Ajker Patrika

চীনের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের, নতুন চুক্তির আহ্বান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চীনের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের, নতুন চুক্তির আহ্বান

চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালে গোপনে একটি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও রাশিয়াকে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিস্তৃত একটি পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির আলোচনার মধ্যে গতকাল শুক্রবার এই অভিযোগ উঠল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান শেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটি সম্প্রতি বাতিল হয়ে গেছে। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই। এমন সময়ে এই অভিযোগে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা আর ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির সীমাবদ্ধতা মানবেন না। বরং মস্কো ও বেইজিং থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় নতুন একটি চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁরা তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আবারও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে গতকাল বক্তব্য দিতে গিয়ে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট থমাস ডি-ন্যানো বলেন, ‘আজ আমি প্রকাশ করতে পারি যে, চীন পারমাণবিক বিস্ফোরণমূলক পরীক্ষা চালিয়েছে। তাদের শত শত টন পারমাণবিক শক্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আছে। ২০২০ সালের ২২ জুন চীন এমন একটি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে অবগত।’

তবে থমাস ডি-ন্যানো এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। সিএনএনকে যুক্তরাষ্ট্রের এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চীনের ২০২০ সালের ওই পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য সম্প্রতি উন্মুক্ত করা হয়েছে।

ডি-ন্যানো অভিযোগ করেন, চীনা সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে এই পরীক্ষাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করেছে, কারণ, তারা জানত যে—এসব পরীক্ষা নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করে। তিনি বলেন, চীন পারমাণবিক বিস্ফোরণগুলো ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে লুকাতে চেয়েছে।

তাঁর ভাষায়, চীন ‘ডিকাপলিং’ নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যার মাধ্যমে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণের কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে বিশ্ব তাদের কর্মকাণ্ড শনাক্ত করতে না পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিকাপলিং বলতে বোঝায়, বড় একটি গহ্বর খনন করা, যাতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনের প্রভাব কমে যায় এবং তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা গতকাল এক বিবৃতিতে জানান, তাঁদের যন্ত্রে ২০২০ সালের ২২ জুন এমন কোনো ঘটনা শনাক্ত হয়নি, যা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে।

কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার-টেস্ট-ব্যান ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিটিবিটিও) নির্বাহী সচিব রব ফ্লয়েড বলেন, পরবর্তী ও আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণেও সেই সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ফ্লয়েড জানান, সংস্থাটির আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা (আইএমএস) প্রায় ৫০০ টন টিএনটি বিস্ফোরণের সমপরিমাণ বা তার বেশি শক্তির পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষাও শনাক্ত করতে সক্ষম। তিনি উল্লেখ করেন, এই ব্যবস্থা উত্তর কোরিয়ার ঘোষিত ছয়টি পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষাই শনাক্ত করেছিল।

ডি-ন্যানোর দাবি অনুযায়ী, চীনের কথিত পরীক্ষাটির শক্তি ছিল ‘শত শত টনের মধ্যে’, তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা তিনি জানাননি। ফলে সেটি আইএমএসের শনাক্তযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল বলেন, যদি এটি খুবই কম শক্তির একটি বিস্ফোরণ হয়ে থাকে, তাহলে সম্ভব যে, সিটিবিটিওর পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলো তা শনাক্ত করতে পারেনি।

ফ্লয়েড আরও বলেন, সিটিবিটিও চুক্তিতে ছোট বিস্ফোরণ মোকাবিলার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেই ব্যবস্থাগুলো কার্যকর করা যাবে কেবল তখনই, যখন চুক্তিটি কার্যকর হবে। এই চুক্তি যেকোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বা অন্য যেকোনো পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এতে স্বাক্ষর ও অনুমোদন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও অনুমোদন দেয়নি আর রাশিয়া ২০২৩ সালে তাদের অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অতীতে বলেছিল যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার ওপর স্বেচ্ছা স্থগিতাদেশ মেনে চলছে। তবে গত বছর ট্রাম্প বলেন, ‘সমতার ভিত্তিতে’ যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা আবার শুরু করা উচিত।

গতকালের বক্তব্যে ডি-ন্যানো ইঙ্গিত দেন, চীনের কথিত এই পরীক্ষাই ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সম্মতি প্রতিবেদনে আগেও মূল্যায়ন করা হয়েছিল যে, রাশিয়া সুপারক্রিটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে পরীক্ষার ওপর থাকা স্থগিতাদেশ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।

গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে ওয়াশিংটন ডিসিতে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, চীন পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ‘প্রথম ব্যবহার না করার’ নীতি অনুসরণ করে এবং আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক কৌশল মেনে চলে। পাশাপাশি তারা পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা স্থগিত রাখার নীতিও মানে।

চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘আমরা সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, যাতে সমগ্র পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নিষেধাজ্ঞা চুক্তির কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায় এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও বিস্তাররোধ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করা যায়।’

লিউ পেংইউ সিএনএনকে আরও বলেন, আশা করা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে চুক্তির অধীনে তাদের দায়বদ্ধতা ও পরীক্ষার ওপর স্থগিতাদেশ মানবে এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও বিস্তাররোধ ব্যবস্থা, পাশাপাশি বৈশ্বিক কৌশলগত ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপ নেবে।

একটি যুগের অবসান

‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে গতকাল ডি-ন্যানো বলেন, ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সত্যিই একটি যুগের অবসান হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সংযমের শেষ। যদিও তিনি সরাসরি বলেননি যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই অতিরিক্ত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করবে, তবে তাঁর বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত ছিল।

ডি-ন্যানো বলেন, ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি কার্যকর থাকাকালে যে পারমাণবিক আধুনিকায়ন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, আমরা তা সম্পন্ন করব। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন কিছু পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের নির্দেশে উদ্ভূত নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।’

ডি-ন্যানো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও আধুনিকায়িত পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখবে, যাতে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা পায় এবং শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনা করা যায়।’

ডি-ন্যানো আরও বলেন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী যুগ চলতে পারে এবং চলা উচিত, তবে সেটির জন্য আলোচনার টেবিলে কেবল রাশিয়া নয়, আরও দেশকে যুক্ত হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে চীনকে আলোচনার টেবিলে আনবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বেইজিং ধারাবাহিকভাবে ত্রিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ওয়াশিংটন ও মস্কোর সমতুল্য নয়।

আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সিনিয়র পরিচালক ম্যাথিউ ক্রোনিগ বলেন, ‘যদি সত্যিই এটি চীনের উদ্বেগ হয়, তাহলে তারা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চাইবে না কেন? যদি তারা আমাদের অস্ত্র সীমিত করতে পারে, তাহলে সেটি তো তাদের জন্যই ভালো।’

ক্রোনিগ মনে করেন, বেইজিং আলোচনায় যেতে চায় না, কারণ, তারা একটি পরাশক্তির সমতুল্য পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলতে চায়। তারা এর পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এত অর্থ খরচ করে ও অবকাঠামো তৈরি করে তারা সেটিতে ইস্তফা দিতে চায় না।

কিছু মার্কিন কর্মকর্তার ধারণা, নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার সম্প্রসারণের পথ খুলে গেছে, যা চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে এবং সেই চাপেই বেইজিং আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারে।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল বলেন, যদি নিষেধাজ্ঞা চুক্তির কোনো লঙ্ঘন ঘটে থাকে, তা অবশ্যই গুরুতর সমস্যা। কিন্তু শুধু অভিযোগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনার মতো ‘যুক্তিসংগত উদ্যোগ’ নেওয়ার আহ্বান জানান।

কিমবল আরও বলেন, এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার এমন কোনো কারণ নেই, যার জন্য তারা নিউ স্টার্টের কেন্দ্রীয় সীমাবদ্ধতাগুলো রক্ষা করতে পারবে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত