Ajker Patrika

উন্নয়নের নতুন হিসাব–৩: উৎপাদনশীলতার চাবিকাঠি মেধার হাতে

শাহ আলম খান, ঢাকা 
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ১১: ৩৩
উন্নয়নের নতুন হিসাব–৩: উৎপাদনশীলতার চাবিকাঠি মেধার হাতে
গ্রাফিক্স: আজকের পত্রিকা

একই সংখ্যক শ্রমিক, একই যন্ত্রপাতি ও একই মূলধন ব্যবহার করেও এক দেশের উৎপাদন অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। এর কারণ উৎপাদনশীলতা। অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে সফলতা নির্ভর করে শুধু শ্রম বা বিনিয়োগের পরিমাণে নয়; বরং একই সম্পদ দিয়ে কত বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে, তার ওপর। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও এখন সেখানেই।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) কম্পেনডিয়াম অব প্রোডাক্টিভিটি ইন্ডিকেটরস ২০২৫ বলছে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি উৎপাদনশীলতা। একইভাবে এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের (এপিও) প্রোডাক্টিভিটি ডেটাবুক ২০২৫ বলছে, এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে শ্রমের গুণগত মান এবং একই সম্পদ থেকে বেশি মূল্য সৃষ্টির সক্ষমতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা শুধু শ্রমিকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না; শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়েই এর ভিত্তি গড়ে ওঠে।

দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সেই প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিনিয়োগের ধীরগতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও মন্থর প্রবৃদ্ধির মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিদ্যমান সম্পদ থেকেই কীভাবে আরও বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।

উৎপাদনশীলতার এই লড়াই এখন শুধু কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ছড়িয়ে পড়েছে মেধা ও জ্ঞানের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়। উন্নত অর্থনীতিগুলো উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ পেশাজীবী আকৃষ্ট করছে। ফলে দক্ষ মানবসম্পদ এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠেছে।

এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে নয় বাংলাদেশও। বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সফটওয়্যার প্রকৌশলী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশেষজ্ঞ, ডেটা বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, স্থপতি ও উদ্ভাবকসহ দেশের উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের একটি অংশ উন্নত দেশগুলোর শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মানবসম্পদ তৈরিতে দেশের বিনিয়োগের একটি অংশ দেশের বাইরেই কাজে লাগছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২১ সালে কানাডায় যান গবেষণা প্রকৌশলী সিয়াম আহমেদ। বর্তমানে তিনি টরন্টোভিত্তিক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস কলে সিয়াম আহমেদ জানান, দেশে ফিরে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও গবেষণার পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা–ক্যারিয়ারের সুযোগের সীমাবদ্ধতা তাঁকে নিরুৎসাহিত করে। তাঁর ভাষায়, ‘বিষয়টি শুধু বেতনের নয়। একজন গবেষক হিসেবে নিজের দক্ষতা ও ধারণাগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, সেটিই সবচেয়ে বড় বিবেচনা।’

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ইউএন ডেসা)-এর ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্র্যান্ট স্টক ২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৮৭ লাখের বেশি। সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দলিল বলছে, বিদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি কর্মী ও প্রবাসী রয়েছেন। একই সময়ে ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ইতালিতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অভিবাসীর সংখ্যা ২০২০ সালের ৭ লাখ ৩৭ হাজার থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে ৯ লাখ ১৫ হাজারে পৌঁছেছে।

এই প্রবণতা শুধু অভিবাসন বৃদ্ধির নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উচ্চদক্ষ জনবলের চাহিদা বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩০ হাজার কর্মীর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ছিলেন দক্ষ কর্মী এবং ৪৫ হাজার ছিলেন পেশাজীবী।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫২ হাজার ৭৯৯। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি–পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ফ্যাড-ক্যাবের সভাপতি মো. জুলফিকার আলী জুয়েল জানান, প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে যান, তাঁদের অন্তত ৬০ শতাংশ আর দেশে ফেরেন না।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ মানুষের আন্তর্জাতিক অভিবাসনকে শুধু ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার কতটা দেশের শিল্প, উৎপাদন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক ড. তাসনিম সিদ্দিকী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দক্ষ মানুষের বৈশ্বিক চলাচল এখন বাস্তবতা। চ্যালেঞ্জ হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা দেশের উন্নয়নের অংশ হয়ে উঠতে পারে। সেটি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।’

দক্ষ জনবলকে উৎপাদনশীলতার শক্তিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য। দেশগুলো শুধু দক্ষ মানুষ তৈরি করেনি; বিদেশে থাকা গবেষক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককেও শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বৈশ্বিক মেধা–প্রবাহের যুগে সফল দেশগুলো মানুষের চলাচল ঠেকানোর চেয়ে সেই মেধাকে জাতীয় উৎপাদনশীলতার শক্তিতে রূপান্তরেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

এই কারণেই উৎপাদনশীলতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানোর বিষয় নয়; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। একই শ্রম ও মূলধন ব্যবহার করে বেশি মূল্য সৃষ্টি করা গেলে শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়ে, আয় বাড়ে, বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হয়।

কর বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি কিংবা ব্যক্তি মানে শুধু বেশি উৎপাদন নয়; একই সম্পদ থেকে বেশি আয় সৃষ্টি। এর সুফল কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রের রাজস্ব—সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়।’

সরকারও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম মডেল হিসেবেই দেখছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দক্ষ জনবল দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যাতে দক্ষ পেশাজীবীরা দেশেই নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন।’

উন্নয়নের নতুন হিসাবও এখন সেখানেই। অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু প্রবৃদ্ধির হারের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে সেই প্রবৃদ্ধির ভেতরে কতটা উৎপাদনশীলতা তৈরি হচ্ছে তার ওপর। একই শ্রম, একই মূলধন ও একই সম্পদ ব্যবহার করে কে বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে—পরবর্তী দশকের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় সেটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত