
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দৃঢ়সংকল্প নিয়ে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের নামে প্রচারিত এক কথিত উদ্ধৃতি আবারও ব্যবহার করেছেন। অথচ ওই বক্তব্যের কোনো শনাক্তযোগ্য প্রাথমিক উৎস (প্রাইমারি সোর্স) ছিল না এবং পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, উদ্ধৃতিটির সূত্র ছিল এক ভারতীয় ইসরায়েলপন্থী এক্স অ্যাকাউন্ট।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যানের অনুসন্ধানে জানা যায়, ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলিদের সতর্ক করতে নেতানিয়াহু এক সরকারি ভাষণে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান আহমাদ ভাহিদির নামে প্রচারিত ওই কথিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলেন।
ওয়াইনেটের অনুসন্ধানে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সূত্র হিসেবে উঠে আসে ‘রিতিকা’ নামের এক ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও ইসরায়েলপন্থী এক্স অ্যাকাউন্ট। ওই অ্যাকাউন্টটি ৫ আগস্ট কথিত উদ্ধৃতিটি পোস্ট করেছিল।
ভাহিদির নামে পোস্টটিতে বলা হয়েছিল, ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। যত দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে, তত দিন আমরা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সেগুলো তৈরির কাজ চালিয়ে যাব। তারা নিরস্ত্র হলে আমরাও নিরস্ত্র হব।’
ওয়াইনেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, পোস্টটি প্রকাশের পর উদ্ধৃতিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এর প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর ‘মোসাদ কমেন্টারি’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টও দাবিটি পুনরাবৃত্তি করে। অ্যাকাউন্টটি নিজেকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একটি অনানুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ওই অ্যাকাউন্টের অনুসারীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।
অ্যাকাউন্টটি লিখেছিল, ‘কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হবে না। যত দ্রুত আমরা এটা বুঝতে পারব, ততই ভালো।’ এরপর তারা ভাহিদির নামে প্রচারিত কথিত বক্তব্যটি উদ্ধৃত করে। অ্যাকাউন্টটি আরও লিখেছিল, ‘এই শাসকগোষ্ঠী তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে না। তারা সময় কিনছে। কোনো চুক্তি হবে না।’
ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-ও ভাহিদির নামে প্রচারিত কথিত বক্তব্যটি পুনরাবৃত্তি করে। চ্যানেলটি এটিকে ইরানের কোনো কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন ‘প্রথম সরাসরি স্বীকারোক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে। তবে ওই উদ্ধৃতির কোনো প্রাথমিক উৎস তারা দেয়নি। চ্যানেল ১৪ নিউজকে ইসরায়েলে ব্যাপকভাবে নেতানিয়াহু ও তাঁর উগ্র-ডানপন্থী সরকারের মুখপাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক বছরে ইসরায়েলি সরকার চ্যানেলটিতে বাণিজ্যিক সম্প্রচারের জন্য কয়েক মিলিয়ন শেকেল ব্যয় করেছে। ওয়াইনেট জানায়, এরপর নেতানিয়াহুর বড় ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু ওই দুই ইসরায়েলি অ্যাকাউন্টের পোস্ট পুনরায় শেয়ার করেন। এক্সে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। ইয়াইর নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। বহু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ইয়াইর ও তার মা সারা নেতানিয়াহুর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বড় ছেলে উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতি ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের জন্য তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের কারণে পরিচিত। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির বহু সদস্যও তার অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করেন।
এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর জেরুজালেমে এক সরকারি অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু নিজেই ওই কথিত বক্তব্যের উল্লেখ করেন। ওয়াইনেটের অনুসন্ধান অনুযায়ী নেতানিয়াহু বলেন, ‘আজ আমরা রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার ভাহিদিকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে শুনেছি যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে—‘চালিয়ে যাব’, যেমন তিনি বলেছেন।’
এরপর কথিত উদ্ধৃতিটি যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াইনেটের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ চ্যানেল ১৪-এর প্রতিবেদনটি পুনরায় পোস্ট করেছিলেন, যদিও পরে সেটি মুছে দেন। মার্কিন রক্ষণশীল ভাষ্যকার মার্ক লেভিনও প্রতিবেদনটি পুনরায় পোস্ট করেন।
পরে ফক্স নিউজ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যে, ভাহিদি বলেছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাবে। পরে সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদন সংশোধন করে জানায়, ওই বক্তব্য ‘আগে প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছিল এবং এই সপ্তাহে করা মন্তব্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।’
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে কথিত উদ্ধৃতিটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের মধ্যে ইয়াকভ বারদুগো ও আভিশাই বেন হাইমও ইসরায়েলি টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর সতর্কবার্তাটি পুনরাবৃত্তি করেন বলে ওয়াইনেট জানায়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফারসি ভাষার এক্স অ্যাকাউন্টও ভাহিদিকে ঘিরে নেতানিয়াহুর বক্তব্য পোস্ট করে।
ভারতীয় এক্স অ্যাকাউন্টে মূল পোস্টটি প্রকাশের প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর ফক্স নিউজ ভাহিদির কথিত বক্তব্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, এই বক্তব্য ‘উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনাকে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেওয়া পিছিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করছে।’
দুই দিন পর ফক্স নিউজ তাদের প্রতিবেদন সংশোধন করে জানায়, ভাহিদির মন্তব্য ‘আগে প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছিল এবং এই সপ্তাহে করা মন্তব্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।’ ফক্স নিউজের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের দুই ঘণ্টা পর ভারতের অন্যতম প্রধান সংবাদ সংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে একই দাবি পুনরায় প্রচার করে।
ওয়াইনেটের মতে, ভাহিদির নামে প্রচারিত কথিত উদ্ধৃতিটি নেতানিয়াহুকে এমন একটি দাবি জোরদার করতে সহায়তা করেছে যে, ইরান একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়। এ সময় এমন প্রতিবেদনও ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো চুক্তি হওয়ার বিরোধিতা করছেন নেতানিয়াহু।
জুন মাসে চ্যানেল ১৪ নিউজকে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘আমি যতদিন প্রধানমন্ত্রী থাকব, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’ তিনি আরও দাবি করেছিলেন যে ইরানের কাছে পারমাণবিক বোমা রয়েছে—এমন দাবি করে তিনি ইসরায়েলকে ‘দুবার ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন’।
ওয়াইনেট নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি যে নেতানিয়াহু বা তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল ভাহিদির কথিত উদ্ধৃতিটি ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল কি না। তবে অনুসন্ধানটি ‘অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিচিত কয়েকটি লক্ষণের’ দিকে ইঙ্গিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর আগেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নেতানিয়াহুর কার্যালয় যুক্তরাজ্যভিত্তিক জিউইশ ক্রনিকল এবং জার্মানির বিল্ড সংবাদপত্রকে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই তথ্যে দাবি করা হয়েছিল, হামাস ইসরায়েলি জিম্মিদের রাফাহ ও মিসরের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে ইরানে পাচার করার পরিকল্পনা করছে। গাজার রাফাহে সামরিক অভিযানকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে জনমত গঠনে শ্রেণিবদ্ধ নথি ফাঁস করার অভিযোগেও নেতানিয়াহুর দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
ওয়াইনেটের অনুসন্ধানে বলা হয়, সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে যে ইসরায়েলি প্রভাব বিস্তারকারী কার্যক্রমের লক্ষ্য ক্রমেই ইসরায়েলের বাইরের দর্শকরাও হয়ে উঠছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। গাজা ও ইরানে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের রাজনীতিকদের সমালোচনা বাড়ার মধ্যেই এমন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত মাসে ভারতে ইরানের দূতাবাসও দেশটির সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ইরানকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তোলে। দূতাবাস বলেছিল, ‘ভুয়া ও বানোয়াট সংবাদ প্রচার করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের উচিত নয় জনগণের আস্থা ও নিজেদের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে আপস করা।’ দূতাবাস আরও বলেছিল, তারা আশা করে সংবাদমাধ্যমগুলো ‘বাহ্যিক প্রচারণার প্রচেষ্টায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকবে’।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। তবে তেহরান একই সঙ্গে জানিয়েছে—কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে...
২ ঘণ্টা আগে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক চুক্তির প্রচেষ্টা থেকে সরে আসতে প্রস্তুত হতে পারেন। তবে তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ইতালির সিসিলি দ্বীপের উপকূলে ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি প্রাচীন রোমান জাহাজের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পেয়েছেন ডুবুরিরা। জাহাজটিতে অক্ষত অবস্থায় থাকা শত শত মাটির পাত্র বা অ্যাম্ফোরা পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব পাত্রে প্রাচীনকালে মদ, জলপাই তেল ও শস্য পরিবহন করা হতো।
১২ ঘণ্টা আগে
চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় দেশটির ক্রমবর্ধমান ভূমিকা বিদেশি তরুণ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করছে। তবে চীনে চাকরি পাওয়া গেলেও সেটিকে বৈধভাবে করার অনুমতি বা ওয়ার্ক ভিসা পাওয়া অনেকের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে