Ajker Patrika

গ্রীষ্ম ও বর্ষার সন্ধিক্ষণে জীবাণুর সংক্রমণে যা করতে হবে

ডা. কাকলী হালদার
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১২: ০০
গ্রীষ্ম ও বর্ষার সন্ধিক্ষণে জীবাণুর সংক্রমণে যা করতে হবে

দাবদাহের পর একপশলা বৃষ্টি যেমন স্বস্তি নিয়ে আসে, তেমনি প্রকৃতিতে অণুজীবের বংশবিস্তারের জন্য তৈরি করে এক অনুকূল পরিবেশ। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ হওয়ায় বছরের এই সময়ে, অর্থাৎ গরম ও বর্ষার সন্ধিক্ষণে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হারে বেড়ে যায়।

একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে যখন আমরা পরিবেশের তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করি, তখন অণুবীক্ষণযন্ত্রের নিচের জগৎটাকেও আমাদের বিশ্লেষণ করতে হয়। আর্দ্রতা ও উচ্চ তাপমাত্রা কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

পানিবাহিত রোগের বিস্তার

এই সময়ে আমাদের দেশে যে সমস্যা বেশি দেখা দেয়, তা হলো পানিবাহিত রোগ। বৃষ্টির কারণে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো অনেক সময় দূষিত হয়ে পড়ে; বিশেষ করে শহরাঞ্চলে স্যুয়ারেজ লাইনের সঙ্গে খাওয়ার পানির লাইনের সংযোগ ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা

থাকে। এ থেকে ছড়াতে পারে নানা ধরনের রোগ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—

টাইফয়েড: সালমোনেলা টাইফি নামের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায় এই রোগ। দীর্ঘমেয়াদি জ্বর ও শারীরিক দুর্বলতা এর প্রধান লক্ষণ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি বড় সমস্যা। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে এটি এখন মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট হয়ে উঠেছে।

কলেরা ও ডায়রিয়া: ভিব্রিও কলেরা ব্যাকটেরিয়া, রোটা ভাইরাসসহ বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস দূষিত পানি ও বাসি খাবারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষায় পানির উৎসগুলো সহজে দূষিত হয়। তাই এই সময় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়।

ভেক্টর-বর্ন বা মশাবাহিত রোগ: গরমের সময় থেকে এডিস মশার বংশবিস্তার শুরু হলেও বর্ষার জমানো পানি এদের প্রজননের জন্য স্বর্গরাজ্য।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া: বর্তমানে বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য-সংকট। গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। মশা কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাসটি রক্তে ঢোকে এবং প্লাটিলেট কমিয়ে দেয়, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ম্যালেরিয়া: দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বর্ষার সময় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। প্লাজমোডিয়াম নামক পরজীবী অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

খাদ্যে বিষক্রিয়া ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাবারে খুব দ্রুত ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক জন্মায়। একে আমরা ফুড পয়জনিং বলি। খোলা জায়গায় রাখা খাবার বা রাস্তার পাশের শরবত এই সময়ের প্রধান শত্রু। স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস বা ব্যাসিলাস সেরিয়াসের মতো ব্যাকটেরিয়া খাবারে টক্সিন বা বিষ তৈরি করে, যা বমি ও পেটের সমস্যা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, ত্বকের ওপর ছত্রাক বা ফাঙ্গাসের সংক্রমণ (যেমন দাদ বা ঘামাচিজনিত সংক্রমণ) এই সময়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে। স্যাঁতসেঁতে ভেজা কাপড় বেশিক্ষণ পরে থাকলে ত্বকে অণুজীবের বংশবিস্তার সহজ হয়।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ও শ্বাসনালির সংক্রমণ

অনেকে মনে করেন, ঠান্ডা লাগা শুধু শীতের রোগ। কিন্তু বর্ষার শুরুতে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন এবং হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার কারণে সিজনাল ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের দাপট বাড়ে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ এ সময় দেখা যায়।

প্রতিরোধ ও সচেতনতা

সংক্রমণ শুধু চিকিৎসা দিয়ে নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না জীবাণুর বিস্তার চক্রকে আমরা বাধাগ্রস্ত করতে পারি। প্রতিরোধই এখানে শ্রেষ্ঠ উপায়। এ জন্য যা করতে হবে—

» পানি ফুটিয়ে পান করা এখন সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। অন্তত ২০ মিনিট ফুটানো পানি ঠান্ডা করে পান করুন। শহরের জমানো ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।

» হাত ধোয়া শুধু একটি অভ্যাস নয়, এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। খাবার খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে পারলে ৮০ শতাংশ পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

» বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, টায়ার কিংবা ফুলের টবে তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার করা অথবা ফুলহাতা জামা পরা উচিত।

» এই সময়ে বাইরের কাটা ফল, রাস্তায় তৈরি শরবত বা খোলা খাবার পুরোপুরি বর্জন করুন। ঘরে তৈরি খাবার বেশিক্ষণ বাইরে না রেখে ফ্রিজে সংরক্ষণ করুন।

» অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধ করুন। ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেকে ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করেন। তবে মনে রাখতে হবে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়; বরং এর ভুল ব্যবহারে শরীরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে সাধারণ অসুখকেও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে।

গরম ও বর্ষার এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং চারপাশের পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়াই সুস্থ থাকার একমাত্র পথ। অসুস্থতা অনুভব করলে ফার্মেসি থেকে নিজে ওষুধ না কিনে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করানো জরুরি।

ডা. কাকলী হালদার

সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত