গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীনে সরকারি সফর করেন। চলতি বছর জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। যদিও এই সফরে চীন ছিল তাঁর দ্বিতীয় গন্তব্য, তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রথম যে বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র সফর করেন, সেটি চীন। চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের নিবন্ধে বলা হয়েছে, এই সফরের প্রতীকী গুরুত্ব নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। নিবন্ধটিতে সফরের গুরুত্ব, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নানা দিক ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।
এই সফরের মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে উন্নীত করে ‘নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের জাতি’ গঠনের অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) উত্থাপনের পর এতে অংশ নেওয়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মূলত তিন ধরনের প্রবণতা দেখিয়েছে। প্রথমত, পাকিস্তানের ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের জাতি’ মডেল; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ কয়েকটি দেশের অনুসৃত ‘ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতা’ মডেল এবং তৃতীয়ত, আরেকটি দেশের অনুসৃত ‘প্রতিরোধ ও ভারসাম্য রক্ষার’ মডেল।
এখন চীন-বাংলাদেশ বিআরআই সহযোগিতাও অভিন্ন ভবিষ্যতের জাতি নির্মাণের দিকে অগ্রসর হয়েছে, যা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বিআরআইয়ের আকর্ষণকে তুলে ধরে। বাংলাদেশের কিছু গবেষক এমনও যুক্তি দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে এমন অংশীদারত্ব গঠনের অনুকূল পরিবেশ পাকিস্তানের চেয়েও বেশি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষকদের মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, সফরের ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ সামগ্রিকভাবে সন্তুষ্ট। দুই পক্ষ কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘২+২’ সংলাপ কাঠামো গঠনের সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করতে সম্মত হয়েছে। এটি দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক আস্থা ও কৌশলগত সহযোগিতা অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোতে—যার মধ্যে রয়েছে শিল্পায়ন ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সরাসরি চীন-বাংলাদেশ সংযোগ, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং বিজ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন জোরালো সমর্থন প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তারা দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের যৌথ ঘোষণাপত্র চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির দলিল এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার ফলাফল। অবশ্য এর ফলে বাংলাদেশ অন্য কিছু বৃহৎ শক্তির চাপের মুখে পড়তে পারে এবং গত কয়েক দিনে আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমে এমন আলোচনা ইতিমধ্যে দেখা গেছে। কিন্তু এই চাপ বহন করেও চীনের সঙ্গে নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের জাতি গড়ে তোলার ইচ্ছা দেখানোই প্রমাণ করে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার সত্যিকার অর্থে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর কারণ, তারা উপলব্ধি করে যে—কেবল চীনের সহায়তার মাধ্যমেই বাংলাদেশ শিল্পায়ন ও আধুনিকায়নের পথে এগোতে পারবে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাতদের দেশপ্রেম, বৈশ্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে তাঁদের বিচক্ষণ সচেতনতা এবং বাংলাদেশের পাশাপাশি বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যান্য দেশের জন্য চীনের আধুনিকায়ন পথের অনুপ্রেরণামূলক ও বাস্তব তাৎপর্য সম্পর্কে তাঁদের উপলব্ধিকেও প্রতিফলিত করে।
তবে বাংলাদেশের বন্ধুদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে, শুধু চীনের প্রতিশ্রুতি ও সহায়তা যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনই একমাত্র বৃহৎ দেশ, যারা শিল্পায়ন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তৃত শিল্পব্যবস্থার অধিকারী। চীনের শিল্পায়ন ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় নেতৃত্বে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া। প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় বড় আকারের ভারী শিল্প খাত গড়ে তোলা হয়। এরপর সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতির পর যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল, শিল্পশৃঙ্খল ও সরবরাহশৃঙ্খলের স্থানান্তরকে কাজে লাগানো হয়।
চীনের শিল্পায়নে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কোনোটিই নির্ধারক অনুসঙ্গ ছিল না। কোনো দেশের শিল্পায়ন অর্জনে বৈদেশিক শক্তি কেবল অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই দেশের নিজস্ব প্রচেষ্টা।
এই সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জাদুঘরও পরিদর্শন করেন। সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পর থেকে চীনের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ও দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে জনগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মালিকানা এবং আইনের শাসনভিত্তিক প্রশাসনের সমন্বয় অর্জন করেছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘমেয়াদি শাসন সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে। চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলোর মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রূপরেখা অনুসরণ করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতার সংকট সেখানে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, তবে দেশটি অবশ্যই শিল্পায়ন ও আধুনিকায়ন অর্জন করতে পারবে। আর বাংলাদেশের সরকার যদি জাতীয় স্বার্থে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে চীনও সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করবে।
তবে বাংলাদেশের বন্ধুদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে, শিল্পায়ন এবং আধুনিক শিল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দেশের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে শুধু উন্নত শিল্প গড়ে তোলা এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আমদানির আকাঙ্ক্ষা বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হচ্ছে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর শুধু ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রকাশ নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেরও ইঙ্গিত বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতায় আটকে আছে। ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণে ‘পূর্বমুখী নীতি’ অনুসরণ করবে, চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করবে, চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলবে এবং চীনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের সঙ্গে সহযোগিতা গভীর করতে চায়, আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যোগ দিতে চায় এবং এভাবে চীনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এশিয়াকেন্দ্রিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ারও আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। এই পুরো কূটনৈতিক পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে সত্যিকারের ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক এলিটদের তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লেখক: লিউ জংই, সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজেরও পরিচালক।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত শুরুর আগে বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তহীন যুদ্ধনীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত নব্য-রক্ষণশীল লেখক রবার্ট কাগান সতর্ক করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে এই মুখোমুখি অবস্থান আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয়গুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
২ মিনিট আগে
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে চলছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। ৪৮টি দল লড়ছে ক্রীড়া বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিরোপা জয়ের জন্য। এই ছয় সপ্তাহের আয়োজনের কেন্দ্রে আছেন ফিফা প্রধান সুইস-ইতালীয় জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আর্থিক বিচারে তাঁর নেতৃত্বাধীন মাল্টিবিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক ও ক্রীড়া সাম্রাজ্যে...
১ দিন আগে
বিশ শতকের বিজয়ী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি শুধু অতুলনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির অধিকারীই হয়নি, বরং সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থা ও স্বাধীনতার মতো বহু কাঙ্ক্ষিত মূল্যবোধেরও প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই অবস্থান স্থায়ী হয়নি।
৪ দিন আগে
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ঘোষণার পর ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং এ বছরের নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় ফেরার প্রত্যাশী নাফতালি বেনেত বেশ ক্ষুব্ধ ছিলেন। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক চুক্তি ঘোষণার পর তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এমন একটি...
৪ দিন আগে