Ajker Patrika

ডিপিডিসির ২০ হাজার কোটির প্রকল্প নিয়ে বিপাকে সরকার

প্রকল্প স্থগিত করলে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকৃত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে বৃহত্তর স্বার্থে প্রকল্প চলমান রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ, বিদ্যুৎমন্ত্রী

ফয়সাল আতিক, ঢাকা
আপডেট : ১১ জুন ২০২৬, ১০: ১১
ডিপিডিসির ২০ হাজার কোটির প্রকল্প নিয়ে বিপাকে সরকার

ঢাকার একাংশে বিদ্যুৎ সরবরাহে নিয়োজিত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার। এই প্রকল্পের অধীনে এমন কিছু উপকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোর আরও ২০ বছর পর কাজে আসবে। তত দিনে এসব উপকেন্দ্র আয়ুষ্কাল হারাবে।

ডিপিডিসির বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ডিপিডিসির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এই প্রকল্পের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, প্রকল্প এখন এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখান থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। আবার এই প্রকল্পের অধীনে অগ্রিম নির্মাণ করে রাখা উপকেন্দ্রগুলো কাজেও লাগানো যাবে না। ফলে চীনের অর্থায়নে নির্মিত এসব উপকেন্দ্র ব্যবহার হওয়ার আগেই হয়তো আয়ুষ্কাল হারাবে।

ডিপিডিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ৪০টি উপকেন্দ্র নির্মাণ, পুরোনো ১২টি উপকেন্দ্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি, স্ক্যাডা অটোমেশন সিস্টেম, প্রশিক্ষণ সুবিধা ও গুদাম সেন্টার, ভূগর্ভস্থ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। একনেকে এই প্রকল্প পাস হয়েছিল ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। প্রথমে ২০২১ সালে প্রকল্প শেষ করার কথা থাকলেও প্রথম ধাপে ২০২৪ এবং দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উন্নীত করা হয়। গত বছর জুন পর্যন্ত প্রকল্পর অগ্রগতি ৭১ শতাংশ।

অভিযোগের ভিত্তিতে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘নজিরবিহীন ঘটনায় প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন অসম্পূর্ণ রেখেই ডিপিপি পাস হয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির পূর্বাভাস আমলে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সেই চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী বৃদ্ধি পায়নি। ২০ বছর পরের চাহিদা বিবেচনায় উপকেন্দ্র ও লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এই ২০ বছরের মধ্যেই এগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের অধীনে ৩৯টি উপকেন্দ্রের কাজ প্রায় শেষ, চারটি উপকেন্দ্রে কাজ ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ভূ-উপরিস্থ বৈদ্যুতিক তার মাটির নিচে স্থাপন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এই অবস্থায় প্রকল্প স্থগিত করলে ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকৃত বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রত্যাশিত সুফল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে বৃহত্তর স্বার্থে প্রকল্প চলমান রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০ বছর পর কী চাহিদা হবে, সেটা বিবেচনা করে কতগুলো উপকেন্দ্র বসিয়ে দেওয়া হলো। এই ২০ বছরেই উপকেন্দ্রগুলোর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাবে। ফলে তখন আবার খরচ করে এগুলো বসাতে হবে। তার মানে দ্বিগুণ খরচ হবে। সবচেয়ে ভালো উপকেন্দ্রেরও ২৫ বছরের বেশি লাইফ থাকে না। এমনভাবে কাজ করে গেছে যে এটা এখন বন্ধ করে দিলে অনেক লস। আর যদি রাখি তাহলে স্ট্রাকচারগুলো কাজে লাগানো যাবে।’

এই প্রকল্পে বিভিন্ন মহলের যোগসাজশে প্রচুর লুটপাট হয়েছে আশঙ্কা করে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রচুর লুটপাট করে এমন একটি প্রকল্প করা হচ্ছে, যেখানে জনগণের কোনো উপকার হবে না। যদি সাধারণ মানুষের উপকার হতো, তাহলেও একটা কথা ছিল।’

ডিপিডিসির হিসাব অনুযায়ী, ১৬৫০ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার চুক্তিমূল্যের এই প্রকল্পের ব্যয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক দিচ্ছে ১১ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা, সরকারি বরাদ্দ থেকে ৭ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা এবং ডিপিডিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা।

প্রকল্পের পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে শুরু হয়েছে জটিলতা। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছরের মধ্যে এই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

প্রকল্পের বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী মোর্শেদ আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন নেসার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ফজিলাতুন নেসাকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলে সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এদিকে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোর্শেদ আলম খানের এই প্রকল্প থেকে ঘুষ, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত