Ajker Patrika

জার্মানির ইতিহাসের সঙ্গে মুসলিমরা যেভাবে মিশে আছে

কাউসার লাবীব
আপডেট : ৩০ জুন ২০২৬, ১৬: ১১
জার্মানির ইতিহাসের সঙ্গে মুসলিমরা যেভাবে মিশে আছে
কোলন কেন্দ্রীয় মসজিদ, জার্মানি। ছবি: সংগৃহীত

জার্মানির কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তি, শক্তিশালী অর্থনীতি, বিশ্বখ্যাত গাড়ি শিল্প কিংবা ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রের ছবি। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই জার্মানির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, স্থাপত্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী পুরোনো।

কখনো আব্বাসীয় খলিফার উপহার হিসেবে রাজদরবারে পৌঁছেছে একটি হাতি, কখনো মুসলিম পণ্ডিতরা জ্ঞানচর্চার আলো ছড়িয়েছেন ইউরোপীয় সম্রাটদের দরবারে, আবার কখনো লাখো মুসলিম শ্রমিক নিজেদের ঘাম ঝরিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিকে গড়ে তুলেছেন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিতে। তবু আজও দেশটির মুসলিম সমাজকে নানা ধরনের বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়ার মুখোমুখি হতে হয়।

জার্মানির মাটিতে ইসলামের শিকড় বহু পুরোনো

আপনি কি জানতেন, ১৮৬৭ সালের প্যারিস প্রদর্শনীতে (Paris Exposition) প্রুশিয়া নিজের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি মসজিদকে বেছে নিয়েছিল? কিংবা বাভারিয়ার ‘সোয়ান কিং’ দ্বিতীয় লুডভিগ তাঁর প্রজাদের সঙ্গে দেখা করার সময় সুলতানের পোশাক পরতে ভালোবাসতেন, যার সঙ্গে থাকত সিসা পাইপ আর খেজুরের তৈরি কেক? খোদ শার্লেমেন (Charlemagne) নিজের কাছে ‘আবু আব্বাস’ নামের একটি হাতি রাখতেন, যা ছিল আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের দেওয়া একটি উপহার। অন্যদিকে, মুসলিম গণিতবিদ ও দার্শনিকেরা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের দরবারে অত্যন্ত সমাদৃত শিক্ষক ছিলেন এবং প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীতে একটি তাতার ইউনিটও কর্মরত ছিল।

ইতিহাসের যে দিকেই তাকাবেন, জার্মানির অতীত ইসলামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাভারিয়ান স্টেট অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রিজারভেশন অব লোকাল হিস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুডলফ নিউমায়ারও একই মত পোষণ করেন। ‘ইসলামবেরাটুং বায়ার্ন’ (বাভারিয়ায় ইসলামবিষয়ক পরামর্শ) প্রকল্পের অংশ হিসেবে নিউমায়ার সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন—‘স্বদেশ মানেই বৈচিত্র্য; যা কিছু এখানে আছে, তার সবকিছু নিয়েই আমাদের এই ঘর। আর ইসলাম এখানে রয়েছে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে।’

‘A’ (অ্যাডমিরাল) থেকে শুরু করে ‘Z’ (জেনিথ)—ইংরেজি ভাষার মতোই জার্মান ভাষাও ইসলামি বিশ্বের সঙ্গে বহু শতাব্দীর আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাক্ষী বহন করছে। আরবি উপসর্গ ‘আল’ (al) যুক্ত শব্দ—যেমন: অ্যালকোহল (Alkohol), অ্যালজেব্রা (Algebra), অ্যালম্যানাক (Almanach), অ্যালগরিদম (Algorithmus) ইত্যাদি—প্রমাণ করে যে এগুলো একদা আরব গণিতবিদ ও দার্শনিকদের হাত ধরে পাশ্চাত্য ও জার্মান ভাষায় প্রবেশ করেছিল।

জার্মানি বিনির্মাণে মুসলিমদের শ্রম ও অবদান

গ্যোতের ‘ওয়েস্ট-ইস্টার্ন ডিভান’ থেকে শুরু করে মোৎসার্টের ‘দ্য অ্যাবডাকশন ফ্রম দ্য সেরাগ্লিও’ কিংবা কার্ল মে-র ‘ওরিয়েন্ট সাইকেল’; আবার শ্বেতজিঙ্গেন প্যালেস গার্ডেনের লাল মসজিদ থেকে বার্লিনের নিউ সিনাগগ কিংবা ড্রেসডেনের প্রাক্তন তামাক কারখানা ‘ইয়োনিদজে’—১৮ ও ১৯ শতকের জার্মানদের জন্য ‘ওরিয়েন্ট’ বা প্রাচ্য ছিল অনুপ্রেরণা ও আকাঙ্ক্ষার এক অন্তহীন উৎস।

যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থান বা ‘ভিরশাফটসভুন্ডার’ (Wirtschaftswunder) ছাড়া আজকের জার্মানি কোথায় থাকত? এই অর্থনৈতিক বিপ্লবে মুসলিমরা এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তথাকথিত ‘অতিথি কর্মী’ (Guest Workers) জার্মানিতে এসেছিলেন, যাঁদের একটি বড় অংশ এসেছিলেন তুরস্ক, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া, মরক্কো এবং তিউনিসিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে।

আজ তাঁদের উত্তরসূরিরা নিজেদের উদ্যোগে কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। ধর্মনিরপেক্ষ ও আলেভি সম্প্রদায়সহ কেবল তুর্কি বংশোদ্ভূতরাই বর্তমানে জার্মানিতে ৮০,০০০-এরও বেশি কোম্পানি পরিচালনা করছেন, যা ৪ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে তাঁরা জার্মানির মূলধারার সমাজের সঙ্গে তাঁদের বা তাঁদের বাবা-মায়ের প্রাক্তন জন্মভূমির এক মজবুত সেতু তৈরি করছেন।

সামাজিক মূল্যবোধে মুসলিমদের উপস্থিতি

পরিসংখ্যান বলছে, মুসলিমদের ছাড়া বর্তমান জার্মান সমাজ কল্পনা করা অসম্ভব। জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ৫৩ থেকে ৫৬ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা দেশটির বৃহত্তম এবং সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। জার্মানির প্রথম ইসলামিক উপদেষ্টা হুসেইন হামাদান মুসলিম ও স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যকার দূরত্ব দূর করতে কাজ করছেন দীর্ঘ দিন ধরে। তিনি বলেন, ‘জার্মান মুসলিমরা রাজনীতি, মিডিয়া কিংবা বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই অবদান রাখছেন। ইসলাম এখন জার্মানির বাস্তবতারই একটা অংশ।’

স্বেচ্ছাসেবী কাজ এবং দান-সদকার ক্ষেত্রেও জার্মানির মুসলিমরা গড় হারের চেয়ে অনেক এগিয়ে। রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের সাবেক প্রকল্প অংশীদার আয়তেন কিলিচারসলান বলেন, ‘মুসলিমরা শুধু তাদের নিজস্ব কমিউনিটিতেই নয়, বরং স্কুল, বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন, খেলাধুলা এবং বয়োবৃদ্ধ, প্রতিবেশী ও শরণার্থীদের সাহায্যার্থেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।’ কিলিচারসলানের নেতৃত্বে নারীদের দ্বারা পরিচালিত দাতব্য সংস্থা ‘সোশ্যালডিন্সট মুসলিমশার ফ্রয়েন’ (SmF)-এর সঙ্গে ১,৩০০-রও বেশি মানুষ যুক্ত আছেন।

বৈষম্য যেন মুসলিমদের নিত্যসঙ্গী

জার্মানিতে ইসলামভীতি (Islamophobia) বা মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ এবং বৈষম্যের ঘটনা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ‘CLAIM’ এবং জার্মান ফেডারেল অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন এজেন্সির মতো পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকেও এর প্রমাণ মেলে। জনসমক্ষে মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিতর্ক সমাজ থেকে তাদের বাদ দিয়ে দিচ্ছে এবং এক ধরনের মুসলিমবিরোধী মনোভাবের জন্ম দিচ্ছে।

রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের অভিবাসী সমাজ বিষয়ের সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার ভলকার নুসকে বলেন, ‘বিশেষ করে হিজাব পরিহিত নারীরা প্রায়শই হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।’ নুসকে জার্মানির অভিবাসী সমাজে মুসলিমদের দৃশ্যমানতা এবং অধিকার জোরদার করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

—রবার্ট বোশ স্টিফটুং ডটডিই অবলম্বনে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত