Ajker Patrika

ইরাকে মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী করতে ট্রাম্পের আপত্তি, বিভক্ত শিয়া জোট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরাকে মালিকিকে প্রধানমন্ত্রী করতে ট্রাম্পের আপত্তি, বিভক্ত শিয়া জোট
শিয়া রাজনৈতিক জোট ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিএফ) মনোনীত প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নুরি আল-মালিকি। ছবি: এএফপি

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নুরি আল-মালিকিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মালিকিকে বেছে নিলে ইরাকের জন্য মার্কিনি সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। এরপরই মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির ক্ষমতাসীন শিয়া জোটে কৌশলগত বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী শিয়া রাজনৈতিক জোট ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিএফ)-এর নেতারা মার্কিন হুমকির পরও নুরি আল-মালিকিকেই ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী হিসেবে রাখতে অনড়। আর গত জানুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইরাকের প্রধানমন্ত্রী থাকা আল-মালিকি আবার সেই পদে ফিরলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের জন্য সহায়তা বন্ধ করে দেবে।

ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লেখেন, ‘আমরা যদি সেখানে সহায়তা করতে না থাকি, তাহলে ইরাকের সফলতা, সমৃদ্ধি বা স্বাধীনতার কোনো সুযোগই নেই।’

আল-মালিকিকে ইরাকে ইরানের সরাসরি প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মনে করে ট্রাম্প ও মার্কিন প্রশাসন। ওয়াশিংটন মনে করে, মালিকির প্রত্যাবর্তন ইরাকে ইরানের শক্তি কমানোর মার্কিন প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করবে এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়িয়ে দেবে।

তবে ক্রমবর্ধমান এই চাপের মুখেও কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্কের প্রভাবশালী অংশ মালিকির প্রার্থিতা এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। বরং তাঁর প্রার্থিতা এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজতে তাঁরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।

২০২১ সালে গঠিত কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক (সিএফ) শিয়া জোটটি ইরাকি পার্লামেন্টের বৃহত্তম শিয়া ব্লক। তবে মার্কিন হুমকির পর এই জোটে বিভাজন দেখা দিয়েছে। একদল মালিকির পক্ষে অনড়, আরেকদল ট্রাম্পের হুমকির মুখে নতিস্বীকার করে বিকল্প প্রার্থী খুঁজতে আগ্রহী আবার অন্য একটি অংশ মালিকির বিরোধী।

গত শনিবার এক বিবৃতিতে সিএফ আল-মালিকির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা ইরাকের একটি সাংবিধানিক বিষয় এবং এটি বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত।’

এই অবস্থান সিএফ-এর একাধিক আল-মালিকি-সমর্থক শক্তির প্রতিফলন। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপ-সংসদ স্পিকার মোহসেন আল-ম্যান্ডালাওয়ি; হাদি আল-আমিরির নেতৃত্বাধীন বদর সংগঠন; এবং ধর্মীয় নেতা হুমাম হামুদির নেতৃত্বাধীন ইসলামিক সুপ্রিম কাউন্সিল।

দল নির্বাচনে সর্বাধিক ভোট পেলেও জোটের মনোনয়ন পাননি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি। তিনিও আনুষ্ঠানিকভাবে মালিকির প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যদিও তিনি নিজে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি ত্যাগ করেননি।

কুর্দি ও সুন্নি দলগুলোর সমর্থনে শিয়াদের একটি অংশ মালিকির পথ আটকে দিতে পারে। এই বিরোধী অংশে রয়েছেন আসায়িব আহল আল-হাক-এর নেতা কায়েস আল-খাজালি, ন্যাশনাল স্টেট ফোর্সেস অ্যালায়েন্সের আম্মার আল-হাকিম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি।

মালিকিকে বেছে নিলে ইরাকের ভয়াবহ ‘অর্থনৈতিক পরিণাম’ ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে আল-আবাদির নেতৃত্বাধীন ভিক্টরি অ্যালায়েন্স জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সামলানোর অক্ষমতা এবং একজন বিকল্প প্রার্থীর প্রয়োজনীয়তারই পরোক্ষ স্বীকারোক্তি।

মালিকির সামনে বাধা কেবল শিয়া কোন্দলেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরাকের সুন্নি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তাঁর বিপক্ষে। এ ছাড়া অ-শিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার বিভাজনও মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।

ইরাকি সংবিধান অনুযায়ী, প্রথমে সংসদকে একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হয়। এরপর তিনি সংসদের বৃহত্তম ব্লকের মনোনীত প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন। ২০০৩ সালের পর থেকে চালু ‘মুহাসাসা’ বা গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষমতা বণ্টন ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শিয়া, প্রেসিডেন্ট কুর্দি এবং সংসদের স্পিকার সুন্নি হওয়ার কথা।

এখনো পর্যন্ত মাসুদ বারজানির নেতৃত্বাধীন কুর্দিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (কেডিপি) এবং বাফেল তালাবানির নেতৃত্বাধীন প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) এই প্রধান কুর্দি দলগুলো সিডেন্ট পদের জন্য কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।

সিএফ কুর্দিদের মধ্যে সমঝোতা করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যে ছিল আল-সুদানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের উভয় দলের সঙ্গে বৈঠক এবং আল-মালিকির ব্যক্তিগতভাবে বারজানির সঙ্গে সাক্ষাৎ। তবে এখনো এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি। প্রেসিডেন্ট পদে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে প্রধানমন্ত্রী মনোনয়নের প্রক্রিয়াও এগোবে না।

এর বাইরে সাবেক স্পিকার মোহাম্মদ আল-হালবৌসির নেতৃত্বাধীন তাকাদুম পার্টিও মালিকির বিরোধিতায় সরব। মালিকি-বিরোধীরা একত্রিত হয়ে পার্লামেন্টের এক-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কোরাম পূর্ণ হতে বাধা দেবে।

এই অচলাবস্থা কাটাতে কোঅর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ককে হয় নতুন প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে সমঝোতায় আসতে হবে, না হয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আল-সুদানিকে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য মনোনীত করতে হবে। গত ২৮ জানুয়ারি সুদানির দল ‘যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক’ রাখার যে আহ্বান জানিয়েছে, তাঁকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে নিজের মেয়াদ নবায়নের একটি কৌশলী প্রস্তাব হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত