পেট ভরপুর অথচ শরীর ক্লান্ত, জানুন এর রহস্য কী

তিন বেলা পেট ভরে খেলেন। এরপরও অনেকের সারা দিন শরীর ক্লান্ত লাগে কিংবা কাজে মনোযোগ আসে না। এতে কেউ কেউ আবার নিজের ওপর বিরক্ত হন। তবে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনি একা নন, এই সমস্যায় ভুগছে লাখ লাখ মানুষ। খাবার খেলে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু শরীরের ভেতরটা প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে হাহাকার করতে থাকে। দৃশ্যমান এই ক্ষুধার কোনো ছবি প্লেটে দেখা যায় না, পেট খালিও থাকে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হিডেন হাঙর বা নীরব ক্ষুধা।
হিডেন হাঙর আসলে কী
সহজ কথায়, হিডেন হাঙর মানে খাবার না পাওয়া নয়। পর্যাপ্ত বা অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার পরও শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি এই অনুভূতি তৈরি করে। প্রতিদিন তিন বেলা ভারী খাবার খেয়েও আপনি অবচেতনভাবে লোহা (আয়রন), দস্তা (জিংক), ভিটামিন এ বা বি১২-এর ঘাটতিতে ভুগতে পারেন। আমাদের দেশের খাবারে ভাত, রুটি বা আলুর মতো শর্করাজাতীয় খাবারের আধিক্য বেশি। এগুলো পেট ভরাতে সাহায্য করলেও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টির জোগান দিতে পারে না। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
যেভাবে শরীরে বাসা বাঁধে এই পুষ্টিহীনতা
হিডেন হাঙর নানা রূপে প্রকাশ পেতে পারে—
খনিজের ঘাটতি: শরীরে আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম বা আয়োডিনের অভাব রক্তস্বল্পতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং হাড়ের দুর্বলতা তৈরি করে।
ভিটামিনের ঘাটতি: ভিটামিন এ, ডি বা বি১২-এর অভাব দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেওয়া, ক্লান্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।
ক্যালরি আছে, পুষ্টি নেই: শুধু কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার খেয়ে পেট ভরালেও দীর্ঘ মেয়াদে শরীরে বড় ধরনের পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়।

দৈনন্দিন খাবার টেবিলের ভুল
আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে কিছু ছোট ভুল এই নীরব ক্ষুধা ডেকে আনে। যেমন সকালে চা-বিস্কুট, দুপুরে শুধু ভাত আর সামান্য ডাল, আর রাতে রুটি ও আলুভাজি খেয়ে পেট ভরা মনে হতে পারে। কিন্তু এই খাবারে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব ভিটামিন ও মিনারেল থাকে না। এ ছাড়া শুধু মাঝেমধ্যে পালংশাক বা এক গ্লাস দুধ খেয়ে ভাবেন, সুষম ডায়েট হয়ে গেছে, যা আসলে ভুল ধারণা। বিশেষ করে নিরামিষভোজীদের মধ্যে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি একটি সাধারণ চিত্র। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীর সহজে শোষণ করতে পারে না। তাই এর সঙ্গে লেবু বা আমলার মতো ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খাওয়া জরুরি।
ক্ষতিকর প্রভাব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি
হিডেন হাঙর শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যই নয়, জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, জীবনের প্রথম ১ হাজার দিনে এই ঘাটতি ঘটলে তা শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও শারীরিক বৃদ্ধিতে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে।

নীরব ক্ষুধা থেকে মুক্তির উপায়
সারা দিন পেট ভরিয়ে খাওয়া মানেই পুষ্টি নিশ্চিত হওয়া নয়। তাই নিজের ও পরিবারের সুস্থতার স্বার্থে খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া এবং পুষ্টিকর সুষম খাবার খাওয়া এখন সময়ের দাবি। সারা দিনের ডায়েটে বড় কোনো পরিবর্তন না এনেও সহজে এই ঘাটতি দূর করা সম্ভব। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী দৈনন্দিন থালায় কিছু পরিবর্তন আনুন।
-শুধু রুটি-আলুভাজি না খেয়ে পাতে ডাল, ছোলা বা নানা পদের মৌসুমি শাকসবজি রাখুন।
-পোলাও বা খিচুড়িতে মটরশুঁটি, বাদাম ব্যবহার করুন। ভাত বা ডালের সঙ্গে লেবু খাওয়ার অভ্যাস করুন, যা পুষ্টি শোষণ বাড়াতে সাহায্য করে।
-চা বা কফি ভরা পেটে বা খাবারের সঙ্গে না খেয়ে খাবার খাওয়ার কিছুটা পরে পান করুন; কারণ, চা-কফি উদ্ভিজ্জ আয়রনের শোষণ কমিয়ে দেয়।
-প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফলমূল, দুধ, দই, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখার চেষ্টা করুন।
সূত্র: হেলথ শর্টস, বেটার নিউট্রিশন









