
মাত্র ৬২ দিনে সংক্রামক রোগ হাম ও এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে চার শ ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক দশকে এত অল্প সময়ে সংক্রামক কোনো রোগে এত বেশি শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্বেই সম্পূর্ণ নতুন রোগ করোনা সংক্রমণের শুরুর প্রথম নয় সপ্তাহে (৬৩ দিন) দেশে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় সোয়া তিন শ মানুষের। সম্ভাব্য প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গুতেও এত কম সময়ে মৃত্যুহারের এমন দ্রুত বৃদ্ধি বা তীব্রতা দেখা যায়নি।
রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, করোনা, ডেঙ্গু ও হামের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও স্বল্প সময়ে হামে মৃত্যুর এই দ্রুত বৃদ্ধি সংক্রমণের তুলনামূলকভাবে বেশ উঁচু গতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও লক্ষণীয় তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।
দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। মার্চে এসে অতি সংক্রামক এই রোগের বিস্তার আরও বাড়তে থাকে। সরকার ১৫ মার্চ থেকে প্রতিদিন হালনাগাদকৃত হামের তথ্য প্রকাশ করছে। যেখানে নিশ্চিত রোগী, উপসর্গজনিত রোগী ও মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের বাইরে সারা দেশে আরও অনেক মৃত্যু ও রোগী থাকতে পারে, যা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে অনগ্রসর ও প্রত্যন্ত এলাকায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গে গতকাল শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায়
আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। ১০৮ শিশুর ক্ষেত্রে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এতে এ সময়ে মোট আক্রান্ত ও উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯টি।
সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ শিশুর। মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৩টি।
অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৬ হাজার ৫৭২ শিশুর শরীরে। তাদের মধ্যে ৪১ হাজার ২৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৩৬ হাজার ৬৪৫ শিশু চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। একই সময়ে ৭ হাজার ৫২৪ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।
বিভিন্ন রোগের প্রকৃতি, বিস্তারের ধারা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভিন্ন হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বল্প সময়ে মৃত্যুর ‘তীব্রতা’ বা ‘আউটব্রেক ইনটেনসিটি’ বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি নির্ধারণ করেন। নতুন বা পুনরায় সক্রিয় হওয়া সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক সপ্তাহে মৃত্যু বৃদ্ধির গতি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবকে কোভিড-১৯ ও অন্যান্য বড় প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক ধাপের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি দেখা দেয়। বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয় সে বছরের ৮ মার্চ এবং প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। রোগটি নতুন হওয়ায় শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশিকা ছিল না। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার প্রোটোকল নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। করোনায় গুরুতর ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দিলেও স্বল্প সময়ে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম ৯ সপ্তাহে করোনায় ৩১৪ জনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ক্রমে বাড়লেও তার গতি সাধারণত ধীর। দীর্ঘ সময়জুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের দীর্ঘস্থায়ী ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় যেমন ঘটেছিল। এ সময় সোয়া তিন লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যু ঘটে ১ হাজার ৭০৫টি। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বছরজুড়ে ওঠানামা করেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেই বিবেচিত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ সাধারণত ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায় বলে মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর বিপরীতে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণের ভাষায় একে ‘র্যাপিড স্পাইক’ বলা হয়। এ ধরনের দ্রুত ঊর্ধ্বগতি সাধারণত টিকাদান কভারেজে ঘাটতি, রোগীর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসাসেবায় বিলম্বের ইঙ্গিত দেয়।
রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম, কোভিড-১৯ ও ডেঙ্গুর সংক্রমণপথ ও রোগতাত্ত্বিক প্রকৃতি ভিন্ন হলেও প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা ও সময়ভিত্তিক বিস্তার বিশ্লেষণে এগুলোর তুলনামূলক অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) পরিচালক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, ‘কোভিড-১৯, ডেঙ্গু ও হাম—এই তিনটি সংক্রামক রোগের প্রকৃতি একেবারেই ভিন্ন হওয়ায় একই সময়সীমায় তাদের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ধারা সরাসরি তুলনা করা যায় না। কোভিড-১৯ সব বয়সের মানুষের মধ্যে দ্রুত বিস্তার লাভ করে একটি নতুন মহামারি তৈরি করেছিল, ডেঙ্গু মূলত মশাবাহিত এবং পরিবেশ ও শহরকেন্দ্রিক মৌসুমি রোগ হিসেবে দীর্ঘ সময়জুড়ে ওঠানামা করে, আর হাম প্রধানত শিশুদের মধ্যে অত্যন্ত সংক্রামক একটি টিকা-নির্ভর প্রতিরোধযোগ্য রোগ।’
ডা. বেন্নূর বলেন, ‘টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি, শিশুদের অপুষ্টি ও মাতৃদুগ্ধ গ্রহণের হার কমে যাওয়া হামের সংক্রমণ ও জটিলতা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে স্বল্প সময়েই রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।’
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘করোনা, ডেঙ্গু ও হামের এপিডেমিওলজি ভিন্ন হলেও স্বল্প সময়ে মৃত্যুর ধারা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সৃষ্ট চাপ বিশ্লেষণে তুলনা করা যায়। কোভিড-১৯ ছিল সম্পূর্ণ নতুন রোগ, শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশিকা না থাকায় বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে নির্দেশিকা তৈরি হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আবার পুরোনো রোগ হওয়া সত্ত্বেও ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।’
হামের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. ফয়েজ বলেন, ‘এটি শিশুদের রোগ এবং সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। টিকাদানের ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা ও মাতৃদুগ্ধপান কমে যাওয়ায় সংক্রমণ ও জটিলতা বাড়ছে। বাংলাদেশে রোগ প্রতিরোধ, নজরদারি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে। প্রতিরোধ, টিকাদান এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদার না থাকায় স্বল্প সময়েই বড় সংকট তৈরি হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক বা মহামারিজাতীয় রোগগুলোর তুলনা করা হয় রোগের তীব্রতা নয়, বরং সংক্রমণ ও মৃত্যুর সময়ভিত্তিক গতি বোঝার জন্য। অর্থাৎ কোনো রোগ স্বল্প সময়ে কত দ্রুত স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে—এটি বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাম, কোভিড ও ডেঙ্গু—তিনটি রোগই স্বল্প সময়ে মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করেছে। ডেঙ্গু ও হাম পরিচিত ও প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর হার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা, রেফারেল ব্যবস্থার ঘাটতি এবং স্তরভিত্তিক চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী দেরিতে চিকিৎসা পায়। ফলে জটিলতা ও মৃত্যু বাড়ে। কোভিডের সময় আইসিইউ ও অক্সিজেন-সংকট এবং ডেঙ্গু ও হামের ক্ষেত্রে শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যার চাপ—সবই প্রস্তুতির ঘাটতি প্রকাশ করেছে।’
ডা. মুশতাক পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু অনেক কমানো সম্ভব। স্বল্প সময়ে মৃত্যুর তুলনামূলক বিশ্লেষণ মূলত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি যাচাইয়ের একটি উপায়। অতীতের শিক্ষা কাজে না লাগালে ভবিষ্যতে আবারও বড় জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হতে পারে।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড কমিউনিটি পেডিয়াট্রিকস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘হামসহ কিছু সংক্রামক রোগ দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রিত বা প্রায় নির্মূল হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে এসব রোগের বাস্তব ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব কমে গেছে। ফলে নতুন চিকিৎসকদের মধ্যে রোগ শনাক্ত ও জটিলতা ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’
ডা. জিয়াউল ইসলাম নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে এতে ‘নির্মূল’ বিবেচিত রোগও আবার দেখা দিলে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যাবে।

উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক রোগ। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ‘বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এই মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আজ শনিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
৭ ঘণ্টা আগে
গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে দেশে আরও দুই শিশু মারা গেছে। এ সময়ে ৯৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আর হামে আক্রান্ত হয়েছে ১০৮ শিশু। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আজ শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ১ হাজার ৬৯ শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে।
১১ ঘণ্টা আগে
একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে যখন আমরা পরিবেশের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করি, তখন অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচের জগৎটাকেও আমাদের বিশ্লেষণ করতে হয়। আর্দ্রতা ও উচ্চ তাপমাত্রা কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
১৬ ঘণ্টা আগে
গর্ভকাল একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে মা ও অনাগত সন্তানের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি খাবারের পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতির দিকে বাড়তি নজর জরুরি। সামান্যতম অসতর্কতা অনেক সময় বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
১৭ ঘণ্টা আগে