Ajker Patrika

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে নজিরবিহীন দাবানল, চলছে নির্বিচার গ্রেপ্তার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে নজিরবিহীন দাবানল, চলছে নির্বিচার গ্রেপ্তার
দাবানল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। ছবি: এএফপি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলতি গ্রীষ্মে সবচেয়ে বিধ্বংসী দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স। ইতিমধ্যে ৩ লাখ একরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অভূতপূর্ব এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে ফরাসিদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কেন এই বিপর্যয়?

বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি এই দাবানলের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। তবে ফরাসি সরকারের রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা—দেশের প্রতি ১০টি দাবানলের ৯টিই মানুষের অসাবধানতা বা প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুত ছিল না ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার। তবে নিজেদের প্রস্তুতিহীনতার সমালোচনার মধ্যেই দোষীদের চিহ্নিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে প্যারিস।

দাবানল ছড়ানোর অভিযোগে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ৪২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে ১৬৬ জন কিশোর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের ভার এলাকায় মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ১০টি স্থানে ইচ্ছাকৃত আগুন লাগানোর অভিযোগে ২৩ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ ৫০ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা) জরিমানা হতে পারে।

অন্যান্য মামলায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে সাজা দেওয়া হচ্ছে। ভোগেস অঞ্চলের একটি বনে আগুন লাগানোর ঘটানোর অপরাধে এক ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যদিও স্থানীয় সংবাদপত্র লেক দ্য রিপাবলিকান-এর মতে, আগুনে পুড়েছিল মাত্র কয়েক বর্গমিটার এলাকা।

বিচার ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

সরকারের এই কঠোর মনোভাব সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে না। অনেকের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়া অতিরিক্ত কঠোর এবং অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। খবর পাওয়া গেছে, জ্বলন্ত সিগারেটের অংশ ফেলার অভিযোগে একজন গৃহহীন ব্যক্তি এবং গুরুতর অটিজমে আক্রান্ত একজনকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

একাধিক আসামির আইনজীবী মুরিয়েল গেস্তাস বলেন, ‘গ্রেপ্তারের সংখ্যা দেখে আমি স্তম্ভিত। এটি অতিরিক্ত মনে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, অভিযোগগুলোর অধিকাংশেরই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আদালতে টেকানো কঠিন হবে।

ফরাসি প্রভাবশালী দৈনিক ল্য মন্দ পুলিশের তদন্তের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ঠিক কীভাবে এসব অপরাধীর জড়িত থাকার সত্যতা যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে পত্রিকাটিতে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে বর্দোর প্রসিকিউটর রেনোদ গোদেল সরকারের এই কঠোর নীতিকে সমর্থন করে বলেন, ‘বনাঞ্চলে জ্বলন্ত সিগারেট ফেলা বা বারবিকিউ করার অর্থ জীবনের ঝুঁকি তৈরি করা। বর্তমান খরা পরিস্থিতিতে ছোট্ট একটা স্ফুলিঙ্গ থেকেই বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সূচনা হতে পারে।’

আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে প্রযুক্তি ও ‘থার্টি রুল’

দাবানল নিভে যাওয়ার পর তার উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জটিল এক কাজ। তদন্ত কর্মকর্তা এরিক দ্যুফায়ে জানান, খরা মৌসুমে শুধু একটি লাইটারই যেকোনো বনাঞ্চল জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তদন্তকারীরা প্রথমে পোড়া এলাকার সীমানা চিহ্নিত করেন। যদি বাতাস একমুখী হয়, তবে পোড়া অংশটি ইংরেজি ‘V’ অক্ষরের মতো আকার ধারণ করে। সেই সূত্র ধরে পেছনের দিকে হেঁটে আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎস বিন্দুতে পৌঁছান বিশেষজ্ঞরা।

এরিক বলেন, ‘কেউ ইচ্ছাকৃত আগুন দিলে একাধিক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে, যা থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ নমুনা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ বা নাশকতার সংখ্যা সামগ্রিক দাবানলের তুলনায় কম। অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ড অসাবধানতা, নির্মাণকাজ, তারের ত্রুটি, সিগারেটের টুকরা কিংবা খোলা জায়গায় বারবিকিউ করার কারণে। সিগারেট থেকে আগুন লাগার ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা ‘৩০-এর নিয়ম’ ব্যবহার করেন: তাপমাত্রা হতে হবে অন্তত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা হতে হবে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ। বাতাসের গতিবেগ হতে হবে ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের কম। সিগারেটের অন্তত ৩০ শতাংশ অংশ জ্বলন্ত অবস্থায় অবশিষ্ট থাকতে হবে। বর্তমান চরম খরার পরিস্থিতিতে এই শর্তগুলো পূরণ হলে খুব সহজেই তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

কেন আগুন লাগায় মানুষ?

প্যারিস সেভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিশেল ল্যজোয়ার মতে, যারা বনে আগুন লাগায় তাদের প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:

অসাবধান ব্যক্তি: সচেতনতার অভাবে যারা দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগায়।

স্বার্থান্বেষী: বিমার টাকা বা আর্থিক সুবিধার আশায় যারা আগুন দেয়।

পাইরোম্যানিয়াক: এটি এক ধরনের বিরল মানসিক ব্যাধি। এই রোগীরা আর্থিক লাভ বা প্রতিশোধের জন্য নয়, বরং স্রেফ আগুন দেখতে ভালোবাসে বলে আগুন লাগায়।

আইনজীবী মুরিয়েল গেস্তাস জানান, কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপক কর্মীরাও অগ্নিকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। নিজেদের ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে জাহির করা বা অতিরিক্ত কাজের জন্য করমুক্ত ওভারটাইম ভাতাই তাঁদের মূল প্ররোচনা হিসেবে কাজ করে।

সামনে নতুন তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস থাকায় ফ্রান্স জুড়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। পরিবেশ, পর্যটন, বসতবাড়ি ও স্থানীয় অর্থনীতির যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন এক চ্যালেঞ্জ।

সমালোচনার জবাবে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ‘আমাদের ভিন্ন ধরনের বন গড়ে তুলতে হবে যা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। পর্যালোচনা ও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় সামনে আসবে, তবে এই মুহূর্তে পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত