Ajker Patrika

দিনে তিন বেলা খাবার খাওয়া কি আসলেই জরুরি

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
দিনে তিন বেলা খাবার খাওয়া কি আসলেই জরুরি
মার্কিন খাদ্যবিষয়ক লেখিকা এম এফ কে ফিশার তাঁর ১৯৪২ সালে প্রকাশিত বই ‘হাউ টু কুক আ উলফ’ বইয়ে বলেছেন, ‘তিন বেলা খাওয়ার নিয়ম প্রয়োজন তো নয়ই, বরং অহেতুক’। ছবি: পেক্সেলস

দিনে তিন বেলা খাওয়াকে আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সারা দিনে তিন বেলা খাবার খাওয়া কি আসলেই জরুরি কি না। মার্কিন খাদ্যবিষয়ক লেখিকা এম এফ কে ফিশার তাঁর ১৯৪২ সালে প্রকাশিত বই ‘হাউ টু কুক আ উলফ’ বইয়ে এমনই যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রথমত, সব মানুষের প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের প্রয়োজন হয় না বা তারা তা চায়ও না। তাদের মধ্যে অনেকে দুই বেলা, আড়াই বেলা বা অল্প অল্প করে পাঁচ বেলা খাবারেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে।

তিন বেলা খাওয়ার নিয়ম প্রয়োজন তো নয়ই, বরং অহেতুক। মার্কিন খাদ্যবিষয়ক লেখিকা এম এফ কে ফিশার, ‘হাউ টু কুক আ উলফ’ (১৯৪২)

ফিশার তাঁর বইটি লিখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধজনিত খাদ্যসংকটের সময়ে কীভাবে আনন্দদায়ক ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া যায়, তার একটি নির্দেশিকা হিসেবে। কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ পরামর্শ আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৮০ বছরের বেশি সময় পরও সকাল-দুপুর-রাতের খাবারের একনিষ্ঠ খাদ্যাভ্যাসের বিপরীতে গিয়ে একটা কথা কিন্তু শক্তভাবে বলা যেতেই পারে—হালকা খাবার খাওয়া জাতি ব্রিটিশরা। কিন্তু তারাও এখন আর দিনে তিন বেলা খায় না। টাইমসের একটি সাম্প্রতিক সংবাদের শিরোনামে এমন তথ্যই প্রকাশ করা হয়েছিল।

দিনে তিনবার নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার নিয়মগুলো খতিয়ে দেখতে এর মধ্যে বিভিন্ন গবেষণাও হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা বিভিন্নভাবে জেনে নিয়েছি, প্রতিদিন একই নিয়মে তিন বেলা নির্দিষ্ট মাপে খেতে হয়। খাবারের আইটেমেও বিশেষত্ব রাখার ব্যাপারটি এখন ট্রেন্ডি। এসব ট্রেন্ড অনুসরণ করতে না পারলে আজকাল অনেকে অপরাধ বোধেও ভোগে। কিন্তু মানবশরীরের জন্য এগুলো আসলেই জরুরি কি না, সেটা কারও জানা নেই। বরং কোন বেলায় কী খাওয়ার চল রয়েছে, সেগুলোর পেছনে ইতিহাস ভিন্ন। আমেরিকান চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদ জন হার্ভে কেলগ, যিনি আমাদের পরিচিত সকালের নাশতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন। তিনি এবং সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের সহসদস্যরা উনিশ শতকের শেষের দিকে ‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্যানাটোরিয়াম স্থাপন করেন। এখানেই সিরিয়ালের মতো সকালের নাশতা খাওয়ার প্রচার করা হয়। সিরিয়াল বা কর্নফ্লেক্স তৈরি হয় তাঁর হাত ধরেই।

সে সময় শিল্পকারখানার শ্রমিকেরা যেন ভরপেট খেয়ে অলস সময় না কাটান, তাই এই হালকা নাশতার উদ্ভাবনে খুশিই হয়েছিলেন কারখানার মালিকেরা। প্রায় এক শ বছর পরে এখনকার সর্বব্যাপী প্যাকেটজাত স্যান্ডউইচের পেছনের উদ্যোক্তারা অ্যালান সুগারের মতো শিল্পপতিদের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন, যার ফলে তাঁরা গর্ব করে বলতে পারতেন, কর্মীদের জন্য দুপুরের খাবার হিসেবে তাঁদের ডেস্কে রাখা থাকত একটি করে স্যান্ডউইচ, যা হালকা ও পুষ্টিকর।

মানবশরীরের জন্য তিন বেলা আসলেই জরুরি কি না, সেটা কারও জানা নেই। ছবি: পেক্সেলস
মানবশরীরের জন্য তিন বেলা আসলেই জরুরি কি না, সেটা কারও জানা নেই। ছবি: পেক্সেলস

ফলে সকাল ও দুপুরে কী খাওয়া হচ্ছে বা আদৌ খাওয়া জরুরি কি না, তা নির্ধারণ করা হয়েছে কে কোন ধরনের কাজ করছে, তার ওপর। তবে বর্তমানে সময় মেনে তিন বেলা খাবার খাওয়ার ধারণা থেকে সরে আসছে অনেকে। যারা শিশুদের সার্বিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য পারিবারিক নৈশভোজের গুরুত্ব তুলে ধরে, তারা একসঙ্গে বসে খাওয়ার আদর্শটি বজায় রেখেছে। শিক্ষাবিদ অ্যান মারকোট আধুনিক ‘রান্না করা রাতের খাবার’ সম্পর্কে লিখেছেন, এটি একটি ‘সাধারণ, এমনকি সুশৃঙ্খল গার্হস্থ্য জীবনের’ প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি একদিক থেকে প্রত্যাশা তৈরি করে আবার অন্যভাবে ক্ষতিকরও হয়ে উঠতে পারে। এই যেমন রাতে খাওয়ার নিয়ম রয়েছে বলেই রান্নার বাড়তি চাপ নেওয়া। অথচ এমনও হতে পারে, হয়তো শরীরের খাওয়ার চাহিদা নেই। কিন্তু শুধু নিয়ম মানতেই মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রান্নাঘরে ঢুকছেন।

লেখিকা লরা গুডম্যানের মতে, রাতের খাবার যেমনই হোক, তা তৈরির কাজটি সাধারণত নারীর ওপরই বর্তায়। তাই সন্ধ্যায় একটি ভালো নাশতা পারিবারিক নৈশভোজের চাপ কিছুটা কমাতে পারে এবং খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ও সহজাত আনন্দকে উৎসাহিত করতে পারে।

আর তিন বেলা খাওয়া কি আসলেই জরুরি? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যখনই আমাদের ইচ্ছা হয়, তখনই সুস্বাদু ছোট ছোট টুকরা করা খাবার খাওয়া যেতে পারে। এটি হতে পারে তিন বেলা প্রধান খাবারের প্রভাব শিথিল করার একটি উপায়।’

সূত্র: গার্ডিয়ান ও অন্যান্য

ছবি: পেক্সেলস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত