Ajker Patrika

পার্লামেন্টের বাইরে ‘ককরোচ’দের ও ভেতরে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১০: ০৩
পার্লামেন্টের বাইরে ‘ককরোচ’দের ও ভেতরে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে মোদি সরকার
আজ সোমবার সংসদ অভিমুখে ককরোচদের অভিযানে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতীয় পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন গতকাল সোমবার পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ এবং ভেতরে বিরোধী দলের স্লোগানে উত্তাল পরিবেশের মধ্যেই লোকসভায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। বিরোধী দলের প্রতিবাদে অংশ না নিয়ে নিজেদের আসনে বসে থাকেন ২৬ জন সংসদ সদস্য।

সোমবার সকালে লোকসভা অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বিরোধী দলের সদস্যরা নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদানের অর্থ চুরির অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে কক্ষের ‘ওয়েল’-এ নেমে আসেন।

তবে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ২০ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য, যাঁরা ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়াতে’ (এনসিপিআই) একীভূত হয়েছেন এবং শিবসেনার (ইউবিটি) ছয়জন সংসদ সদস্য, যাঁরা একনাথ সিন্ধের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের আসনেই বসে থাকেন।

মাত্র তিন মাস আগে তৃণমূল কংগ্রেস ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে একযোগে নরেন্দ্র মোদি সরকারের আনা ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করেছিল। নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর এবং ডিলিমিটেশন বিল বাস্তবায়ন দ্রুততর করার লক্ষ্যে আনা ওই বিলটি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সমর্থনে লোকসভায় পরাজিত হয়। সোমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত মহুয়া মৈত্র ও কয়েকজন তৃণমূল সংসদ সদস্য কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে ‘ওয়েল’-এ নেমে ‘Paper Leak, Stop NEET’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদে অংশ নেন। অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের সঙ্গে নিজের আসনে বসে থাকেন।

বিদ্রোহী তৃণমূল সংসদ সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার ওম বিড়লা সপ্তাহান্তে লোকসভার আসন বিন্যাসে পরিবর্তন আনেন। নতুন আসন বিন্যাসে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী শিবিরের তৃতীয় ব্লকের সামনের সারিতে, আগে তৃণমূলের ফ্লোর লিডার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য নির্ধারিত আসনে বসানো হয়। তাঁর পাশে ছিলেন সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রধান অখিলেশ যাদব এবং ফৈজাবাদের সংসদ সদস্য অবধেশ প্রসাদ।

বিদ্রোহী তৃণমূল সংসদ সদস্যদের পাশের ব্লকে বসানো হয়। বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কাকলি ঘোষ দস্তিদার দ্বিতীয় সারিতে বসেন। বাকি বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের তাঁর পেছনের সারিগুলোতে বসানো হয়, যেখানে এনডিএ জোটের শরিক জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডি (ইউ) এবং লোক জনশক্তি পার্টির (রাম বিলাস) সংসদ সদস্যরাও ছিলেন।

প্রবীণ তৃণমূল সংসদ সদস্য সৌগত রায়কেও একই ব্লকে বসানো হয়। বিদ্রোহী সংসদ সদস্যদের থেকে তাঁকে আলাদা করেছিল মাত্র কয়েকটি আসন। তবে দিনের একাধিক মুলতবির মধ্যেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। এক পর্যায়ে সৌগত রায়কে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। গত মাসে বিদ্রোহী তৃণমূল সংসদ সদস্যরা দলত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার আগে ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বৈঠক করেছিলেন।

অধিবেশন চলাকালে মহুয়া মৈত্র তাঁর প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ডগুলো কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বেঞ্চে রেখে যান। প্রতিবার অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে তিনি এসে প্ল্যাকার্ডগুলো তুলে নিয়ে ‘ওয়েল’-এ নেমে প্রতিবাদে অংশ নেন। দস্তিদার ওই সময় নিজের আসনেই বসে থাকেন। মুলতবির সময় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাধিক বিজেপি নেতার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তৃণমূলের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন বিজেপিই এই রাজনৈতিক বিভাজনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনেও ভিন্নতা দেখা যায়। কংগ্রেস ও ডিএমকের সংসদ সদস্যরা প্রথমদিকে ‘ওয়েল’-এ নামলেও তাঁদের ইস্যু ছিল আলাদা। কংগ্রেস নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রামমন্দিরের অনুদান চুরির অভিযোগে সরকারকে ঘিরে প্রতিবাদ করে। অন্যদিকে নীল স্কার্ফ পরা ডিএমকে সংসদ সদস্যরা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কর্ণাটক সরকারের কাবেরী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।

তামিলনাড়ুতে মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর সরকার গঠনে কংগ্রেসের সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও ডিএমকের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও, অধিবেশন মুলতবির সময় ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি এবং কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈকে আলোচনায় ব্যস্ত দেখা যায়। সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্যরা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং রামমন্দিরের অনুদান বিতর্কসহ বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করলেও কংগ্রেসের সঙ্গে ‘ওয়েল’-এ নেমে প্রতিবাদে অংশ নেননি।

এনসিপির (এসপি) নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, যিনি বলেছেন সরকার সব রাজ্যে লোকসভার আসন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর নিশ্চয়তা দিলে তাঁর দল ডিলিমিটেশন বিলকে সমর্থনের বিষয়টি বিবেচনা করবে, তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের একটি নোটপ্যাডে কিছু দেখাতে ব্যস্ত ছিলেন।

এদিকে সংসদের বাইরে সিজেপির বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন ঘেরাও করেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে সংসদ কমপ্লেক্সের সব ফটক সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাইরে যেতে চাওয়া সংসদ সদস্যদের বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ভেতরে অবস্থান করতে বলা হয়।

বিরোধীদের প্রধান লক্ষ্য ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তাঁর পদত্যাগ সিজেপির অন্যতম প্রধান দাবি। দুপুরের আগে তিনি লোকসভায় প্রবেশ করলে বিরোধী সদস্যরা ‘ইস্তফা দো’ স্লোগান দেন। পরে অধিবেশন মুলতবির পর তিনি সংসদ ভবনের ভেতরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দপ্তরে যান এবং দিনের কার্যক্রম শেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।

দিন শেষে লোকসভা মুলতবি হলে সংসদের প্রথম দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য হয়ে ওঠে একসময়ের তৃণমূল সহকর্মীদের একই কক্ষে কয়েকটি আসনের ব্যবধানে বসেও পরস্পরের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না রাখা এবং বিরোধী দলের যৌথ আন্দোলনে একসঙ্গে অংশ না নেওয়ার ঘটনা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত