
চলতি সময়ে এসে বিউটি পারলার বা স্যালনে নারী কিংবা পুরুষ কে না যায়? ঘরোয়া রূপচর্চায়ও আজকাল পুরুষের না নেই। যাঁরা আজও পুরুষের রূপচর্চা নিয়ে মুখ টিপে হাসেন, তাঁরা জেনে রাখুন; স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও রূপচর্চা করতেন! শুধু কি তাই? ঠাকুরবাড়িতে ঘটা করে রূপচর্চা করতেন বাড়ির প্রত্যেক সদস্য। এটি ছিল বাড়ির অন্য নিয়মগুলোর মতোই। তখনকার দিনে তো আর এখনকার মতো নানা রকম রেডিমেড ফেসপ্যাক পাওয়া যেত না। ঠাকুরবাড়ির মা-ঝি-বউয়েরা বাড়িতে বানিয়ে নিতেন নানা রকম ফেসপ্যাক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা দিয়েই না হয় শুরু করা যাক! কবির অন্যতম ব্যক্তিগত চিকিৎসক পশুপতি ভট্টাচার্য কবিকে একবার তাঁর চকচকে রেশমের মতো চুলের রহস্যের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে কবি বলেছিলেন, ‘আমি তেলও মাখি না, পারতপক্ষে সাবানও মাখি না। তেল দিলে চুলে জট পাকায় আর সাবানে সব রুক্ষ হয়ে যায়। আমি চুলে মাখি শর্ষেবাটা। আধা বাটা করা শর্ষে আমার জন্য রাখা থাকে। গায়েও তাই মাখি ডালবাটার সঙ্গে মিশিয়ে। ওতে চুল ও চামড়া—দুটোই মোলায়েম থাকে।’
শর্ষেবাটা যে চুলে এবং গায়ে মাখা যায়, আমরা অনেকে তা হয়তো জানি না। কিন্তু সেটি ছিল কবির রোজকার রূপ-রুটিনের অংশ। তবে ডালবাটা যে ত্বক খুব সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে, এ কথা কে না জানে? এটিকে সাবানের বিকল্প হিসেবে আমাদের মা-খালারাও ব্যবহার করেছেন।
রবীন্দ্রনাথকে ছোটবেলা থেকে ডালবাটা মেখে স্নান করাতেন তাঁর মা সারদাসুন্দরী দেবী। ঠাকুরবাড়িতে নারী-পুরুষনির্বিশেষে ছিল উপটান মেখে স্নান করার চল। গায়ের রং উজ্জ্বল করার জন্য তাঁর মা তাঁকে কোনো কোনো সময় বাদামবাটা, দুধের সর, কমলালেবুর খোসাবাটা মিশিয়ে গায়ে মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিতেন।
দেবেন্দ্রপত্নী সারদাসুন্দরী দেবী যে শুধু কবির রূপের দেখভালই করতেন, তা কিন্তু নয়। জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর ‘পুরাতনী’ থেকে জানা যায়, সারদাসুন্দরী দেবী একটি তক্তপোশে বসে বাড়ির কাজের মেয়েদের দিয়ে ছেলের বউদের গায়ে উপটান মাখাতেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ও বউয়েরা সারা দিনে অন্তত একবার স্নানের আগে দুধের সর ও ময়দা ভালো করে মিশিয়ে সারা গায়ে মেখে খানিকক্ষণ রেখে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে শরীরের ময়লা তুলতেন। তারপর ভালো করে শরীর ধুয়ে গামছা দিয়ে ঘষতেন। এতে ত্বক হয়ে উঠত মসৃণ। এতে শরীরের অবাঞ্ছিত লোমও ঝরে যেত। গায়ের রংও উজ্জ্বল হতো।

ঠাকুরবাড়ির ছোট মেয়েরা রোদে খেলে যখন ঘরে ফিরত, তখন তাদের গায়ে দুধের সর, ময়দা, কাঁচা হলুদবাটা এবং লেবুর রস মিশিয়ে মাখিয়ে দেওয়া হতো। কখনো রোদে পোড়া দাগ তুলতে মসুর ডালবাটার সঙ্গে কমলালেবুর খোসাবাটা মিশিয়েও গায়ে মাখানো হতো। মসুর ডাল ত্বকের ময়লা দূর করত, অন্যদিকে কমলালেবুর খোসা রোদে পোড়া দাগ কমাত। এভাবে ছোট থেকেই ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা রূপচর্চাকে রোজকার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন।
ঠাকুরবাড়ির রূপচর্চার কথা এলে যাঁর কথা এড়ানো যায় না, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথের বোন শরৎকুমারী দেবী। তাঁর অন্যতম শখ ছিল রূপচর্চা। দিনের অনেকটা সময় তিনি রূপচর্চায় কাটাতেন। অনেকক্ষণ ধরে শরীরে নানা ধরনের উপটান মেখে বড় চৌবাচ্চার জলে সাঁতার কেটে তবেই স্নান সারতেন। স্নানঘরে নানা ধরনের প্রসাধনী এবং রূপচর্চার উপকরণ তিনি সাজিয়ে রাখতেন এবং সময় নিয়ে সেগুলো ব্যবহার করতেন।
ঠাকুরবাড়ির স্নানের উপকরণের মধ্য়ে কমবেশি সবাই যা ব্যবহার করতেন, তা হলো দুধের সর ও ময়দার মিশ্রণ। এটি মেখে স্নানের পর প্রত্য়েকে গায়ে খাঁটি সরিষার তেল বা বিলেত থেকে আনা জলপাই তেল মালিশ করতেন। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য পরে ‘তরলা’ সাবান ব্যবহার শুরু করেছিলেন। এই তরল সাবান তাঁকে জোগান দিতেন ডা. পশুপতি ভট্টাচার্যের ভাই বিজ্ঞানী গিরিজাপতি ভট্টাচার্য।
ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা গায়ের রং উজ্জ্বল করতে একধরনের ক্রিম বানাতেন। এই বিশেষ ক্রিমকে তাঁরা বলতেন বিডি ক্রিম। এটি বানাতে লাগত আধা আউন্স শক্ত প্যারাফিন, ২ আউন্স সাদা পেট্রোলিয়াম জেলি, আধা চা-চামচ বোরিক পাউডার, কর্পূর তেল এবং অল্প পরিমাণে চন্দন তেল। প্রথমে প্যারাফিন গলিয়ে নিয়ে ছেঁকে আগুনে বসিয়ে তাতে পেট্রোলিয়াম জেলি, বোরিক পাউডার, কর্পূর তেল আর চন্দন তেল মিশিয়ে নামিয়ে নিতেন। তবে খানিকক্ষণ রেখে দেওয়ার পর সেটা জমে যেত। তখন ওই ক্রিম মুখে মেখে কিছুক্ষণ রেখে পাতলা কাপড় দিয়ে মুছে নিতেন তাঁরা। এতে ত্বক হয়ে উঠত পেলব। বাড়তি তেলতেলে ভাবও আর থাকত না।
সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কিংবা বিশ শতকের শুরুতেও ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বউয়েরা পেডিকিওর, ম্যানিকিওর করাতেন। আর সেটি করার জন্য সপ্তাহে এক দিন অন্দরমহলে নাপিতানি আসতেন। সবার হাত, পায়ের নখ কেটে ঝামা দিয়ে পা ঘষে পরিষ্কার করে আলতা পরিয়ে দিতেন তিনি। তবে বোতলে কেনা আলতা তাঁরা ব্যবহার করতেন না। গাছ থেকে আলতাপাতা ছিঁড়ে, হাতে গুলি পাকিয়ে টিপে টিপে রস বের করে পরিয়ে দেওয়া হতো।
শুধু এ ধরনের রূপচর্চা করেই ক্ষান্ত হতেন না ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বউয়েরা। বিকেল হলেই বাড়িতে সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মুখে ক্রিম মেখে তারপর দেওয়া হতো চন্দনগুঁড়ার পাউডার। কাজল বা সুরমা দিয়ে চোখের প্রসাধন করতেন তাঁরা। এ ছাড়া বাড়িতে মনসাপাতায় ঘি লাগিয়ে প্রদীপের শিখায় ধরে তৈরি হতো কাজল। রুজের বদলে তাঁরা সিঁদুরগুঁড়া হালকা করে গালে দিয়ে গাল রাঙাতেন। ঠাকুরবাড়ির বউ-ঝিয়েরা নানা ধরনের টিপ পরতে ভালোবাসতেন। শিউলি ফুলের পাপড়ি দিয়ে তাঁরা একধরনের টিপ বানাতেন। সেই টিপ বানানোরও ছিল বিশেষ পদ্ধতি। শিউলি ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে বেটে একটি লোহার পাত্রে রেখে তাতে দিতেন অল্প খয়ের। পরে সেটি কালো রঙের হয়ে যেত। তা দিয়ে তাঁরা কপালে নানা নকশা করে টিপ পরতেন। এ ছাড়া মরা কাঁচপোকার ডানা ছিঁড়ে সেটিকে গোল করে কেটে নিয়ে চকচকে কাঁচপোকার টিপও কপালে পরানো হতো। এসব টিপ পরতেন কুমারী মেয়েরা, আর বিবাহিত মেয়েরা পরতেন সিঁদুরের টিপ।
সূত্র: শান্তা শ্রীমানী, ‘ঠাকুরবাড়ির রূপ-কথা’, ২০১৭, পত্রলেখা, কলকাতা

গ্রীষ্মের সকাল তখন পুরোপুরি তীব্র হয়ে ওঠেনি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে দিনের শুরুটা হতো সংযত ছন্দময়। এই সময়ের জলখাবার কখনোই ভারী নয়; বরং এমনভাবে সাজানো, যাতে শরীর ধীরে ধীরে দিনের গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
সকাল সকাল প্রেমের সম্পর্কের আকাশে রোমান্সের রংধনু দেখা দিতে পারে, তবে বেশি ডানা মেলবেন না। বিকেলের দিকে গিন্নি বা গার্লফ্রেন্ড যখন হঠাৎ শপিং মলে যাওয়ার ‘মাইল্ড অ্যাটাক’ আবদার ধরবে, তখন আপনার পকেট এবং মন—দুই-ই একযোগে ‘ডিসকানেক্টেড’ হয়ে যেতে পারে।
২ ঘণ্টা আগে
এই টানা বৃষ্টি পড়ে তো এই ভ্যাপসা গরম; এভাবেই চলছে। এমন আবহাওয়ার প্রভাব পড়ছে প্রায় সবার চুলে। তবে মাথার ত্বক স্যাঁতসেঁতে থাকলে চুল হারায় স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও কোমলতা। দেখা দেয় চুল ঝরে যাওয়া এবং খুশকির মতো নানান সমস্যাও।
৩ ঘণ্টা আগে
আমার ত্বক তৈলাক্ত। মুখে ট্যালকম পাউডার এবং হালকা ময়শ্চারাইজার ছাড়া তেমন কিছুই ব্যবহার করি না। সব সময় মুখে দু-একটা ব্রণ থাকে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী?
৩ ঘণ্টা আগে