষক কার্ড কার্যক্রমে 
ধীরগতি ৩ সংকটে
প্রতীকী ছবি। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল

সরকার চলতি আগস্ট মাসে ১০ লাখ এবং চলতি বছরে ৪৭ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সারা দেশের সব উপজেলায় একযোগে চলছে কৃষক নিবন্ধন কার্যক্রম। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিবন্ধন কার্যক্রমে অর্থছাড়ে বিলম্ব, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড না থাকা এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুপাতে কৃষকদের ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড দিতে ব্যাংকগুলোর অপারগতা–এ তিন কারণে এই কার্ড কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। অবশ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, কৃষক কার্ড বিষয়ে সরকারের বিশেষ অগ্রাধিকার রয়েছে। ফলে সংকটগুলো দ্রুতই সমাধান হবে। ডিপিপি সংশোধন করে কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৪ জন কৃষক নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। কৃষক কার্ডের কার্যক্রম চলছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায়। বিশ্বব্যাংক, ইফাদ এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নের এই প্রকল্পকে সংক্ষেপে ‘পার্টনার’ প্রকল্প বলা হয়। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) কৃষক কার্ডের জন্য ৭৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, সরকার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে কৃষক কার্ড কার্যক্রমে এত দিন গতি আসেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার কৃষক কার্ডকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। ফলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা কৃষক কার্ড কার্যক্রম সচলে তোড়জোড় শুরু করেন।

ডিএইর তথ্য অনুসারে, কৃষক কার্ডের পাইলট কার্যক্রমের আওতায় ৫০৩টি উপজেলার ৫০৩টি কৃষি ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ শেষ হয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত এসব ব্লকে প্রায় ৮ লাখ কৃষক নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। এখন পাশের নতুন ব্লকে নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। গত এপ্রিলে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে আট বিভাগের ১০ জেলার ১১ উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকের ২০ হাজার ৮৩২ কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।

পার্টনার প্রকল্পের ডিপিপি অনুসারে, সারা দেশে ২ কোটি ২৭ লাখ কৃষক রয়েছেন। চলতি বছরের মধ্যে ৪৭ লাখ কৃষককে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষি খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনার মতো সুবিধা সহজলভ্য করতে কৃষকদের কার্ডের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হবে। মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিরাও এ কার্ডের সুবিধা পাবেন।

পার্টনার প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, এই প্রকল্পে বরাদ্দ করা ৭৪১ কোটি টাকায় সারা দেশে কৃষক কার্ড করা প্রায় অসম্ভব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের এক কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে জানান, নতুন করে ডিপিপি সংশোধন করে কৃষক কার্ডের জন্য ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্পের তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেকে বরাদ্দ এনে এই টাকার সংস্থান করা হয়েছে। প্রকল্পের বাদ দেওয়া কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১০০ কোটি টাকা, রামু অ্যাগ্রো ইকো পার্কের বরাদ্দের ১০০ কোটি টাকা, পূর্বাচলে প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন ল্যাব ও প্যাকিং হাউস (প্যাকহাউস) স্থাপনের জন্য বরাদ্দ ২২০ কোটি টাকা ও উপজেলা পর্যায়ে বরাদ্দ করা কৃষক কংগ্রেসের ১৮ কোটি টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, পার্টনার প্রকল্পের বরাদ্দ চূড়ান্ত অনুমোদন হতে সময় লাগতে পারে। তাই চলমান কৃষক কার্ডের কার্যক্রমের জন্য সরকারের রাজস্ব খাত থেকে আরও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় প্রস্তাব আকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। এই টাকার একটি বড় অংশ কৃষক কার্ডের আওতায় আসা কৃষকদের দেওয়া হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পার্টনার প্রকল্পের বরাদ্দের টাকায় সোনালী, জনতা ও কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে। সরকার চলতি আগস্টের মধ্যে ১০ লাখ কৃষককে কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও ব্যাংকগুলো বলছে, আগামী তিন মাসে তাঁরা সর্বোচ্চ দেড় লাখ কার্ড দিতে পারবে।

জানতে চাইলে পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমাদের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা আমাদের কর্মীদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারিনি। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দ অনুমোদন হলে আমরা ব্যবস্থা করব।’

ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড না থাকায় কৃষকের দেওয়া জমির তথ্য যাচাইয়ে জটিলতা কৃষক কার্ড নিবন্ধন কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। দেশের তিনটি বিভাগের অন্তত ১০টি উপজেলায় কৃষক কার্ড নিবন্ধন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড না থাকায় কৃষকদের দেওয়া জমির তথ্যের ওপর আস্থা রাখতে হচ্ছে। ওই তথ্য সঠিক কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষক কার্ডে অনেক ভুল তথ্যও যুক্ত হতে পারে।

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার কৃষক কার্ড নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল পশ্চিম সোনাদিয়া ব্লকে। ওই ব্লকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কৃষক নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। ১ আগস্ট থেকে পূর্ব সোনাদিয়া ব্লকে কাজ শুরু হয়েছে। হাতিয়ায় নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন ২৪ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। তাঁদের একজন নাম না প্রকাশ করা শর্তে বলেন, ‘অ্যাপসে সমস্যা। আইডিতে লগইন করতে পারিনি কয়েক দিন। আর অফিস থেকে কোনো সাপোর্ট না দেওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডে কৃষক নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়েছে। ওই ওয়ার্ডে ২ হাজার ৫৩০ জন কৃষক নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন। এখন ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডে নিবন্ধন চলছে। গাংনী উপজেলার এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘এ কাজের জন্য যদি সুযোগ-সুবিধা থাকত তাহলে কাজে স্বাচ্ছন্দ্য থাকত। নিজের টাকায় সব করতে হচ্ছে।’

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস জানান, ওই উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের একটি ব্লকে কৃষক নিবন্ধনের কাজ শেষ হয়েছে। এখন আরেকটি ব্লকে কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের আওতায় এসেছেন ১ হাজার ৭০৫ জন কৃষক। প্রতিকূল আবহাওয়ায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন।

জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আব্দুর রহিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে কর্মীরা নিজস্ব ডিভাইসে কৃষকদের তথ্য নিবন্ধন করছেন। ডিএইর নিজস্ব কর্মীরা যেহেতু নিবন্ধন কার্যক্রমে যুক্ত, ফলে অন্য কার্ডের মতো বেশি ব্যয় হচ্ছে না। বাজেট অনুমোদন হলে ন্যূনতম অর্থ বরাদ্দ তাঁরা পাবেন।’

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আজকের পত্রিকার গাংনী (মেহেরপুর) উপজেলা ও দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) উপজেলা প্রতিনিধি)।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত