Ajker Patrika

বৃষ্টি-ঢলে ডুবে যাচ্ছে হাওরের ধান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বৃষ্টি-ঢলে ডুবে যাচ্ছে হাওরের ধান
কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে থাকা হাওরের ধান কেটে নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষক। গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। ছবি: জুয়েল আহমদ

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হাওরাঞ্চলে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা-কাঁচা বোরো ধান এখন পানির নিচে। কৃষকের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর ঋণের টাকায় বোনা স্বপ্ন। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে ফসল ঘরে তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।

হাওরে যখন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে ধান, তখন সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনায় বন্যার আশঙ্কাও জোরালো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তারা বলছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় ও উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর প্রভাবে আগামী তিন দিনের মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে কৃষি বিভাগের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ থাকলেও শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিশোরগঞ্জে ৯১৭ হেক্টর জমির বোরো ডুবেছে

টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলায় বিস্তীর্ণ হাওরের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় কৃষি বিভাগের সর্বশেষ দেওয়া তথ্যমতে, অতি বৃষ্টির কারণে ৯১৭ হেক্টর বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, নিকলীতে ৪৫ হেক্টর, অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর, সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর, করিমগঞ্জে ১২ হেক্টর এবং তাড়াইলে ১৫ হেক্টর বোরো ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

মিঠামইনের আবদুল্লাপুর হাওরে ১০ একর জমিতে আবাদ করা রতন মিয়ার (৬৫) চোখে শুধুই অন্ধকার। মহাজনের ঋণের টাকা কীভাবে শোধ হবে আর সারা বছর পরিবার কী খাবে—সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি। একই দশা কাবিল মিয়ার। আধা পাকা কালো হয়ে যাওয়া ধান হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে ধান নষ্ট অইয়া যাইতাছে, কইলজাডারে মানাইতে পারতেছি না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, ধানগাছ ৫-৬ দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি বাড়বে।

মৌলভীবাজারে হাওর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

বৃষ্টি ও ঢলে মৌলভীবাজারের হাওর ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকেরা জানান, গত দুই দিনের অব্যাহত বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে আগাম বন্যার মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এতে হাওরের পাশাপাশি জেলার হাওর এলাকার বাইরে নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হয়েছে। পাকা ধান ঘরে তুলতে না পারায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় পড়েছেন।

কমলগঞ্জের পতনঊষার কেওলার হাওরে গিয়ে দেখা যায়, গত দুই দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দ্রুত পানি বেড়ে প্রায় ১ হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একইভাবে রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলের ধানখেতও প্লাবিত হয়েছে।

এ ছাড়া ঢলে বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে পাঁচ শতাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জেলার চারটি নদীতে বেড়েছে পানি। জেলার জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি

সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে মনাই নদের পানি ঢুকে ইকরাছই হাওরের প্রায় ১১৪ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। গতকাল ভোরে মধ্যনগর উপজেলার অ্যারন বিলের ইকরাছই হাওরের বাঁধ ভেঙে যায়।

প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরে মনাই নদের পানির চাপে বাঁধটি ভেঙে গেলে অ্যারন বিলের ইকরাছই হাওরটি তলিয়ে যায়। হামিদপুর, চানপুর, গড়াকাটা, হরিণাকান্দি ও চান্দালিপাড়া গ্রামের শতাধিক কৃষক এই হাওরে বোরো ধান আবাদ করেছেন।

এ ছাড়া জগন্নাথপুরের বিভিন্ন হাওরের পাকা ধান ডুবে গেছে। গত সোমবার ও গতকাল মঙ্গলবার হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে এ ধান।

সিলেটে বন্যার আশঙ্কা

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটে বাড়ছে নদ-নদীর পানি। এ কারণে বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সিলেটে সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, পিয়াইন ও লোভা ছড়া নদীর পানি বাড়তেছে।

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, কয়েক দিন ধরে সিলেটে বৃষ্টি অব্যাহত আছে। সঙ্গে পাহাড়ি ঢলও আছে। ধীরে ধীরে নদীর পানি বাড়ছে। এভাবে পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা হতে পারে সিলেটে।

নেত্রকোনায় হাওরের ফসল ঘরে তুলতে মাইকিং

নেত্রকোনার ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, ভুগাই, উপদাখালীসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনের মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ধান কাটার যন্ত্রের জ্বালানি সংকট, শ্রমিক সংকটসহ নানা সমস্যায় যথাসময়ে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকেরা। সব মিলিয়ে ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাবে।

এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার আশঙ্কায় দ্রুত হাওরের ফসল কেটে ঘরে তুলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত দুদিন ধরে মাইকিং করা হচ্ছে।

হবিগঞ্জে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। জানা গেছে, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়পুর এলাকার পার্শ্ববর্তী একটি হাওরে প্রায় তিন শ বিঘা জমির পাকা ধান ইতিমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারেননি।

এ ছাড়া বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার নিম্নাঞ্চলেও বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। অনেক জায়গায় জমিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় ধান কাটার কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উজান থেকে নেমে আসা ঢলে খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন করে হাওরাঞ্চলে পানি ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভরপেট বিরিয়ানির পর তরমুজ, একে একে প্রাণ হারাল একই পরিবারের ৪ সদস্য

মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসাহ ভাতা পেতে যাচ্ছেন ব্যাংকাররা

নিউমার্কেট এলাকায় গুলিতে নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের সহযোগী টিটন

সরকারের হস্তক্ষেপে ভেঙে গেল শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট বোর্ড

ইউনূস ভিভিআইপি এক বছরই, মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি ৬ মাস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত