তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে—দাবি বিশ্বখ্যাত ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদের

বিশ্ব কি ইতিমধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বিশ্বখ্যাত ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদ ও লেখক পরাগ খান্না বলছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, সংঘাতের বিস্তার শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও সামরিক তৎপরতার মধ্যেও এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
আবুধাবিতে দ্য ন্যাশনাল সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খান্না বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার মনে হয়, আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই রয়েছি। ২০৬৫ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাই না, যখন ইতিহাসবিদেরা বলবেন, হ্যাঁ, ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল।’
খান্নার মতে, বর্তমান সংঘাতকে বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে বিবেচনার দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অস্ত্র সরবরাহ, সেনা মোতায়েন, তেল-গ্যাস ও পণ্য-বাণিজ্য, সোনার মজুত এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই এই আন্তসংযোগ বোঝা যায়। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন খান্না। তাঁর মতে, গত পাঁচ দশকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকট—লেবাননের গৃহযুদ্ধ থেকে আরব বসন্ত—সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) উত্থানের পথ তৈরি করেছে। কিন্তু এবার দেশটি সরাসরি হামলা ও লক্ষ্যবস্তুর শিকার হওয়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে ইউএই শেষ পর্যন্ত সংকট কাটিয়ে উঠবে এবং নিজেদের সক্ষমতা ও সহনশীলতার প্রমাণ দেবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিতে পরিবর্তন
খান্নার ধারণা, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ধরন বদলাবে। ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক ঘাঁটিগুলো আগের মতো পুনর্নির্মাণ করা হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সরে যাবে। বরং সাইবার সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশটির প্রভাব বজায় থাকবে।
বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র পূর্বমুখী
খান্নার মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ২০০০-এর দশকের পণ্যবাজারের উত্থানের পর শুরু হওয়া এই পরিবর্তন এখন প্রায় অপরিবর্তনীয়। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এশিয়ার প্রভাব আরও বাড়বে এবং জ্বালানি-বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ডলারের আধিপত্যও কমতে পারে।
খান্না বলেন, ২০৫০ সালে ফিরে তাকালে একুশ শতকের প্রথম প্রান্তিকের সবচেয়ে বড় ঘটনা হিসেবে শুধু চীনের উত্থানকে দেখা হবে না; বরং এশিয়ার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিকেই বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তাঁর ভাষায়, বর্তমানটা ইতিমধ্যে এশিয়ার।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরামের প্রস্তাব
২০২৭ সালের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে সীমান্তবিরোধকে চিহ্নিত করেছেন খান্না। তাঁর মতে, আপাতত স্থগিত থাকা সংঘাতগুলো আসলে বিলুপ্ত হয়নি; যেকোনো সময় সেগুলো আবার মাথাচাড়া দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েল, ইরান, তুরস্ক, মিসর ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানকে মডেল হিসেবে দেখছেন খান্না।
খান্নার মতে, এমন একটি ফোরাম গঠনের জন্য আবুধাবিই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। উপসাগরীয় ও পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের ‘সিঙ্গাপুর’ হিসেবে আবুধাবি আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।









