Ajker Patrika

সীমার মধ্যে থাকলেও কেন মার্কিন রণতরিতে হামলা করছে না ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯: ৫৫
সীমার মধ্যে থাকলেও কেন মার্কিন রণতরিতে হামলা করছে না ইরান
হরমুজে মার্কিন রণতরি আব্রাহাম লিংকন। এটি ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলার মুখে ইরান পাল্টা আঘাত হানছে ঠিকই, কিন্তু তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নিচ্ছে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মতো প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোকে। মার্কিন নৌ-বহর বা ইসরায়েলি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা না চালিয়ে কেন ইরান এই কৌশলী পথ বেছে নিয়েছে, তা নিয়ে সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলটি ইরান সুচিন্তিতভাবে গ্রহণ করেছে যাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায়। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধকে এমন একপর্যায়ে না নিয়ে যাওয়া যায় যা ইরানকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।

কেন মার্কিন রণতরীতে হামলা এড়িয়ে চলছে তেহরান

সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এলিয়াস হান্না আল-জাজিরাকে জানান, মার্কিন নৌ-সম্পদ বা রণতরীতে সরাসরি হামলা চালানো ইরানের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মার্কিন রণতরীতে হামলা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।’ এ ছাড়া, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয়ে ঘেরা থাকে, ফলে সামরিকভাবে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অত্যন্ত কঠিন।

উপসাগরীয় দেশগুলো কেন লক্ষ্যবস্তু

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাঘিয়ানির মতে, ইরান মনে করে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিমান হামলা পরিচালনার জন্য কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার দাবি করে আসছে, তারা ইরানবিরোধী আক্রমণে নিজেদের ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবুও ইরান আইনগত ও কৌশলগত কারণে এই দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঘিয়ানি বলেন, ওয়াশিংটন চাচ্ছে অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়িয়ে দিয়ে ইরানের জন্য পাল্টা আঘাতের পথ কঠিন করে তুলতে।

তবে কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শায়জি ইরানের এই যুক্তিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সব বিমান হামলা পরিচালিত হচ্ছে ‘জর্জ ডব্লিউ বুশ’ ও ‘আব্রাহাম লিংকন’ নামক দুটি বিমানবাহী রণতরী থেকে, যা ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। ইরান জানে ক্রুজ ও টমাহক মিসাইলগুলো রণতরী থেকেই ছোড়া হচ্ছে, কিন্তু সেই জাহাজগুলোতে হামলা করে একজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হলেও ইরান যে পরিণতির সম্মুখীন হবে, তা তারা ভয় পায়।

তিনি মনে করেন, ইরান এখন একটি ব্যর্থ কৌশলে আটকে আছে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটনকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে চায়, কিন্তু এটি কাজ করছে না। বরং এতে করে ইরান আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

সংকীর্ণতার রাজনীতি ও আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বন্দর আল-ওতাইবি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ চায় না। তাই উভয় পক্ষই লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনে অত্যন্ত সতর্ক। ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর থেকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমানগুলো পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও ইরান সেখানে হামলা এড়িয়ে চলছে, যাতে সংঘাতের পরিধি না বাড়ে।

তবে আল-ওতাইবির সতর্কতা, ইরান যদি উপসাগরীয় কোনো দেশে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটায়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালিকে ইরান একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু বর্তমানে এটি তাদের জন্য এক ‘রাজনৈতিক দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিকভাবে, ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সামলাতে ও একতরফা ‘প্রতিরোধের সমীকরণ’ প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই কৌশল ইরানকে কোনো সামরিক সুবিধা তো দিচ্ছেই না, বরং বন্ধুহীন ও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত