Ajker Patrika

ঘরকুনো জীবন আর ‘কোজি নাইট’, অলসতায় হারাচ্ছে সামাজিক মেলবন্ধন

ফিচার ডেস্ক
ঘরকুনো জীবন আর ‘কোজি নাইট’, অলসতায় হারাচ্ছে সামাজিক মেলবন্ধন
নিজের মতো করে কাটানো অলস ও একাকী সময় যখন স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা রূপ নেয় এক গভীর নীরব সংকটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বলা হয়। ছবি: পেক্সেলস

বাড়ি কিংবা চেনা পরিবেশের বাইরে যেতে না চাওয়া বা মানুষের সঙ্গে না মেশার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। বাড়িতে মেহমান এলে বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরেরা ঘরে লুকিয়ে থাকে কিংবা কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার বাহানা করে সামনে আসতে চায় না। এমন ঘরকুনো স্বভাব দেখলে পরিবারের বড়রা প্রায়ই মন খারাপ করেন কিংবা বকাঝকা করেন। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও কথা বলার ইতিবাচক দিক হলো, এর মাধ্যমে ভেতরের লজ্জা, ভয় ও সংকোচের জড়তা কেটে যায়। একটি শিশু হয়তো নিজের কোনো পছন্দের খেলা বা কাজে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালোবাসে। কিন্তু তাকে চারপাশের সমাজ ও মানুষের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সামাজিক মেলবন্ধন ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।

তবে টিকটক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করলেই আজকাল ‘হ্যাপিয়েস্ট অ্যাট হোম’ কিংবা ‘কোজি নাইট’-এর মতো নানা ট্রেন্ড চোখে পড়ে। দিন শেষে কাজ বা পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরে সোফায় গা ভাসিয়ে দেওয়া কিংবা বিছানায় গড়িয়ে নেওয়াকে আমরা অনেক সময় মানসিক প্রশান্তি পাওয়ার সহজ উপায় মনে করি। কিন্তু নিজের মতো করে কাটানো এই অলস ও একাকী সময়টি যখন স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা রূপ নেয় এক গভীর নীরব সংকটে—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’।

কেন মানুষ ঘরকুনো হচ্ছে

ছোটবেলা থেকে মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখলে মনের পরিধি বড় হয়, যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ে এবং সুন্দর সম্পর্ক গড়ার ভিত্তি তৈরি হয়। ঘরের চার দেয়ালের স্বাচ্ছন্দ্য যেমন আরামদায়ক, ঠিক তেমনি বাইরের মানুষ ও সমাজের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই মানুষকে মানসিকভাবে পরিপক্ব ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কিন্তু একটা সময় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে বাস্তবে তা হয়ে ওঠে না। আমেরিকান ফ্রেন্ডশিপ প্রজেক্ট পরিচালিত এক গবেষণায় এর মূল কারণগুলো স্পষ্ট হয়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, কাজ ও জীবনের চাপে তাঁরা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় বা শক্তি পান না। ১৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তাঁদের চাকরি বা কাজের সময়সূচি এই সামাজিক মেলামেশার পথে বড় বাধা। প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গিয়ে সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাঁদের কাছে নেই।

একই তথ্য উঠে এসেছে ‘দ্য হ্যারিস পোল’-এর জেন-জি প্রজন্মের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায়। এতে দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ তরুণ মনে করেন, বাইরে বের হয়ে আড্ডা দেওয়া তাঁদের মানিব্যাগের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। ইউনিভার্সিটি অব কানসাসের যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক এবং এএফপির সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ্রি হল জানান, এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে একটি জড়তা তৈরি করে। তবে একবার এই বৃত্ত ভেঙে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বা কথা বলা শুরু করলে তা ক্লান্তি কমানোর পাশাপাশি মানুষকে মানসিকভাবে নতুন শক্তি জোগায়।

ডিজিটাল পর্দার ওপারে কিংবা ঘরের চার দেয়ালের বাইরে এসে বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলাই মানসিক প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি। ছবি: পেক্সেলস
ডিজিটাল পর্দার ওপারে কিংবা ঘরের চার দেয়ালের বাইরে এসে বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলাই মানসিক প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি। ছবি: পেক্সেলস

একাকিত্ব বনাম সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানে অন্যের থেকে আলাদা থাকা। একাকিত্ব হলো মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি। এই দুটিই মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে তা কেবল মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শরীরে ও মস্তিষ্কে নানান জটিলতা তৈরি করে। এতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, তীব্র মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ ছাড়া এ অবস্থা হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়া এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। বিচ্ছিন্ন মানুষেরা সাধারণত কায়িক পরিশ্রম কম করেন, অপুষ্টিকর বা চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খান এবং অনিদ্রায় ভোগেন।

কাটিয়ে ওঠার কিছু উপায়

বাজেটের মধ্যে থেকে এবং দৈনন্দিন জীবনে ছোট কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক মেলামেশা ফেরানো সম্ভব। নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের ভারসাম্য ধরে রাখতে ‘লে-ডাউন টাউন’-এর আরাম থেকে মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসা জরুরি। ডিজিটাল পর্দার ওপারে কিংবা ঘরের চার দেয়ালের বাইরে এসে বাস্তব মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলাই মানসিক প্রশান্তির মূল চাবিকাঠি। এ জন্য যা করতে পারেন—

আর্থিক চাপ ছাড়া আড্ডা: বন্ধুদের নিয়ে পার্কে হাঁটা, লাইব্রেরির বিনা খরচের কোনো ইভেন্টে অংশ নেওয়া কিংবা ঘরের মধ্যে একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

সহমর্মিতা ও খোলামেলা আলোচনা: নিজের ব্যস্ততা বা আর্থিক সংকট নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অন্য মানুষটিও একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

ছোট পদক্ষেপে শুরু করা: নিয়মিত বিশাল কোনো পরিকল্পনা না করে ছোট একটি ফোন কল, টেক্সট কিংবা স্বল্প সময়ের ভিডিও কলে কথা বলাও একাকিত্ব কমাতে সাহায্য করে।

নতুন শখ ও সামাজিক সংগঠন: ক্লাবে যুক্ত হওয়া, স্বেচ্ছাসেবী কাজ করা কিংবা কোনো পোষা প্রাণী লালন-পালন করাও সামাজিক সক্রিয়তা বাড়াতে সহায়তা করে।

সূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, সিএনবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত