Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় খাবারের ১২৫ বছর: এক রহস্যময় শেফ ও প্রথম ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁর গল্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় খাবারের ১২৫ বছর: এক রহস্যময় শেফ ও প্রথম ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁর গল্প
রঞ্জি স্মাইল যুক্তরাষ্ট্রের রন্ধনশিল্পের এক বর্ণিল ও রহস্যময় নাম। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

ঠিক ১২৫ বছর আগে, ১৯০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে গড়ে উঠেছিল প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁ। আর এই ঐতিহাসিক ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন রঞ্জি স্মাইল নামের এক রহস্যময়, অত্যন্ত বর্ণিল এবং করিৎকর্মা এক ভারতীয় শেফ।

আমেরিকার রন্ধনশৈলীতে ভারতীয় খাবারের গোড়াপত্তন করা এই ব্যক্তির আসল পরিচয় বা প্রাথমিক জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়। এমনকি ‘রঞ্জি স্মাইল’ নামটি তাঁর প্রকৃত নাম ছিল কি না, তা নিয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ধারণা করা হয়, তৎকালীন ব্রিটিশ টেস্ট ক্রিকেটের তারকা কে এস রঞ্জিত সিং জির নাম থেকে ‘রঞ্জি’ এবং সম্ভবত ‘ইসমাইল’ নামের ইংরেজি রূপান্তর হিসেবে ‘স্মাইল’ পদবিটি বেছে নিয়েছিলেন তিনি।

১৮৯৯ সালের গ্রীষ্মে লন্ডন থেকে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান রঞ্জি। ঐতিহ্যবাহী এলিস আইল্যান্ড পার হয়ে তিনি নিজের নামের সাথে জুড়ে দেন ‘জো’—জো রঞ্জি স্মাইল।

লন্ডন থেকে নিউইয়র্কের অভিজাত অঙ্গনে

নিউইয়র্কে আসার আগে রঞ্জি লন্ডনের বিখ্যাত সেসিল এবং স্যাভয় হোটেলে কারি শেফ হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে তাঁর রান্নার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে নিউইয়র্কের পঞ্চম অ্যাভিনিউয়ের নামজাদা ‘শেরি’স রেস্তোরাঁ’র মালিক লুইস শেরি তাঁকে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

উনিশ শতকের শেষের দিকে নিউইয়র্কে ভারতীয় দর্শনের প্রতি এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হচ্ছিল, বিশেষ করে স্বামী বিবেকানন্দের বাগ্মিতা ও বক্তব্যের পর থেকে। সেই সঙ্গে শহরে ভারতীয় নাবিক, ছাত্র এবং পেশাজীবীদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছিল। এই পটভূমিতেই লুইস শেরি তাঁর রেস্তোরাঁয় একজন ভারতীয় কারি শেফ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

‘শেরি’স রেস্তোরাঁ’ ছিল তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবেরদের আড্ডাখানা। রঞ্জি সেখানে শুধু রান্নাই করতেন না, বরং খাবার পরিবেশনকেও একটি নাটকীয় পরিবেশনায় রূপ দিতেন। মাথায় নীল রেশমি পাগড়ি এবং গায়ে সাটিনের কোট পরে গ্রাহকদের সামনে সেলাম ঠুকে তিনি জিজ্ঞেস করতেন, ‘সাহেব, কারি কি ঝাল হবে নাকি নরম?’

সংবাদমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে চর্চা শুরু হয়। ‘নিউইয়র্ক হেরাল্ড’ থেকে শুরু করে অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর ছবি ছাপা হতে থাকে। রঞ্জির হাতে তৈরি বোম্বে ডাক এবং তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন ‘লেটুস সিলন’ খেতেই রেস্তোরাঁয় ভিড় জমাতেন অভিজাত মার্কিন নাগরিকেরা।

‘ওমর খৈয়াম’ ও পতনের সূচনা

শেরি’স রেস্তোরাঁয় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায়, ১৯০১ সালে নিজস্ব একটি একক ভারতীয় রেস্তোরাঁ খোলার সিদ্ধান্ত নেন রঞ্জি। প্রখ্যাত অর্থলগ্নিজীবী রোল্যান্ড আর কনকলিনের আর্থিক সহায়তায় তৎকালীন নিউইয়র্কের কেন্দ্রস্থলে ৩২৫ ফিফথ অ্যাভিনিউতে আত্মপ্রকাশ করে ‘ওমর খৈয়াম’ নামের প্রথম ভারতীয় রেস্তোরাঁ।

ভারতীয় পর্দা, ঝুলন্ত লণ্ঠন, পাগড়ি পরা কর্মী এবং রাজস্থানি বাদ্যযন্ত্রীদের সুর—সব মিলিয়ে রেস্তোরাঁটি ছিল প্রাচ্যের এক ঝলক রূপকথা। কিন্তু রাজকীয় আয়োজন সত্ত্বেও এক বছরের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ওমর খৈয়াম। স্থানীয় পত্রিকাগুলোর দাবি ছিল, নিউইয়র্কের বাসিন্দারা সাময়িকভাবে ভারতীয় খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হলেও দ্রুতই সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

ব্যবসা গুটিয়ে যাওয়ার পর রঞ্জি স্মাইলের জীবনেও শুরু হয় নাটকীয় মোড়। তিনি নিজেকে বেলুচিস্তানের আমিরের কাল্পনিক পুত্র বা ‘প্রিন্স’ হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এমনকি মানব পাচারের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত পর্যন্ত গড়ায় তাঁর কাণ্ডকারখানা।

নানা আইনি জটিলতা, বিতর্কিত বিয়ে এবং প্রচারের বাইরে চলে যাওয়ার পর, ১৯৩৭ সালে তাঁর শেষ স্ত্রী আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। আর এর মাধ্যমেই ইতিহাসের পাতা থেকে নীরবে হারিয়ে যান এই বিতর্কিত অথচ প্রগতিশীল রন্ধনশিল্পী।

উত্তরসূরিদের পথচলা

রঞ্জি স্মাইলের রেস্তোরাঁটি বেশিদিন না টিকলেও, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় খাবারের যে বীজ তিনি বপন করেছিলেন, তা পরবর্তীতে আরও গভীর শেকড় গাড়ে।

১৯০৯ সালে পাঞ্জাবের সাংবাদিক সাঁত নিহাল সিং মার্কিন পাঠকদের জন্য ভাজিয়া, পুরি, হালুয়া এবং ‘ফ্রায়েড চিকেন আ লা হিন্দু’র রেসিপি প্রকাশ করেন। তৎকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় মশলার ঘাটতি থাকায় তিনি পাঠকদের চীনা গ্রোসারি শপ থেকে বিকল্প উপাদান খুঁজে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

এর কয়েক বছর পর, শ্রীলঙ্কা (তৎকালীন সিলন) থেকে আসা কে ওয়াই কিরা নামক এক তরুণ নিউইয়র্কের হারলেমে ‘সিলন ইন্ডিয়া ইন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন। পরবর্তীতে টাইমস স্কয়ারের কাছে স্থানান্তরিত হওয়া এই রেস্তোরাঁটি আশির দশক পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে টিকে ছিল। হলিউড ও ব্রডওয়ের তারকাদের পাশাপাশি অভিবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের অন্যতম আড্ডাখানা হয়ে উঠেছিল এটি।

আজ ১২৫ বছর পর, যুক্তরাষ্ট্রের আনাচে-কানাচে হাজার হাজার ভারতীয় রেস্তোরাঁ হয়েছে। ওমর খৈয়ামের অকাল সলিল সমাধি ঘটলেও, জো রঞ্জি স্মাইলের সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসংস্কৃতিতে ভারতীয় রন্ধনশিল্পের সূচনা হয়েছিল।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত