Ajker Patrika

ফ্রেদাগস্তাকো: যেদিন নরওয়েজিয়ানরা পরিবারের সঙ্গে এক টেবিলে জড়ো হন

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
ফ্রেদাগস্তাকো: যেদিন নরওয়েজিয়ানরা পরিবারের সঙ্গে এক টেবিলে জড়ো হন
প্রতি শুক্রবার রাতে পুরো পরিবারের একসঙ্গে টাকো খাওয়ার অভ্যাস এখন নরওয়ের অনানুষ্ঠানিক এক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

নরওয়েতে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় এক অদ্ভুত এবং সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। সুপারমার্কেটগুলোতে জমে মানুষের ভিড়, ট্রলি ভর্তি হতে থাকে নরম টরটিলা, সালসা আর চিজের প্যাকেটে। পুরো সপ্তাহ স্কুল, কলেজ, অফিসের কাজ করে নরওয়ের শিশু, তরুণ ও প্রবীণেরা অপেক্ষা করেন সপ্তাহের কাঙ্ক্ষিত পারিবারিক মুহূর্তটির জন্য। নরওয়ের এই বিখ্যাত সংস্কৃতির নাম ‘ফ্রেদাগস্তাকো’ বা ‘টাকো ফ্রাইডে’। যদি প্রশ্ন করা হয়, নরওয়ের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় খাবার কী। ফ্রোজেন পিৎজা কিংবা ঐতিহ্যবাহী সসেজের নাম আসতেই পারে। তবে গত কয়েক দশকে সব রেকর্ড ভেঙে নরওয়েজিয়ানদের খাবার টেবিলের শীর্ষ জায়গাটি দখল করে নিয়েছে মেক্সিকান টাকো। তবে এটি এখন আর শুধু একটি ভিনদেশি খাবার নেই, প্রতি শুক্রবার রাতে পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে টাকো খাওয়ার এই অভ্যাস এখন নরওয়ের অনানুষ্ঠানিক এক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার এই মেলবন্ধনে শামিল হন।

যেভাবে শুরু হলো এই প্রচলন

উপস্থিত প্রত্যেকে টেবিলে থাকা মাংসের কিমা, সস, সালাদ থেকে শুরু করে হরেক রকমের উপাদান থেকে নিজের পছন্দমতো টাকো সাজিয়ে নেয়। ছবি: পেক্সেলস
উপস্থিত প্রত্যেকে টেবিলে থাকা মাংসের কিমা, সস, সালাদ থেকে শুরু করে হরেক রকমের উপাদান থেকে নিজের পছন্দমতো টাকো সাজিয়ে নেয়। ছবি: পেক্সেলস

বিশ শতকের শেষের দিকে, বিশেষ করে ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালের দিকে বিশ্বায়নের হাত ধরে নরওয়েতে মেক্সিকান খাবারের আগমন ঘটে। প্রথমে বড় শহরগুলোতে চালু হয় মেক্সিকান রেস্তোরাঁ। নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন ফুড ব্র্যান্ডের স্মার্ট মার্কেটিংয়ের কল্যাণে এটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। ঐতিহাসিকভাবে নরওয়ের সমাজ কিছুটা মিতব্যয়ী ও অন্তর্মুখী। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মতো তাঁদের ‘খাবার শেয়ার’ করে খাওয়ার সংস্কৃতি ছিল না। তা ছাড়া সপ্তাহজুড়ে তাঁরা ‘মাতপাক্কে’র মতো সাধারণ শুকনো স্যান্ডউইচ খেয়েই লাঞ্চ সারেন। তাই সপ্তাহ শেষ শুক্রবার রাতটিকে তাঁরা বেছে নেন একটু আয়েশ করার জন্য। জটিল কোনো রান্নার ঝামেলা এড়িয়ে টেবিলে বসে আড্ডা দেওয়ার জন্য টাকো হয়ে ওঠে তাঁদের নিখুঁত অনুষঙ্গ।

টেবিলে আড্ডা এবং পারিবারিক বন্ধন

ফ্রেদাগস্তাকোর সুন্দর দিক হলো এর সামাজিক আবেদন। নরওয়েজিয়ানরা সাধারণত নিজেদের ব্যক্তিগত বলয় বা প্রাইভেসি নিয়ে খুব সচেতন। কিন্তু শুক্রবারের এই আড্ডায় সেই দূরত্ব গলে জল হয়ে যায়। টাকো তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ মজার। টেবিলের ওপর ছোট ছোট বাটিতে সব উপাদান সাজানো থাকে। মাংসের কিমা, সস, সালাদ থেকে শুরু করে হরেক রকমের উপাদান থেকে প্রত্যেকে নিজের পছন্দমতো টাকো নিজে অ্যাসেম্বল বা সাজিয়ে নেয়। এর ফলে চাইল্ডকেয়ার বা শিশুদের খাবার খাওয়ানো নিয়ে মা-বাবার কোনো বাড়তি চাপ থাকে না। শিশুরা খেলার ছলে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী খাবার বানিয়ে নেয়। এটি নরওয়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স বা কর্ম ও জীবনের ভারসাম্য রক্ষার উপায়। পাশাপাশি এটি পারিবারিক আড্ডার অন্যতম প্রতীক।

মেক্সিকান ক্ল্যাসিক যখন নরওয়েজিয়ান ফিউশন

নরওয়েতে কর্মব্যস্ত জীবন শেষে একটু দম নেওয়া, হাসিমুখ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে টাকো। ছবি: পেক্সেলস
নরওয়েতে কর্মব্যস্ত জীবন শেষে একটু দম নেওয়া, হাসিমুখ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে টাকো। ছবি: পেক্সেলস

আদি মেক্সিকান টাকোর চেয়ে নরওয়েজিয়ান টাকো বা ট্যাক্স-ম্যাক্স স্টাইল কিছুটা ভিন্ন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নরওয়ের মানুষ একে নিজেদের মতো করে রূপান্তর বা ফিউশন করে নিয়েছে। প্রথম দিকে সাধারণ হার্ড টাকো শেল ও গরুর মাংসের কিমা দিয়ে এটি খাওয়া হতো। বর্তমানে স্বাস্থ্যসচেতন নরওয়েজিয়ানরা মুরগির মাংস বা স্থানীয়ভাবে সুলভ তাজা মাছ ব্যবহার করছেন। এর সঙ্গে কোঁচানো লেটুস, টমেটো, টক দই এবং মেক্সিকান সালসা যোগ করেন তাঁরা। এর পাশাপাশি নরওয়েজিয়ানরা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী ছাগলের দুধের তৈরি মিষ্টি ও নোনতা স্বাদের বাদামি চিজ এবং স্থানীয় নরভেজিয়া চিজও এতে যুক্ত করছেন। বর্তমানে নরওয়েতে উদ্ভিজ্জ বা ভেগান ডায়েটের জনপ্রিয়তা বাড়ায় ভেজিটেরিয়ান টাকোর বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো।

রিচুয়াল এবং অর্থনৈতিক প্রভাব

নরওয়েতে ফ্রেদাগস্তাকো শুধু শুক্রবারের রাতের খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বৃহস্পতিবার বা শুক্রবারের শুরুতে স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকে পরিবারের সবাই মিলে টাকোর উপাদান কেনার জন্য শপিংয়ে যাওয়াটাও এই উৎসবের একটি বড় অংশ। ক্রেতাদের এই প্রবণতাকে কেন্দ্র করে নরওয়ের গ্যাস্ট্রোনমি বা রেস্তোরাঁ ব্যবসায় এক বিশাল বিপ্লব ঘটে গেছে। অসলোর মতো শহরগুলোতে এখন শুধু টাকোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্পেশালিস্ট রেস্তোরাঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের হ্যাশট্যাগগুলো ঘুরে দেখলেই বোঝা যায় এই সংস্কৃতির গভীরতা।

মেক্সিকোর সীমানা পেরিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বরফাবৃত শান্ত দেশ নরওয়েতে এসে টাকো আজ শুধু পেটের ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়, এটি হয়ে উঠেছে কর্মব্যস্ত জীবন শেষে একটু দম নেওয়া, হাসিমুখ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার এক পরম ঠিকানা।

সূত্র: দ্য লোকাল নরওয়ে, কালচার ট্রিপ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত