Ajker Patrika

বিবিসির পর্যবেক্ষণ /হুতি কারা, তারা কী চায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ৩৮
হুতি কারা, তারা কী চায়
ছবি: বিবিসি

ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাশাপাশি লোহিতসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে নিয়েছে। তাদের দখলে যাওয়া এলাকার মধ্যে রয়েছে মোকা বন্দর, যা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জাহাজ চলাচল করে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং তেলের দামও বেড়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে চার বছরের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর হুতিদের অগ্রযাত্রায় উভয় পক্ষের শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, নতুন করে তীব্র সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হুতি বিদ্রোহীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

কারা এই হুতি

হুতিরা উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন। তারা ইয়েমেনের শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘু জাইদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর অনুসারী’। ১৯৯০-এর দশকে সংগঠনটির উত্থান ঘটে এবং প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুতির নাম থেকেই ‘হুতি’ নামটি এসেছে। ২০০৪ সাল থেকে তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুতি সংগঠনটির কার্যত নেতা।

২০০০-এর দশকের শুরুতে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে হুতিরা। উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের ঘাঁটি এলাকায় অধিক স্বায়ত্তশাসন ছিল তাদের অন্যতম দাবি। ২০১১ সালের আরব বসন্তের গণ-অভ্যুত্থানের পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়লে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে হুতিরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পরে তারা রাজধানী সানা দখল করে নেয়।

বর্তমানে তারা ইয়েমেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করলেও দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করে বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। গত বছর হুতিদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল বলে অনুমান করা হয়।

হুতিদের অন্যতম দাবি হলো—সৌদি আরবের অবরোধের অবসান, পুরো ইয়েমেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত রাজস্বে প্রবেশাধিকার।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

ইয়েমেনে হুতিদের শক্তিশালী হয়ে ওঠাকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা হিসেবে দেখে সৌদি আরব। ২০১৫ সালে রিয়াদ কয়েকটি আরব দেশকে নিয়ে জোট গঠন করে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।

তবে বছরের পর বছর বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধ চালিয়েও হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বড় অংশ পুনর্দখল করা সম্ভব হয়নি। বরং যুদ্ধ ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করে। ২০২২ সালে সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা ইসরায়েল এবং লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েলসহ পশ্চিমা দেশগুলো সামরিক পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে পারস্পরিক হামলা বন্ধের সমঝোতা হলেও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হুতিরা আবার ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণ

গত জুলাইয়ে হুতি ও সৌদি আরবের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভাঙতে শুরু করে। হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে এবং দেশটির বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিতসাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।

এরপর সেপ্টেম্বরে দ্রুত অভিযান চালিয়ে হুতিরা লোহিতসাগরের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার উপকূল ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর ফলে কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

হুতিরা অবশ্য দাবি করেছে, সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের লক্ষ্য নয়। তবে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক

সৌদি আরব ও পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে ইরান জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুতিদের ড্রোন, ক্রুজ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

২০২৪ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেলও জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাওয়ার ফলে হুতিরা একটি শক্তিশালী সামরিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাসে কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান অতীতে হুতিদের কাছে তৈরি করা অস্ত্র পাঠালেও সাম্প্রতিক সময়ে অস্ত্রের বিভিন্ন অংশ পাঠিয়ে ইয়েমেনেই সেগুলো সংযোজনের সুযোগ করে দিচ্ছে এবং আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও সরবরাহ করছে।

তবে ইরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, তারা হুতিদের কেবল রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত